চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে চলা গৃহকরসংক্রান্ত বিরোধের নিষ্পত্তি হয়েছে। চূড়ান্ত আপিল রায়ে বন্দর কর্তৃপক্ষের বার্ষিক গৃহকর নির্ধারণ করা হয়েছে ২২৪ কোটি ৭০ লাখ ৫৩ হাজার ৯৩৭ টাকা। ২০২৫-২৬ অর্থবছর থেকে এই কর কার্যকর হবে। এর ফলে সিটি করপোরেশনের রাজস্ব আয়ে বড় ধরনের সংযোজন ঘটবে বলে আশা করা হচ্ছে।
সোমবার (২ নভেম্বর) বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ে স্থানীয় সরকার বিভাগের পরিচালক মনোয়ারা বেগম আপিলের চূড়ান্ত রায় ঘোষণা করেন। এর আগে যৌথ জরিপের ভিত্তিতে চট্টগ্রাম বন্দরের বার্ষিক গৃহকর ২৬৪ কোটি ৩৫ লাখ টাকা নির্ধারণ করেছিল সিটি করপোরেশন। তবে বন্দর কর্তৃপক্ষের আপিলের পর সেই অর্থের প্রায় ১৫ শতাংশ কমিয়ে নতুন কর নির্ধারণ করা হয়েছে।
এই সিদ্ধান্তকে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ অর্জন হিসেবে দেখছেন প্রশাসক শাহাদাত হোসেন। মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে তিনি বলেন, একটি প্রতিষ্ঠান থেকে এত বড় অঙ্কের রাজস্ব পাওয়ার বিষয়টি চট্টগ্রামের ইতিহাসে উল্লেখযোগ্য ঘটনা।
শাহাদাত হোসেন জানান, দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই তিনি চট্টগ্রাম বন্দরের কাছ থেকে প্রাপ্য গৃহকর আদায়ের বিষয়ে কাজ করছেন। বন্দরের সব স্থাপনা বিবেচনায় নিয়ে নতুন করে কর নির্ধারণ করা হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে বন্দর কর্তৃপক্ষ আপিল করলে বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয় নির্ধারিত অর্থের ১৫ শতাংশ কমিয়ে দেয়।
তিনি বলেন, দুই বছর আগে দায়িত্ব গ্রহণের সময় চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের দায়দেনার পরিমাণ ছিল ৫১৩ কোটি টাকা। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন ঋণ পরিশোধ এবং প্রয়োজনীয় ব্যয় নির্বাহের পর বর্তমানে সংস্থাটির তহবিলে ১০০ কোটি টাকার বেশি উদ্বৃত্ত রয়েছে।
বন্দর থেকে পাওয়া রাজস্ব নগরের উন্নয়ন ও নাগরিক সেবার মান বাড়ানোর কাজে ব্যবহার করার পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানান তিনি। বিশেষ করে শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, সড়ক নির্মাণ ও সংস্কার, সড়কবাতি স্থাপন এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় এই অর্থ ব্যয় করা হবে।
পাশাপাশি নগরবাসীকে আরও উন্নত সেবা দিতে আধুনিক যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জাম কেনার পরিকল্পনাও রয়েছে সিটি করপোরেশনের।
শাহাদাত হোসেন বলেন, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের অধীনে প্রায় ১০০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালিত হচ্ছে। এসব প্রতিষ্ঠানের অনেক শিক্ষক এখনো মাসে মাত্র ১০ হাজার থেকে ১২ হাজার টাকা বেতন পান। তাঁদের বেতন বাড়ানোর পাশাপাশি শিক্ষক ও কর্মচারীর ঘাটতি পূরণ করাও প্রয়োজন।
তিনি আরও জানান, সিটি করপোরেশনের প্রায় দেড় হাজার থেকে দুই হাজার কর্মচারীর চাকরি নিয়মিত করা হয়েছে। এর ফলে বেতন-ভাতার ব্যয় বেড়েছে। এসব খরচ সংস্থাটির নিজস্ব আয় থেকেই বহন করতে হয়।
প্রশাসকের মতে, সরকারি মন্ত্রণালয় থেকে সব সময় প্রয়োজনীয় অর্থের পুরোটা পাওয়া যায় না। তাই সিটি করপোরেশনের আর্থিক সক্ষমতা ধরে রাখতে নিজস্ব উৎস থেকে রাজস্ব আদায় বাড়ানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এদিকে আপিলের রায় নিয়ে এখনই বিস্তারিত মন্তব্য করতে রাজি হয়নি চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ।
বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিবের অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা সৈয়দ রেফায়েত হামিম জানিয়েছেন, বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ে গৃহকরসংক্রান্ত বিরোধের শুনানি হয়েছে। তবে বন্দর কর্তৃপক্ষ এখনো রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি হাতে পায়নি।
তিনি বলেন, রায়ের কপি পাওয়ার পর তা পর্যালোচনা করে কর্তৃপক্ষের অবস্থান জানানো হবে। পূর্ণাঙ্গ রায় না দেখে এ বিষয়ে মন্তব্য করা সম্ভব নয়।
বন্দর কর্তৃপক্ষ নির্ধারিত করের বিষয়ে নতুন কোনো আপত্তি জানাবে কি না কিংবা রায়কে চ্যালেঞ্জ করবে কি না, সে বিষয়েও এখনই সিদ্ধান্ত জানানো হয়নি।
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের তথ্য অনুযায়ী, যৌথ জরিপে বন্দর কর্তৃপক্ষের অধীনে মোট ১ কোটি ৭৩ লাখ ৪৬ হাজার ৪৯১ বর্গফুট স্থাপনা শনাক্ত করা হয়েছে।
এর মধ্যে আবাসিক স্থাপনার আয়তন ১৭ লাখ ২৪ হাজার ১০৬ বর্গফুট এবং অনাবাসিক স্থাপনার আয়তন ১৬ লাখ ৩৫ হাজার ৩৭৯ বর্গফুট। এছাড়া ইয়ার্ড ও পণ্য সংরক্ষণাগারের আয়তন ১ কোটি ৩৯ লাখ ৮৭ হাজার ৬ বর্গফুট।
এসব স্থাপনার পাশাপাশি বন্দরের বিভিন্ন কার্যক্রম থেকে আয়ও কর নির্ধারণের ক্ষেত্রে বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে কনটেইনার ওঠানো-নামানো, বন্দর ব্যবহার বাবদ আদায় করা অর্থ, জাহাজ ভেড়ানো ও ছাড়ার সেবা, জাহাজ পরিচালনায় দিকনির্দেশনা, টাগবোট সেবা এবং বিলম্বজনিত ফি থেকে অর্জিত আয় হিসাবের আওতায় আনা হয়।
একই সঙ্গে বন্দরের সামগ্রিক সক্ষমতাও মূল্যায়ন করা হয়েছে বলে জানিয়েছে সিটি করপোরেশন।
গৃহকর নিয়ে দুই প্রতিষ্ঠানের সাম্প্রতিক বিরোধ নতুন করে সামনে আসে ২০২৫ সালের জুলাইয়ে। ওই বছরের ১০ জুলাই চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন বকেয়াসহ ১৭৭ কোটি ৬০ লাখ টাকার গৃহকর দাবি করে বন্দর কর্তৃপক্ষের কাছে বিল পাঠায়।
এর মধ্যে সংশ্লিষ্ট অর্থবছরের নির্ধারিত কর ছিল ১৬০ কোটি ১৬ লাখ টাকা। তবে বন্দর কর্তৃপক্ষ সেই দাবির বিষয়ে আপত্তি জানায়। পরে দুই সংস্থা যৌথ জরিপের মাধ্যমে নতুন করে কর নির্ধারণের উদ্যোগ নেয়।
জরিপ শেষে ২৪ ফেব্রুয়ারি সংশ্লিষ্ট কমিটির বৈঠকে বন্দর কর্তৃপক্ষ বছরে ৫০ কোটি টাকা গৃহকর দেওয়ার প্রস্তাব করে। কিন্তু চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন সেই প্রস্তাবে সম্মত হয়নি।
পরবর্তী সময়ে বিষয়টি নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের কাছে পাঠানো হয়। ২০ এপ্রিল মন্ত্রণালয় জানায়, প্রচলিত আইন ও বিধিবিধান অনুযায়ী গৃহকর নির্ধারণ এবং পরিশোধের বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের এখতিয়ারভুক্ত।
এরপর ২৯ জুন বন্দর কর্তৃপক্ষ ২০২৫-২৬ অর্থবছরের গৃহকর বাবদ ১৯৮ কোটি ২৬ লাখ টাকা পরিশোধ করে। এই অর্থ সিটি করপোরেশনের প্রস্তাবিত করের ৭৫ শতাংশের সমপরিমাণ ছিল।
তবে নির্ধারিত করের পরিমাণ নিয়ে আপত্তি থাকায় বন্দর কর্তৃপক্ষ বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ে আপিল করে। সেই আপিলের শুনানি শেষে সোমবার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়েছে।
চট্টগ্রাম বন্দর ও সিটি করপোরেশনের মধ্যে গৃহকর নিয়ে বিরোধ অবশ্য নতুন নয়। কয়েক দশক ধরেই দুই সংস্থার মধ্যে কর নির্ধারণ ও পরিশোধ নিয়ে মতপার্থক্য চলে আসছে।
সিটি করপোরেশনের নথি অনুযায়ী, ২০১৭ সালে বন্দরের বার্ষিক গৃহকর প্রথমে ১৬০ কোটি ১৬ লাখ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছিল। তবে তৎকালীন সিটি মেয়র সেই অর্থ কমিয়ে ৫০ কোটি টাকা করেন।
পরবর্তী সময়ে ১০ শতাংশ অতিরিক্ত কর মওকুফের সুবিধা পাওয়ার পর বন্দর কর্তৃপক্ষ প্রায় ৪০ কোটি ৫০ লাখ টাকা পরিশোধ করে।
বর্তমান প্রশাসক শাহাদাত হোসেন দায়িত্ব নেওয়ার পর বন্দর কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে নির্ধারিত গৃহকর আদায়ে নতুন উদ্যোগ নেন।
২০২৪ সালের ১৫ ডিসেম্বর তিনি বন্দর চেয়ারম্যানের কাছে চিঠি পাঠিয়ে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বকেয়া গৃহকর বাবদ ১১৫ কোটি ১৬ লাখ টাকা পরিশোধের অনুরোধ জানান। এর আগে ওই অর্থবছর থেকে বন্দরের বার্ষিক গৃহকর ১৬০ কোটি ১৬ লাখ টাকা নির্ধারণ করেছিল সিটি করপোরেশন।
পরবর্তী সময়ে ২০২৫ সালের ২২ জানুয়ারি নৌপরিবহন সচিবের কাছেও চিঠি পাঠানো হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে একই বছরের ৬ এপ্রিল নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় বন্দর কর্তৃপক্ষকে আপাতত ১০০ কোটি টাকা পরিশোধের নির্দেশ দেয়।
তবে দুই প্রতিষ্ঠানের করসংক্রান্ত মতবিরোধের ইতিহাস আরও পুরোনো। ১৯৯৪-৯৫ অর্থবছরে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন বন্দরের কাছে ৩৯ কোটি ৮০ লাখ টাকা গৃহকর দাবি করেছিল। সে সময় বন্দর কর্তৃপক্ষ মাত্র ৫ কোটি টাকা পরিশোধ করে।
আবার ২০০১-০২ অর্থবছরে বকেয়া গৃহকর বাবদ ১৯৭ কোটি ৭৩ লাখ টাকা দাবি করে সিটি করপোরেশন। দীর্ঘ আলোচনার পর ২০১২ সালে পারস্পরিক সমঝোতার ভিত্তিতে বন্দর কর্তৃপক্ষ ১১২ কোটি ৩০ লাখ টাকা পরিশোধ করে।
এভাবে কয়েক দশক ধরে দুই প্রতিষ্ঠানের মধ্যে গৃহকরের পরিমাণ নিয়ে বিরোধ চলে আসছিল। সর্বশেষ আপিলের রায়ের মাধ্যমে ২০২৫-২৬ অর্থবছর থেকে বার্ষিক গৃহকরের নতুন পরিমাণ নির্ধারিত হলো।
সিটি করপোরেশন মনে করছে, বন্দর থেকে নিয়মিত এই বিপুল পরিমাণ রাজস্ব পাওয়া গেলে নগরের উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালনায় আর্থিক সক্ষমতা বাড়বে। বিশেষ করে সড়ক সংস্কার, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে ব্যয় বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে।
তবে বন্দর কর্তৃপক্ষ পূর্ণাঙ্গ রায় পর্যালোচনার পর কী অবস্থান নেয়, সেটিও এখন গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, দীর্ঘদিনের বিরোধ নিষ্পত্তির পর নতুন নির্ধারিত কর বাস্তবে কীভাবে পরিশোধ ও সমন্বয় করা হবে, তা দুই প্রতিষ্ঠানের পরবর্তী পদক্ষেপের ওপর নির্ভর করবে।

