বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের প্রধান উৎস তৈরি পোশাকশিল্প। তবে একটি খাতের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে রপ্তানি পণ্যে বৈচিত্র্য আনার ক্ষেত্রে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে দেশের বৈদ্যুতিক ও ইলেকট্রনিকস শিল্প। স্থানীয় উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি, দেশীয় ব্র্যান্ডগুলোর সম্প্রসারণ এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের সুযোগ কাজে লাগাতে পারলে এই খাত ভবিষ্যতে দেশের অন্যতম বড় রপ্তানি আয়ের উৎস হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করছেন শিল্পোদ্যোক্তারা।
২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের ইলেকট্রনিকস পণ্য রপ্তানি রেকর্ড ২০ কোটি ৬১ লাখ ৯০ হাজার মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে। আগের অর্থবছরের তুলনায় রপ্তানি বেড়েছে ২৩ দশমিক ৮২ শতাংশ। এই প্রবৃদ্ধির ফলে দেশের শিল্প খাতে নতুন করে আশাবাদ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে ওয়ালটন, ভিশন, ভিস্তা ও সিম্ফনির মতো দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলো আন্তর্জাতিক বাজারে নিজেদের উপস্থিতি বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে।
তবে শিল্পসংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, শুধু আমদানি করা যন্ত্রাংশ সংযোজন করে পণ্য উৎপাদনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে বিশ্ববাজারে শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করা কঠিন হবে। এ জন্য উন্নত প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদন, আন্তর্জাতিক মানের পরীক্ষাগার, প্রয়োজনীয় মানসনদ, দক্ষ জনবল এবং নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি।
বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের (বিসিআই) মহাসচিব মো. হেলাল উদ্দিন বলেন, দেশের রপ্তানি আয়ে তৈরি পোশাক খাতের ওপর নির্ভরতা কমাতে বৈদ্যুতিক ও ইলেকট্রনিকস শিল্প গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ার পাশাপাশি স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে এসব পণ্যের চাহিদা বৃদ্ধির কারণে খাতটির সামনে বড় সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
২ নভেম্বর ঢাকায় বিসিআই কার্যালয়ে আয়োজিত ‘বৈদ্যুতিক ও ইলেকট্রনিকস খাত: রপ্তানি বহুমুখীকরণের নতুন ক্ষেত্র’ শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনকালে তিনি এসব কথা বলেন।
হেলাল উদ্দিন জানান, দেশের প্রকৌশল পণ্য রপ্তানিতে ইলেকট্রনিকস শিল্প ইতোমধ্যে সাইকেল রপ্তানিকে ছাড়িয়ে শীর্ষ অবস্থানে উঠে এসেছে। তবে এই অগ্রগতি ধরে রাখতে শিল্পটিকে আরও উন্নত প্রযুক্তির উৎপাদনের দিকে এগিয়ে নিতে হবে।
তাঁর মতে, ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতির সার্কিট বোর্ড তৈরি এবং অর্ধপরিবাহী প্রযুক্তির নকশা প্রণয়নের মতো উচ্চমূল্য সংযোজনকারী কার্যক্রমে সক্ষমতা অর্জন করতে হবে। এতে দেশের উৎপাদনশিল্প শুধু যন্ত্রাংশ সংযোজনের পর্যায়ে সীমাবদ্ধ না থেকে প্রযুক্তিনির্ভর শিল্পে রূপ নিতে পারবে।
বিসিআই সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী পারভেজ বলেন, দেশের বেসরকারি খাতকে কেবল সরকারের কাছে নীতিগত সুবিধা চাওয়ার প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়াতে কী ধরনের সংস্কার প্রয়োজন, তা উদ্যোক্তাদের নিজেদেরই চিহ্নিত করে বাস্তবসম্মত প্রস্তাব দিতে হবে।
তিনি বলেন, ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর উচিত উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান, পণ্য ব্যবহারকারী এবং সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা করে বিদ্যমান নীতিগত ও প্রশাসনিক সমস্যাগুলো চিহ্নিত করা। এরপর সুনির্দিষ্ট তথ্য ও বিশ্লেষণের ভিত্তিতে সরকারের কাছে প্রয়োজনীয় পরিবর্তনের সুপারিশ তুলে ধরতে হবে।
দেশের মোটরযান, হালকা প্রকৌশল ও হালাল পণ্য খাতের উন্নয়নে বিসিআইয়ের বিভিন্ন উদ্যোগের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি সরকারি ও বেসরকারি খাতের মধ্যে আরও কার্যকর সহযোগিতার ওপর গুরুত্ব দেন।
একই সঙ্গে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের উদ্যোক্তাদের জন্য নতুন শিল্প খাত তৈরির প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করেন বিসিআই সভাপতি। বিশেষ করে বৈদ্যুতিক ও ইলেকট্রনিকস পণ্য এবং বিদ্যুৎচালিত যানবাহনের যন্ত্রাংশ উৎপাদনের মতো সম্ভাবনাময় খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর আহ্বান জানান তিনি।
রানার গ্রুপের চেয়ারম্যান হাফিজুর রহমান খানও দেশের ইলেকট্রনিকস শিল্পকে রপ্তানিমুখী করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁর মতে, বাংলাদেশের উৎপাদনশিল্পকে শুধু অভ্যন্তরীণ বাজারের চাহিদা পূরণের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা গড়ে তুলতে হবে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের ইলেকট্রনিকস শিল্পকে এগিয়ে নেওয়ার যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। তবে আন্তর্জাতিক বাজারের অনেক পরিস্থিতি দেশের নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকে। তাই নিজেদের সক্ষমতার মধ্যে থাকা বিষয়গুলোতে উন্নতি আনার পাশাপাশি রপ্তানি সম্প্রসারণের দিকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
বাংলাদেশকে এক লাখ কোটি ডলারের অর্থনীতিতে পরিণত করার লক্ষ্য উল্লেখ করে হাফিজুর রহমান খান বলেন, সেই লক্ষ্য অর্জনের ক্ষেত্রে রপ্তানি আয় বাড়ানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নতুন শিল্প খাতের বিকাশ ছাড়া দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির সম্প্রসারণ কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
ইলেকট্রনিকস পণ্য রপ্তানিতে ভিয়েতনামের সাফল্যের উদাহরণ তুলে ধরে তিনি বলেন, দেশটি বর্তমানে বিশ্ববাজারে বৈদ্যুতিক ও ইলেকট্রনিকস পণ্যের অন্যতম প্রধান রপ্তানিকারক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাজারে এই শিল্পের বিশাল সম্ভাবনার বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে।
তাঁর মতে, বাংলাদেশের উদ্যোক্তাদেরও উৎপাদন ও রপ্তানি বাড়ানোর ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় নীতিগত সহায়তা এবং অন্যান্য সুবিধার বিষয়গুলো সুনির্দিষ্টভাবে তুলে ধরতে হবে। উদ্যোক্তারা বাস্তব সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে কার্যকর প্রস্তাব দিলে নীতিনির্ধারকদের পক্ষে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ সহজ হবে।
তবে দেশের ইলেকট্রনিকস শিল্পের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হলো বিদেশ থেকে আমদানি করা যন্ত্রাংশের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা। স্থানীয়ভাবে পণ্য সংযোজনের সক্ষমতা বাড়লেও প্রয়োজনীয় অনেক গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ এখনো বিদেশ থেকে সংগ্রহ করতে হয়।
নিজের মোটরযান শিল্পের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে হাফিজুর রহমান খান বলেন, দেশের গাড়ি উৎপাদন ও সংযোজনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো এখনো বিপুল পরিমাণ যন্ত্রাংশ আমদানির ওপর নির্ভরশীল। ইলেকট্রনিকস শিল্পেও একই ধরনের নির্ভরতা বজায় থাকলে দেশীয় উৎপাদনের পূর্ণ সম্ভাবনা কাজে লাগানো কঠিন হতে পারে।
এ কারণে স্থানীয়ভাবে প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ উৎপাদনের সক্ষমতা বাড়ানোর বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে। শুধু চূড়ান্ত পণ্য সংযোজনের পরিবর্তে উৎপাদনের বিভিন্ন পর্যায়ে দেশীয় শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে যুক্ত করা গেলে দেশের অভ্যন্তরে আরও বেশি মূল্য সংযোজন সম্ভব হবে।
শিল্পোদ্যোক্তাদের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা করতে হলে পণ্যের মান নিশ্চিত করার পাশাপাশি আধুনিক প্রযুক্তি ও দক্ষ জনবল গড়ে তোলার দিকে মনোযোগ দিতে হবে। আন্তর্জাতিক মানের পরীক্ষাগার ও স্বীকৃত মানসনদ অর্জনের সুযোগ তৈরি হলে বিদেশি ক্রেতাদের আস্থা বাড়তে পারে।
এ ছাড়া নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ এবং উৎপাদন ব্যয় নিয়ন্ত্রণে রাখা এই শিল্পের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। বিদ্যুৎ সরবরাহে অনিশ্চয়তা কিংবা আমদানিনির্ভর উৎপাদনব্যবস্থার কারণে খরচ বেড়ে গেলে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা করা কঠিন হয়ে পড়তে পারে।
সংশ্লিষ্টদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, বাংলাদেশের ইলেকট্রনিকস শিল্প এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে রয়েছে। স্থানীয় বাজারে দেশীয় ব্র্যান্ডগুলোর অবস্থান শক্তিশালী হওয়ার পাশাপাশি রপ্তানিতেও ইতিবাচক অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে। তবে এই প্রবৃদ্ধিকে দীর্ঘস্থায়ী করতে হলে উৎপাদন প্রযুক্তি, দক্ষতা এবং সরবরাহব্যবস্থায় আরও উন্নতি প্রয়োজন।
দেশের রপ্তানি আয়ের বড় অংশ এখনো তৈরি পোশাক খাত থেকে আসে। এমন পরিস্থিতিতে ইলেকট্রনিকস শিল্পের সম্প্রসারণ রপ্তানি পণ্যে বৈচিত্র্য আনতে এবং একটি নির্দিষ্ট খাতের ওপর অর্থনীতির নির্ভরতা কমাতে সহায়ক হতে পারে।
পাশাপাশি এই শিল্পের বিকাশ নতুন বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান এবং প্রযুক্তিনির্ভর উদ্যোক্তা তৈরির সুযোগও বাড়াতে পারে। বিশেষ করে উন্নত যন্ত্রাংশ উৎপাদন ও প্রযুক্তিগত নকশা তৈরির সক্ষমতা অর্জন করা গেলে দেশের শিল্পায়নে নতুন মাত্রা যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
শিল্পসংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, বর্তমান রপ্তানি প্রবৃদ্ধি আশাব্যঞ্জক হলেও বড় রপ্তানিকারক শিল্পে পরিণত হওয়ার জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন। সরকারি নীতিগত সহায়তা, বেসরকারি বিনিয়োগ, আধুনিক অবকাঠামো এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতার সমন্বয় ঘটাতে পারলে বৈদ্যুতিক ও ইলেকট্রনিকস শিল্প আগামী দিনে বাংলাদেশের রপ্তানি অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি হয়ে উঠতে পারে।

