দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারেও বাড়ছে বাংলাদেশের প্রাণিজ পণ্যের রপ্তানি। দুধ, মাংস ও ডিমের উৎপাদন বৃদ্ধির সঙ্গে নতুন নতুন দেশে প্রাণিজ পণ্য পাঠানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে রপ্তানি আয়ে। মাত্র ছয় মাসের ব্যবধানে এ খাতের বৈদেশিক মুদ্রা আয় তিন গুণের বেশি হয়েছে।
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত ছয় মাসে প্রাণিজ পণ্য রপ্তানি করে বাংলাদেশ আয় করেছে ১ কোটি ৪ লাখ ৬৩ হাজার ৭২৭ ডলার। এর আগের ছয় মাসে, অর্থাৎ ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত আয় হয়েছিল ৩২ লাখ ৯৮ হাজার ৬৬২ ডলার।
সেই হিসাবে ছয় মাসের ব্যবধানে রপ্তানি আয় বেড়েছে ৭১ লাখ ৬৫ হাজার ৬৫ ডলার। প্রবৃদ্ধির হার ২১৭ দশমিক ২০ শতাংশ।
আগস্টেই রপ্তানি আয়ে বড় উত্থান
মাসভিত্তিক পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে প্রাণিজ পণ্যের রপ্তানিতে দ্রুত প্রবৃদ্ধির চিত্র পাওয়া যায়।
২০২৬ সালের মার্চে এ খাত থেকে আয় হয়েছিল ৬ লাখ ৭৮ হাজার ১২৯ ডলার। এপ্রিলে আয় বেড়ে হয় ১০ লাখ ৪৮ হাজার ৯০৩ ডলার। মে মাসে কিছুটা কমে ৭ লাখ ৫০ হাজার ৮০৮ ডলারে নামলেও জুনে আবার বেড়ে দাঁড়ায় ১১ লাখ ৯৮ হাজার ৭৭৮ ডলারে।
জুলাইয়ে রপ্তানি আয় হয় ১৯ লাখ ৫ হাজার ১৪ ডলার। আর আগস্টে তা এক লাফে পৌঁছে যায় ৪৮ লাখ ৮২ হাজার ৯৫ ডলারে।
অর্থাৎ শুধু আগস্ট মাসেই যে পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা এসেছে, তা আগের ছয় মাসের মোট রপ্তানি আয়ের চেয়েও বেশি।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম তিন মাস, জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রাণিজ পণ্য রপ্তানি করে আয় হয়েছে ২ কোটি ৪৭ লাখ ২৩ হাজার ৬৩৮ ডলার। বাংলাদেশি মুদ্রায় এর পরিমাণ প্রায় ৩০৯ কোটি ৪ লাখ ৫৪ হাজার ৭৮১ টাকা।
ছয় বছরে রপ্তানির বাজার কতটা বেড়েছে
প্রাণিসম্পদ খাতের রপ্তানি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২০-২১ অর্থবছরে এ খাত থেকে আয় হয়েছিল ৫১ কোটি ৯০ লাখ টাকা। পরের অর্থবছরে তা বেড়ে হয় ৫৮ কোটি ৭ লাখ টাকা।
২০২২-২৩ অর্থবছরে রপ্তানি আয় প্রায় দ্বিগুণ হয়ে দাঁড়ায় ৯৯ কোটি ৪৫ লাখ টাকায়। তবে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তা কমে ৫৮ কোটি ৫২ লাখ টাকায় নেমে আসে।
পরবর্তী সময়ে আবার প্রবৃদ্ধি শুরু হয়। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে রপ্তানি আয় দাঁড়ায় ৭২ কোটি ৪৫ লাখ টাকা এবং ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা বেড়ে হয় ১০২ কোটি ৫১ লাখ টাকা।
সর্বশেষ প্রকাশিত হিসাবে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম তিন মাসেই রপ্তানি আয় ৩০৯ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। এটি আগের পুরো অর্থবছরের আয়ের প্রায় তিন গুণ।
এই প্রবৃদ্ধি প্রাণিসম্পদ খাতের রপ্তানি সম্ভাবনাকে নতুনভাবে সামনে এনেছে। তবে দীর্ঘমেয়াদে এ ধারা ধরে রাখতে আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের মান ও সরবরাহব্যবস্থা শক্তিশালী করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
কোন কোন প্রাণিজ পণ্য রপ্তানি হচ্ছে
বাংলাদেশ থেকে শুধু মাংস কিংবা দুগ্ধজাত পণ্য নয়, বিভিন্ন ধরনের প্রাণিজ ও প্রাণিসম্পদ-সংশ্লিষ্ট পণ্য বিদেশে পাঠানো হচ্ছে।
রপ্তানি তালিকায় রয়েছে মাংস ও মাংসজাত পণ্য, দধি, রসমালাই, মিষ্টি, হাঁসের পালক, জিলেটিন, গরুর লেজের লোম, মহিষ ও গরুর শিং, টুকরা চামড়া, কবুতর, বুল স্টিক এবং পশুচিকিৎসাসংশ্লিষ্ট সম্পূরক পণ্য। এ ছাড়া কিছু প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্যও এই রপ্তানি তালিকায় রয়েছে।
বাংলাদেশি এসব পণ্যের বাজার তৈরি হয়েছে মালদ্বীপ, কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র, সিঙ্গাপুর, নাইজেরিয়া, ভিয়েতনাম, চীন, ইন্দোনেশিয়া, ইতালি, মালয়েশিয়া, মিসর, কুয়েত, পাকিস্তান, থাইল্যান্ড, ফ্রান্স, দক্ষিণ কোরিয়া, হংকং ও নেপালসহ বিভিন্ন দেশে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে হালাল পণ্যের চাহিদা বৃদ্ধি বাংলাদেশের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করেছে।
দুধ, মাংস ও ডিম উৎপাদনেও প্রবৃদ্ধি
রপ্তানির পাশাপাশি দেশের প্রাণিসম্পদ উৎপাদনেও ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে।
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশে দুধ উৎপাদিত হয়েছে ১৫৭ দশমিক ৫৩ লাখ টন। আগের অর্থবছরে উৎপাদন ছিল ১৫৫ দশমিক ৩৮ লাখ টন। এক বছরে উৎপাদন বেড়েছে ২ দশমিক ১৫ লাখ টন।
মাংস উৎপাদন ২০২৪-২৫ অর্থবছরের ৮৯ দশমিক ৫৪ লাখ টন থেকে বেড়ে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৯০ দশমিক ৭০ লাখ টনে পৌঁছেছে।
একই সময়ে দেশে গরুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৫৩ দশমিক ২৯ লাখ এবং ছাগলের সংখ্যা ২৭৪ দশমিক ৬৫ লাখে।
ডিম উৎপাদনেও প্রবৃদ্ধি হয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশে ডিম উৎপাদিত হয়েছে ২ হাজার ৫০৯ কোটি ৪১ লাখ। আগের অর্থবছরে উৎপাদন ছিল ২ হাজার ৪৪০ কোটি ৬৫ লাখ। অর্থাৎ এক বছরে ডিম উৎপাদন বেড়েছে ৬৮ কোটি ৭৬ লাখ।
দেশের মোট পরিবারের ৪৩ দশমিক ৬৪ শতাংশ কোনো না কোনোভাবে প্রাণিসম্পদ ও পোলট্রি পালনের সঙ্গে যুক্ত। ফলে এ খাতের সম্প্রসারণ গ্রামীণ অর্থনীতি, খামারিদের আয় এবং কর্মসংস্থানের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।
জাতীয় অর্থনীতিতে প্রাণিসম্পদের অবদান
২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশের মোট দেশজ উৎপাদনে প্রাণিসম্পদ খাতের অবদান ছিল ১ দশমিক ৮১ শতাংশ। কৃষিজ জিডিপিতে খাতটির অংশ ১৬ দশমিক ৫৬ শতাংশ। একই সময়ে এ খাতের প্রবৃদ্ধির হার ছিল ৩ দশমিক ৩০ শতাংশ।
দুধ উৎপাদন ও খামার ব্যবস্থাপনার উন্নয়নে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে প্রায় ৪ হাজার ২৮০ কোটি টাকার প্রাণিসম্পদ ও ডেইরি উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়েছে।
প্রকল্পটির আওতায় উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, খামারিদের বাজারের সঙ্গে সংযোগ, প্রাণী বীমা এবং দুধের ভোক্তা তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়। পাশাপাশি বিদ্যালয়ভিত্তিক খাদ্য কর্মসূচির মাধ্যমে শিশুদের দুধ পানে উৎসাহিত করার কার্যক্রমও পরিচালিত হয়েছে।
রপ্তানির পথে বড় চ্যালেঞ্জ মান ও নিরাপত্তা
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. দেলোয়ার হোসেন জানিয়েছেন, সরকার প্রাণিসম্পদ খাতকে রপ্তানিমুখী শিল্প হিসেবে গড়ে তুলতে কাজ করছে।
এ ক্ষেত্রে নিরাপদ ও হালাল পণ্য উৎপাদন, প্রাণীর রোগ নিয়ন্ত্রণ, আধুনিক খামার ব্যবস্থাপনা এবং আন্তর্জাতিক মানের পরীক্ষাগার ও সনদায়ন ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
তাঁর মতে, হ্যাচিং এগ রপ্তানির মাধ্যমে ইতিমধ্যে নতুন সম্ভাবনার সূচনা হয়েছে। সরকারি ও বেসরকারি খাতের সমন্বয়ে রপ্তানির পরিধি আরও বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে।
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকুও মনে করেন, প্রাণিজ পণ্যের রপ্তানি সম্প্রসারিত হলে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের পাশাপাশি খামারি ও উদ্যোক্তারা সরাসরি লাভবান হবেন।
তবে আন্তর্জাতিক বাজারে টিকে থাকতে পণ্যের নিরাপত্তা, রোগমুক্ত উৎপাদন এবং নির্ধারিত মানদণ্ড অনুসরণ নিশ্চিত করা জরুরি।
বাজার গবেষণা ও প্যাকেজিংয়ে ঘাটতি
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মো. দীন ইসলাম মনে করেন, বাংলাদেশে উৎপাদন সক্ষমতা থাকলেও আন্তর্জাতিক বাজার সম্পর্কে পর্যাপ্ত গবেষণা ও বিপণন পরিকল্পনার ঘাটতি রয়েছে।
কোন দেশে কোন পণ্যের চাহিদা বেশি, ক্রেতারা কী ধরনের মান ও প্যাকেজিং চান এবং কীভাবে বাংলাদেশি পণ্যকে আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা যায়—এসব বিষয়ে আরও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
তিনি রপ্তানি সম্প্রসারণে বাণিজ্য ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সমন্বিত উদ্যোগের ওপরও জোর দেন।
অন্যদিকে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. শাহজামান খান জানিয়েছেন, আন্তর্জাতিক হালাল পণ্যের বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান শক্তিশালী করতে উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
প্রাণিজ খাদ্যপণ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পশুখাদ্যে অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার কমানো এবং খাদ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোতে নজরদারি বাড়ানো হচ্ছে। তাঁর তথ্য অনুযায়ী, এ পর্যন্ত ২০০টি পশুখাদ্য কারখানা বন্ধের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে নোটিশ দেওয়া হয়েছে।
একই সঙ্গে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত পরীক্ষাগার, আধুনিক সংরক্ষণব্যবস্থা, প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা ও উন্নত প্যাকেজিং সুবিধা তৈরির কাজ চলছে।
পরিবেশবান্ধব উৎপাদনেও গুরুত্ব
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ এবং কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ জানিয়েছেন, প্রাণিসম্পদ খাতকে আরও পরিবেশবান্ধব করতে উন্নত খাদ্যব্যবস্থাপনা, সবুজ ঘাস উৎপাদন, বায়োগ্যাস প্রযুক্তি এবং কার্বন ভারসাম্য রক্ষার পদ্ধতি ব্যবহারে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
তাঁর মতে, আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব হলে দেশের চাহিদা পূরণের পর উদ্বৃত্ত দুধ, ডিম ও মাংস বিদেশে রপ্তানির সুযোগ আরও বাড়বে।
প্রাণিজ পণ্যের রপ্তানি আয়ে সাম্প্রতিক উল্লম্ফন বাংলাদেশের জন্য নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিচ্ছে। তবে এ প্রবৃদ্ধিকে স্থায়ী করতে হলে উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মান নিশ্চিত করা, আধুনিক সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং নতুন বাজারে প্রবেশের সক্ষমতা অর্জন করতে হবে।
বিশেষ করে বিশ্বব্যাপী হালাল খাদ্যের বাজার সম্প্রসারিত হওয়ার প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ কতটা প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান তৈরি করতে পারে, সেটিই আগামী দিনে প্রাণিসম্পদ খাতের রপ্তানি সাফল্য নির্ধারণ করবে।

