দেশের অন্যতম বৃহৎ ভোগ্যপণ্য উৎপাদন ও বিপণনকারী প্রতিষ্ঠান সিটি গ্রুপ বিপুল ঋণের চাপ সামাল দিতে বড় ধরনের আর্থিক পুনর্গঠনের পরিকল্পনা করছে। প্রতিষ্ঠানটি নিজেদের কিছু কারখানা, জমি ও অন্যান্য ব্যবসায়িক সম্পদ বিক্রির পাশাপাশি কয়েকটি ব্যবসার শেয়ার সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কাছে ছাড়ার বিষয়েও ভাবছে। মূল উদ্দেশ্য হলো ঋণের বোঝা কমিয়ে ব্যবসায়িক কার্যক্রমকে আবার লাভজনক অবস্থায় ফিরিয়ে আনা।
বর্তমানে সিটি গ্রুপের মোট বকেয়া ঋণের পরিমাণ প্রায় ২৬ হাজার কোটি টাকা। দেশের ৪৮টি ব্যাংক ও অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে এই ঋণ নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে একাধিক ঋণদাতা প্রতিষ্ঠান সিটি গ্রুপকে দেওয়া ঋণের কিছু অংশ খেলাপি বা শ্রেণিকৃত হিসেবে চিহ্নিত করেছে। ফলে প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
ক্রমবর্ধমান ঋণের চাপ মোকাবিলায় সিটি গ্রুপ এখন এমন কিছু সম্পদ বিক্রির পরিকল্পনা করছে, যেগুলো থেকে প্রত্যাশিত আয় আসছে না কিংবা যেগুলো প্রতিষ্ঠানটির মূল ব্যবসার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত নয়।
সম্প্রতি আটটি ব্যাংকের সমন্বয়ে গঠিত একটি ঋণদাতা জোট থেকে নতুন করে ৩ হাজার কোটি টাকা ঋণের ব্যবস্থা করেছে সিটি গ্রুপ। বাংলাদেশ ব্যাংক ১৯৯১ সালের একটি আইনের বিধান শিথিল করার পর প্রতিষ্ঠানটি এই ঋণ নেওয়ার সুযোগ পেয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, সিটি গ্রুপের পাঁচটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান আগের ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হয়ে খেলাপি অবস্থায় রয়েছে। সাধারণ পরিস্থিতিতে এমন অবস্থায় নতুন ঋণ পাওয়া কঠিন হতে পারে। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দেওয়া বিশেষ ছাড়ের কারণে আগামী বছরের শেষ পর্যন্ত নতুন ঋণ গ্রহণের সুযোগ পাচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি।
নতুন ঋণের অর্থ ব্যবহার করে ব্যবসায়িক কার্যক্রম সচল রাখা এবং উৎপাদন ও বিপণন থেকে আয় বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে সিটি গ্রুপের। প্রতিষ্ঠানটি আশা করছে, ব্যবসা আবার লাভজনক হলে সেই আয় দিয়ে বকেয়া ঋণের একটি অংশ পরিশোধ করা সম্ভব হবে।
তবে শুধু নতুন ঋণ নিয়ে বর্তমান সংকট মোকাবিলা করা যথেষ্ট হবে না বলে মনে করছে প্রতিষ্ঠানটি। এ কারণেই বড় অঙ্কের অর্থ সংগ্রহের জন্য সম্পদ বিক্রির উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
এই পরিকল্পনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ মুন্সিগঞ্জের গজারিয়ায় অবস্থিত হোসেন্দী অর্থনৈতিক অঞ্চল। সিটি গ্রুপ সেখানে গড়ে তোলা ছয় থেকে সাতটি কারখানা ও প্রকল্প বিক্রি করে ১০ হাজার থেকে ১২ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে।
২০২২ সালের নভেম্বরে সিটি গ্রুপ ১০৮ একর জমির ওপর এই বেসরকারি অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠা করে। প্রকল্পটি বাস্তবায়নে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করা হয়েছিল।
বড় অঙ্কের বিনিয়োগের মাধ্যমে গড়ে তোলা হলেও অর্থনৈতিক অঞ্চলটি থেকে এখন পর্যন্ত উল্লেখযোগ্য আয় করতে পারেনি প্রতিষ্ঠানটি। এর অন্যতম কারণ হিসেবে গ্যাসসংকটকে চিহ্নিত করা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, অর্থনৈতিক অঞ্চলে স্থাপিত ছয়টি কারখানা এখনো অধিকাংশ সময় অলস পড়ে থাকছে। পর্যাপ্ত গ্যাস সরবরাহ না থাকায় কারখানাগুলো প্রত্যাশিত মাত্রায় উৎপাদন চালাতে পারছে না। অথচ উৎপাদন সীমিত থাকলেও এসব স্থাপনার রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচালনসংক্রান্ত ব্যয় অব্যাহত রয়েছে।
ফলে যেসব কারখানা থেকে নিয়মিত আয় হওয়ার কথা ছিল, সেগুলো উল্টো প্রতিষ্ঠানের আর্থিক চাপ বাড়াচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে এসব প্রকল্প ধরে রাখার পরিবর্তে বিক্রি করে ঋণ পরিশোধের জন্য অর্থ সংগ্রহকে সম্ভাব্য সমাধান হিসেবে বিবেচনা করছে সিটি গ্রুপ।
শুধু হোসেন্দী অর্থনৈতিক অঞ্চল নয়, দেশের অন্যান্য এলাকায় থাকা জমি ও ব্যবসায়িক সম্পদ বিক্রির মাধ্যমেও অর্থ সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির।
সিটি গ্রুপের লক্ষ্য, এসব সম্পদ বিক্রি করে আরও প্রায় ৪ হাজার ৮০০ কোটি টাকা পাওয়া। বিক্রির জন্য বিবেচনাধীন সম্পদের মধ্যে রয়েছে চট্টগ্রামের একটি চা-বাগান, তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের ব্যবসা এবং একটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল।
চট্টগ্রামের চা-বাগানটি ২০১৫ সালে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাকের কাছ থেকে ১২০ কোটি টাকায় কিনেছিল সিটি গ্রুপ। এখন ঋণ কমানোর পরিকল্পনার অংশ হিসেবে সেই সম্পদও বিক্রির সম্ভাবনা বিবেচনা করা হচ্ছে।
প্রতিষ্ঠানটির মূল লক্ষ্য হলো, যেসব ব্যবসা থেকে পর্যাপ্ত মুনাফা আসছে না কিংবা যেগুলো মূল কার্যক্রমের বাইরে রয়েছে, সেগুলো থেকে বিনিয়োগ প্রত্যাহার করা। এর মাধ্যমে সংগৃহীত অর্থ বকেয়া ঋণ পরিশোধে ব্যবহার করা হবে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী হোসেন্দী অর্থনৈতিক অঞ্চলের কারখানা ও প্রকল্প বিক্রি থেকে ১০ হাজার থেকে ১২ হাজার কোটি টাকা এবং অন্যান্য সম্পদ থেকে আরও ৪ হাজার ৮০০ কোটি টাকা পাওয়া গেলে মোট ১৪ হাজার ৮০০ থেকে ১৬ হাজার ৮০০ কোটি টাকা সংগ্রহের সম্ভাবনা রয়েছে।
তবে এটি কেবল পরিকল্পিত অর্থ সংগ্রহের হিসাব। এসব সম্পদ বিক্রি নিশ্চিত হয়নি এবং বিক্রির পর প্রকৃতপক্ষে কত টাকা পাওয়া যাবে, তা নির্ভর করবে ক্রেতার আগ্রহ ও চূড়ান্ত দরদামের ওপর।
এ ছাড়া সিটি গ্রুপের কয়েকটি ব্যবসাকে শেয়ারবাজারে আনার পরিকল্পনার কথাও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এর মাধ্যমে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কাছে শেয়ার ছেড়ে নতুন মূলধন সংগ্রহের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
তবে কোন কোন ব্যবসার শেয়ার ছাড়া হবে, কত অর্থ সংগ্রহের লক্ষ্য রয়েছে কিংবা কবে নাগাদ শেয়ারবাজারে আসার উদ্যোগ নেওয়া হবে, সে বিষয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বিস্তারিত তথ্য দেওয়া হয়নি।
অন্যদিকে বিপুল পরিমাণ সম্পদ বিক্রির পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করাও সহজ হবে না। বিশেষ করে বড় শিল্পকারখানা, অর্থনৈতিক অঞ্চলের প্রকল্প কিংবা অন্যান্য ব্যবসায়িক সম্পদের জন্য উপযুক্ত ক্রেতা খুঁজে পাওয়া সময়সাপেক্ষ হতে পারে।
এ ক্ষেত্রে সম্পদের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করাও একটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ। আর্থিক চাপের মধ্যে দ্রুত সম্পদ বিক্রির প্রয়োজন হলে প্রত্যাশিত দাম পাওয়া কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
বিশেষ করে গ্যাসসংকটের কারণে যেসব কারখানা স্বাভাবিক উৎপাদনে যেতে পারছে না, সেগুলোর ভবিষ্যৎ আয় ও পরিচালনক্ষমতা সম্ভাব্য ক্রেতাদের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলতে পারে।
সিটি গ্রুপের সামনে এখন দুটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য রয়েছে। একদিকে চলমান ব্যবসাগুলোকে লাভজনক করে তুলতে হবে, অন্যদিকে ঋণের চাপ কমাতে প্রয়োজনীয় অর্থ সংগ্রহ করতে হবে। এই দুটি লক্ষ্য বাস্তবায়নের ওপর প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক পুনর্গঠনের সাফল্য অনেকাংশে নির্ভর করবে।
নতুন ৩ হাজার কোটি টাকার ঋণ প্রতিষ্ঠানটির ব্যবসায়িক কার্যক্রমে সাময়িক স্বস্তি দিতে পারে। তবে দীর্ঘমেয়াদে ঋণের বোঝা কমাতে সম্পদ বিক্রি, ব্যবসার আয় বৃদ্ধি এবং আর্থিক ব্যবস্থাপনায় কার্যকর পরিবর্তন প্রয়োজন হবে।
সব মিলিয়ে সিটি গ্রুপের বর্তমান পরিকল্পনা দেশের অন্যতম বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠীর আর্থিক পুনর্গঠনের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হিসেবে সামনে এসেছে। প্রায় ২৬ হাজার কোটি টাকার বকেয়া ঋণ সামাল দিতে প্রতিষ্ঠানটি বড় অঙ্কের সম্পদ বিক্রির পথে হাঁটতে চাইছে। তবে পরিকল্পনা অনুযায়ী ক্রেতা পাওয়া, ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করা এবং ব্যবসায়িক কার্যক্রমকে আবার লাভজনক অবস্থায় ফিরিয়ে আনাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
সূত্র: ডেইলি সান

