যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানিতে আবারও নিম্নমুখী প্রবণতা দেখা দিয়েছে। চলতি বছরের প্রথম নয় মাসে দেশটিতে পোশাক রপ্তানি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৪ দশমিক ৩০ শতাংশ কমেছে। রপ্তানি আয়ের পাশাপাশি পোশাকের পরিমাণও কমেছে। দেশের অভ্যন্তরীণ সরবরাহব্যবস্থার জটিলতা, জ্বালানিসংকট এবং শিল্পকারখানায় অস্থিরতাকে এই পরিস্থিতির অন্যতম কারণ হিসেবে দেখছেন খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
অন্যদিকে একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের সামগ্রিক পোশাক আমদানি কমলেও বাংলাদেশের প্রতিযোগী ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়া তুলনামূলক ভালো অবস্থান ধরে রেখেছে। বিশেষ করে কম্বোডিয়া রপ্তানি আয় ও পরিমাণ উভয় ক্ষেত্রেই প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। ফলে গুরুত্বপূর্ণ এই বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের বস্ত্র ও পোশাকবিষয়ক দপ্তরের প্রকাশিত বাণিজ্য পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রে ৬১৩ কোটি ডলারের তৈরি পোশাক রপ্তানি করেছে। এ সময়ে রপ্তানি হয়েছে ১৯৯ কোটি বর্গমিটার পোশাক।
২০২৫ সালের একই সময়ে বাংলাদেশের রপ্তানি আয় ছিল ৬৪১ কোটি ডলার। তখন যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি হয়েছিল ২০৬ কোটি বর্গমিটার পোশাক। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে রপ্তানি আয় কমেছে প্রায় ২৮ কোটি ডলার। একই সঙ্গে রপ্তানি করা পোশাকের পরিমাণও প্রায় ৭ কোটি বর্গমিটার কমেছে।
প্রকাশিত প্রতিবেদনে বাংলাদেশের পোশাকের গড় একক মূল্য সম্পর্কেও তথ্য দেওয়া হয়েছে। সেখানে চলতি বছরের গড় মূল্য প্রতি বর্গমিটারে ৩ দশমিক ১০ ডলার এবং আগের বছরের একই সময়ে ৩ দশমিক ০৭ ডলার উল্লেখ করা হয়েছে। যদিও প্রতিবেদনে গড় মূল্য প্রায় ১ শতাংশ কমার কথা বলা হয়েছে, উল্লিখিত দুটি সংখ্যার হিসাবে বরং সামান্য বৃদ্ধি দেখা যায়। ফলে গড় মূল্যসংক্রান্ত তথ্যের এই অসংগতি সংশ্লিষ্ট মূল পরিসংখ্যানের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা প্রয়োজন।
বাংলাদেশের রপ্তানি কমার বিপরীতে ভিয়েতনাম যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে শক্ত অবস্থান ধরে রেখেছে। চলতি বছরের প্রথম নয় মাসে দেশটি যুক্তরাষ্ট্রে ১ হাজার ২৭৮ কোটি ডলারের তৈরি পোশাক রপ্তানি করেছে। এ সময়ে ভিয়েতনামের রপ্তানি করা পোশাকের পরিমাণ ছিল ৩৫৬ কোটি বর্গমিটার।
ভিয়েতনামের রপ্তানি আয় আগের বছরের তুলনায় ১ শতাংশের কম বেড়েছে। রপ্তানির পরিমাণ সামান্য কমলেও পোশাকের গড় মূল্য ১ দশমিক ২৫ শতাংশ বৃদ্ধি পাওয়ায় দেশটি আয় ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে। এর মাধ্যমে উচ্চমূল্যের পণ্য রপ্তানি ও মূল্য প্রতিযোগিতায় ভিয়েতনামের তুলনামূলক শক্ত অবস্থান ফুটে উঠেছে।
অন্যদিকে কম্বোডিয়া এই সময়ে আরও ভালো প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশটি যুক্তরাষ্ট্রে ৩৮০ কোটি ডলারের তৈরি পোশাক রপ্তানি করেছে, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৬ দশমিক ৬৭ শতাংশ বেশি।
রপ্তানির পরিমাণের দিক থেকেও কম্বোডিয়া এগিয়েছে। নয় মাসে দেশটি যুক্তরাষ্ট্রে ১২৫ কোটি বর্গমিটার পোশাক রপ্তানি করেছে। আগের বছরের তুলনায় এই পরিমাণ বেড়েছে ৬ দশমিক ০৩ শতাংশ।
যুক্তরাষ্ট্রের সামগ্রিক পোশাক আমদানি যেখানে ৬ দশমিক ১৪ শতাংশ কমেছে, সেখানে ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়ার ইতিবাচক ফলাফল বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। কারণ, বাজার সংকুচিত হওয়ার মধ্যেও দেশ দুটি নিজেদের রপ্তানি আয় বাড়াতে সক্ষম হয়েছে।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে শুধু বাংলাদেশ নয়, আরও কয়েকটি বড় পোশাক রপ্তানিকারক দেশ উল্লেখযোগ্য চাপের মুখে পড়েছে। বিশেষ করে চীন ও ভারতের রপ্তানিতে বড় ধরনের পতন দেখা গেছে।
চলতি বছরের প্রথম নয় মাসে যুক্তরাষ্ট্রে চীনের তৈরি পোশাক রপ্তানি প্রায় ২৩ শতাংশ কমে ৬৭৫ কোটি ডলারে দাঁড়িয়েছে। প্রধান রপ্তানিকারক দেশগুলোর মধ্যে চীনের রপ্তানিতে এটি অন্যতম বড় পতন।
একই সময়ে ভারতের পোশাক রপ্তানি ২৫ শতাংশের বেশি কমে ৩০৭ কোটি ডলারে নেমেছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে চীন ও ভারতের অবস্থান দুর্বল হলেও সেই সুযোগ পুরোপুরি কাজে লাগাতে পারেনি বাংলাদেশ।
শিল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, বাংলাদেশের পোশাক খাতের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ধরে রাখার ক্ষেত্রে দেশের অভ্যন্তরীণ কয়েকটি সমস্যা বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে কাঁচামাল সংগ্রহে জটিলতা, নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহের অভাব এবং সময়মতো পণ্য উৎপাদন ও সরবরাহের অনিশ্চয়তা বিদেশি ক্রেতাদের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলছে।
এ ছাড়া বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানির বড় অংশ এখনো তুলনামূলক কম দামের সাধারণ পণ্যের ওপর নির্ভরশীল। ফলে উচ্চমূল্যের ও বৈচিত্র্যময় পোশাকের বাজারে প্রতিযোগীদের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে।
খাতবিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, পণ্যের বৈচিত্র্য বাড়ানো এবং উচ্চমূল্যের পোশাক উৎপাদনে বিনিয়োগের পাশাপাশি কারখানার উৎপাদন ও সরবরাহের সময় কমানো জরুরি। এসব ক্ষেত্রে উন্নতি না হলে যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান আরও দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এ বিষয়ে হান্নান ফ্যাশনস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির পরিচালক এ বি এম শামসুদ্দিন বলেন, কয়েক বছর ধরেই যুক্তরাষ্ট্রে চীনের পোশাক রপ্তানি কমছে। কিন্তু বিভিন্ন কারণে বাংলাদেশ সেই সুযোগ যথাযথভাবে কাজে লাগাতে পারছে না। এর পেছনে দেশের অভ্যন্তরীণ সমস্যাগুলোই বড় ভূমিকা রাখছে বলে মনে করেন তিনি।
শামসুদ্দিন জানান, অনেক আন্তর্জাতিক ক্রেতা নির্দিষ্ট উৎস থেকে সুতা সংগ্রহের শর্ত দিয়ে থাকেন। ইউরোপীয় ইউনিয়নের অনেক বড় ক্রেতার মতো যুক্তরাষ্ট্রের বাজারের কিছু ক্রেতাও ভারত থেকে সুতা সংগ্রহের নির্দেশনা দেন।
কিন্তু স্থলবন্দর দিয়ে সুতা আমদানির ওপর বিধিনিষেধ এবং সম্প্রতি ১০ থেকে ৩০ কাউন্টের সুতা আমদানিতে বন্ড সুবিধার বাইরে আনার ব্যবস্থা পোশাকশিল্পের জন্য নতুন জটিলতা তৈরি করেছে বলে তিনি মনে করেন।
তার মতে, এসব সিদ্ধান্ত কাঁচামাল সংগ্রহের প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করছে। ফলে নির্ধারিত সময়ে উৎপাদন সম্পন্ন করা এবং বিদেশি ক্রেতাদের কাছে পণ্য পৌঁছে দেওয়া আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
দেশের পোশাকশিল্পে চলমান অস্থিরতার বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে তুলে ধরেছেন এই শিল্পোদ্যোক্তা। তার অভিযোগ, বিভিন্ন কারখানায় অযৌক্তিক অস্থিরতার কারণে বিদেশি ক্রেতাদের কিছু ক্রয়াদেশ বাংলাদেশ থেকে অন্য দেশে চলে যাচ্ছে।
তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক ক্রেতারা সব সময় নির্ধারিত সময়ে এবং নিরাপদে পণ্য সরবরাহের নিশ্চয়তা চান। কোনো দেশে উৎপাদন কার্যক্রম ব্যাহত হলে ক্রেতারা বিকল্প উৎসের দিকে ঝুঁকতে পারেন।
শামসুদ্দিন আরও জানান, বর্তমানে পরবর্তী মৌসুমের ক্রয়াদেশ পাওয়ার গুরুত্বপূর্ণ সময় চলছে। অথচ চলমান অস্থিরতার কারণে শত শত কারখানা স্বাভাবিকভাবে উৎপাদন কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারেনি বলে তিনি দাবি করেন।
এমন পরিস্থিতিতে নতুন ক্রয়াদেশ পাওয়ার সুযোগ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন শিল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক বাজারে যখন প্রতিযোগী দেশগুলো উৎপাদন ও সরবরাহব্যবস্থা শক্তিশালী করছে, তখন বাংলাদেশের কারখানাগুলোর কার্যক্রমে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়া রপ্তানির জন্য উদ্বেগের বিষয়।
যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানি বাজার। ফলে এই বাজারে রপ্তানি কমে যাওয়ার প্রভাব দেশের সামগ্রিক পোশাকশিল্প, বৈদেশিক মুদ্রা আয় এবং শিল্প খাতের কর্মসংস্থানের ওপর পড়তে পারে।
তবে শুধু আন্তর্জাতিক বাজারের চাহিদা কমে যাওয়াকে বাংলাদেশের রপ্তানি হ্রাসের একমাত্র কারণ হিসেবে দেখছেন না সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। তাদের মতে, দেশের অভ্যন্তরীণ সরবরাহব্যবস্থা উন্নত করা, কাঁচামাল আমদানির বাধা কমানো, জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং কারখানায় স্থিতিশীল পরিবেশ বজায় রাখা সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
একই সঙ্গে কম দামের প্রচলিত পোশাকের পাশাপাশি উচ্চমূল্যের ও বৈচিত্র্যময় পণ্য উৎপাদনের সক্ষমতা বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে। এতে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা শক্তিশালী হওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
সব মিলিয়ে ২০২৬ সালের প্রথম নয় মাসের রপ্তানি পরিসংখ্যান বলছে, যুক্তরাষ্ট্রের পোশাক বাজারে বাংলাদেশ চাপের মুখে রয়েছে। চীন ও ভারতের রপ্তানি কমলেও ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়ার প্রবৃদ্ধি প্রমাণ করছে, সংকুচিত বাজারেও রপ্তানি বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। সেই সুযোগ কাজে লাগাতে বাংলাদেশের পোশাকশিল্পে উৎপাদন, কাঁচামাল সরবরাহ, পণ্যের বৈচিত্র্য এবং সময়মতো ক্রয়াদেশ বাস্তবায়নের ওপর আরও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

