বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে পেট্রোবাংলার অধীন বাংলাদেশ গ্যাস ফিল্ডস কোম্পানি লিমিটেড (বিজিএফসিএল)। প্রকল্পের মেয়াদ নির্ধারণ করা হয়েছে তিন বছর।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, পরিকল্পনা কমিশনের যাচাই-বাছাই শেষে প্রকল্পটি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য উপস্থাপনের প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে।
আগামী বুধবার (৪ নভেম্বর) সকাল ১০টায় সচিবালয়ের মন্ত্রিসভা কক্ষে একনেকের সভা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী ও একনেক সভাপতি তারেক রহমান এতে সভাপতিত্ব করবেন। সভায় মোট ১৪টি প্রকল্প অনুমোদনের জন্য উপস্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে।
তিতাসের ২৩ কূপ থেকে মিলছে ৩৩ কোটি ঘনফুট গ্যাস
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় ও জ্বালানি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, বিজিএফসিএলের পরিচালনাধীন ছয়টি গ্যাসক্ষেত্রের মধ্যে পাঁচটি থেকে বর্তমানে প্রতিদিন প্রায় ৪৮ কোটি থেকে ৪৮ কোটি ৫০ লাখ ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হচ্ছে।
এর মধ্যে তিতাস গ্যাসক্ষেত্রে মোট ২৮টি কূপ খনন করা হয়েছে। বর্তমানে ২৩টি কূপ থেকে দৈনিক প্রায় ৩৩ কোটি ঘনফুট গ্যাস উৎপাদিত হচ্ছে।
দেশে গ্যাসের চাহিদা বাড়তে থাকায় বিদ্যমান উৎপাদন সক্ষমতা আরও সম্প্রসারণের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। এ অবস্থায় তিতাস গ্যাসক্ষেত্রের ৩২ ও ৩৩ নম্বর কূপ খননের প্রস্তাব নেওয়া হয়েছে।
কূপ দুটি সফলভাবে উৎপাদনে এলে জাতীয় গ্রিডে অতিরিক্ত দৈনিক ৩০ মিলিয়ন বা ৩ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব হতে পারে।
ভূকম্পন জরিপের ভিত্তিতে নেওয়া হয়েছে প্রকল্প
নতুন কূপ খননের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে তিতাস ও বাখরাবাদ গ্যাসক্ষেত্রে ২০১০ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে পরিচালিত ত্রিমাত্রিক ভূকম্পন জরিপের তথ্য বিশ্লেষণের ভিত্তিতে।
ওই জরিপের তথ্য পুনর্মূল্যায়নের জন্য চায়না ন্যাশনাল পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের প্রতিষ্ঠান বিজিপি ইনকরপোরেটেডকে নিয়োগ দিয়েছিল বিজিএফসিএল।
প্রতিষ্ঠানটি জরিপের তথ্য বিশ্লেষণ করে দুই গ্যাসক্ষেত্রে ১৬টি নতুন কূপ এবং সাতটি গভীর কূপ খননের সুপারিশ করে। সেই সুপারিশের ধারাবাহিকতায় তিতাসের নতুন দুটি কূপ খননের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
প্রকল্পের আওতায় বিদেশি ঠিকাদারের মাধ্যমে কূপ খনন, প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও মালামাল সংগ্রহ, রিগ স্থাপনের ভিত্তি নির্মাণ, দেশি-বিদেশি পরামর্শক নিয়োগ এবং গ্যাস সংগ্রহের পাইপলাইন স্থাপন করা হবে।
প্রাথমিক ব্যয় থেকে কমানো হয়েছে ৪০ কোটি টাকা
প্রকল্পটির প্রাথমিক ব্যয় প্রস্তাব করা হয়েছিল ৬৩২ কোটি টাকা। সম্পূর্ণ সরকারি অর্থায়নে বাস্তবায়নের জন্য গত ২১ এপ্রিল উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব পরিকল্পনা কমিশনে পাঠায় সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়।
এরপর ১৮ জুন পরিকল্পনা কমিশনের শিল্প ও শক্তি বিভাগের প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির সভা অনুষ্ঠিত হয়। ওই সভায় পরামর্শকসহ বিভিন্ন খাতের ব্যয় পর্যালোচনা করে মোট ৪০ কোটি টাকা কমানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
ফলে প্রকল্পের সংশোধিত ব্যয় দাঁড়ায় ৫৯২ কোটি টাকা।
গত ৬ সেপ্টেম্বর পুনর্গঠিত উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়। পরবর্তী যাচাই ও পরিকল্পনামন্ত্রীর অনুমোদন শেষে প্রকল্পটি একনেক সভায় উপস্থাপনের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
১০ বছরে ১০০ বিলিয়ন ঘনফুটের বেশি গ্যাসের সম্ভাবনা
প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নতুন দুটি কূপ থেকে ১০ বছরে প্রায় ১০০ দশমিক ৭৪ বিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উৎপাদন করা সম্ভব হতে পারে।
একই সময়ে প্রায় ৬০ হাজার ৪৪৪ ব্যারেল কনডেনসেট উৎপাদনের সম্ভাবনাও রয়েছে।
প্রকল্পের হিসাব অনুযায়ী, উৎপাদিত গ্যাস ও কনডেনসেটের একটি নির্ধারিত মূল্যায়ন পদ্ধতিতে মোট আনুমানিক মূল্য দাঁড়িয়েছে ৩৩৯ কোটি ৭ লাখ টাকা। এর মধ্যে গ্যাসের মূল্য ২৮৫ কোটি ২৬ লাখ এবং কনডেনসেটের মূল্য ৫৩ কোটি ৮১ লাখ টাকা।
অন্যদিকে, ভোক্তা পর্যায়ের গ্যাসের মূল্য বিবেচনায় ১০ বছরে উৎপাদিত গ্যাসের আনুমানিক মূল্য দাঁড়াতে পারে ৬ হাজার ৫২৩ কোটি ৯৭ লাখ টাকা।
তবে এসব হিসাব সম্ভাব্য উৎপাদন ও মূল্যায়নের ভিত্তিতে তৈরি। প্রকৃত উৎপাদন এবং আর্থিক সুবিধা নির্ভর করবে খননের ফলাফল, গ্যাসের মজুত ও উৎপাদনক্ষমতার ওপর।
২০২৬ সালে ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ফ্যাসিলিটেশন কোম্পানি (আইআইএফসি) প্রকল্পটির সম্ভাব্যতা সমীক্ষা যাচাই করেছে।
২০৩৫ সালের মধ্যে ৩০০ কূপ খননের পরিকল্পনা
দেশীয় জ্বালানি সম্পদের অনুসন্ধান ও উৎপাদন বাড়াতে সরকার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়েছে।
সরকারের নির্বাচনি ইশতেহারে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান, উৎপাদন সম্প্রসারণ এবং বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানির (বাপেক্স) সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
এই পরিকল্পনার আওতায় ২০৩১ সালের মধ্যে ১৫০টি কূপ খননের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। পরবর্তী সময়ে ২০৩১ থেকে ২০৩৫ সালের মধ্যে আরও ১৫০টি কূপ খননের পরিকল্পনা রয়েছে।
সব মিলিয়ে ২০৩৫ সালের মধ্যে মোট ৩০০টি কূপ খননের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সরকার।
দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব হলে এলএনজি আমদানির প্রয়োজন কিছুটা কমানো এবং বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
বিদেশি ঠিকাদারনির্ভরতা নিয়ে বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ
নতুন কূপ খননের উদ্যোগকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করলেও বিদেশি ঠিকাদারের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা।
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. এম শামসুল আলম বলেন, গ্যাসক্ষেত্র পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে থাকা দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর নিজস্ব খনন সক্ষমতা আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন।
তাঁর মতে, দীর্ঘদিন ধরে গ্যাসক্ষেত্র পরিচালনার অভিজ্ঞতা থাকলেও দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলো পুরোপুরি নিজস্ব সক্ষমতায় কূপ খনন করতে পারছে না। ফলে বিদেশি ঠিকাদারের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।
বিদেশি ঠিকাদারের মাধ্যমে কাজ করতে গিয়ে কখনো খনন কার্যক্রমে জটিলতা, প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্ব এবং অর্থ অপচয়ের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।
এ কারণে বিজিএফসিএলের নিজস্ব প্রযুক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়িয়ে গ্যাস উৎপাদনে আরও বেশি গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন এই বিশেষজ্ঞ।
শিল্প উৎপাদন বাড়াতে সহায়ক হতে পারে নতুন গ্যাস
পরিকল্পনা কমিশনের শিল্প ও শক্তি বিভাগের সাবেক সদস্য ড. নূরুন্নাহার চৌধুরী বলেন, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে দুটি নতুন কূপ থেকে প্রতিদিন প্রায় ৩০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।
তাঁর মতে, অতিরিক্ত গ্যাস সরবরাহ দেশের শিল্পকারখানার উৎপাদন কার্যক্রমে সহায়তা করতে পারে। একই সঙ্গে এলএনজি আমদানি খাতে বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় কমানোর সম্ভাবনা রয়েছে।
দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন, সার কারখানা, শিল্পকারখানা এবং অন্যান্য খাতে গ্যাসের চাহিদা রয়েছে। স্থানীয় উৎপাদন বাড়ানো গেলে আমদানিনির্ভরতা কমানোর পাশাপাশি জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় কিছুটা স্বস্তি আসতে পারে।
তবে নতুন কূপ খননের সফলতা নির্ভর করবে নির্ধারিত সময়ে প্রকল্প বাস্তবায়ন, কারিগরি মান বজায় রাখা এবং প্রত্যাশিত পরিমাণ গ্যাস উত্তোলন সম্ভব হওয়ার ওপর।
তিতাসের নতুন দুটি কূপ তাই শুধু গ্যাস উৎপাদন বৃদ্ধির উদ্যোগ নয়, দেশীয় জ্বালানিসম্পদ কাজে লাগিয়ে দীর্ঘমেয়াদে আমদানি ব্যয় কমানোর পরিকল্পনারও একটি অংশ।

