২০৩০ সালের মধ্যে চট্টগ্রাম বন্দরকে প্রতিযোগিতামূলক আঞ্চলিক শিপিং হাবে রূপ দিতে বড় পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে সরকার। এ লক্ষ্যে বন্দর পরিচালনায় আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানকে যুক্ত করা, নতুন টার্মিনাল নির্মাণ, অবকাঠামো আধুনিকায়ন এবং ডিজিটাল সেবা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রকল্পগুলো বাস্তবায়িত হলে বন্দরের পণ্য ও কনটেইনার সামলানোর সক্ষমতা বাড়বে। একই সঙ্গে জাহাজের অপেক্ষার সময় এবং পণ্য খালাসের খরচ কমবে বলে আশা করছে বন্দর কর্তৃপক্ষ।
এই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল পরিচালনায় সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে ১৫ বছর মেয়াদি চুক্তি হয়েছে। অন্যদিকে ৫৫ কোটি মার্কিন ডলার বিনিয়োগে লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনাল নির্মাণ করছে ডেনমার্কভিত্তিক প্রতিষ্ঠান এপিএম টার্মিনালস। পাশাপাশি বে টার্মিনাল ও মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণের কাজ এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। এসব উদ্যোগের সঙ্গে সিঙ্গাপুরের পোর্ট অব সিঙ্গাপুর অথরিটির অংশীদারত্বের বিষয়টিও যুক্ত হয়েছে।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব সৈয়দ রেফায়েত হামিম জানান, বিশ্বখ্যাত প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অংশীদারত্ব, অবকাঠামো উন্নয়ন, আধুনিক যন্ত্রপাতি সংযোজন ও ডিজিটাল রূপান্তরের মাধ্যমে বন্দরকে আরও দক্ষ ও সক্ষম করার পরিকল্পনা রয়েছে। লক্ষ্য, ২০৩০ সালের মধ্যে একে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের কার্যকর প্রবেশদ্বারে পরিণত করা।
এই বন্দরের গুরুত্ব বোঝা যায় দেশের বাণিজ্যে এর ভূমিকা দেখলেই। সমুদ্রপথে দেশের সাধারণ পণ্যের প্রায় ৯২ শতাংশ এবং কনটেইনারের প্রায় ৯৮ শতাংশ আসা-যাওয়া করে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে। ফলে বন্দরের সক্ষমতা ও কার্যদক্ষতার সঙ্গে আমদানি-রপ্তানির খরচ এবং দেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা সরাসরি জড়িত।
বন্দর সূত্র জানায়, ২০২৫ সালে চট্টগ্রাম বন্দরে রেকর্ড ৩৪ লাখ টিইইউস কনটেইনার, ১৩ কোটি ৮০ লাখ টন সাধারণ পণ্য এবং ৪ হাজার ২৭৩টি জাহাজ হ্যান্ডলিং হয়েছে। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত কনটেইনার হ্যান্ডলিং হয়েছে প্রায় ২১ লাখ ৪০ হাজার টিইইউস।
তবে পণ্যের পরিমাণ বাড়লেও পরিচালনগত সীমাবদ্ধতা এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। উন্নত বন্দরে কনটেইনার সাধারণত দুই দিনের কম সময় পড়ে থাকে। চট্টগ্রামে এ সময় ৯ দিনের বেশি। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী জাহাজের গড় অবস্থানকালও আড়াই দিনের বেশি হওয়া উচিত নয়।
অতীতে একটি জাহাজের পণ্য ওঠানামা শেষ করে বন্দর ছাড়তে ১০ থেকে ১৫ দিন পর্যন্ত লেগে যেত। এ দীর্ঘসূত্রতার কারণে আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত অনেক মেইন লাইন অপারেটর বাংলাদেশে জাহাজ ও কনটেইনার পাঠাতে আগ্রহ দেখায়নি। এখন জাহাজের অবস্থানকাল ও কনটেইনারের ডুয়েল টাইম কমানোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।
গত ৮ অক্টোবর বন্দর কর্তৃপক্ষ ও ডিপি ওয়ার্ল্ডের মধ্যে ১৫ বছর মেয়াদি কনসেশন চুক্তি সই হয়েছে। চুক্তি অনুযায়ী, বন্দরের মোট কনটেইনারের প্রায় ৪৪ শতাংশ সামলানো নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনালের ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব পাবে প্রতিষ্ঠানটি। তবে বন্দরের জমি, সম্পদ ও সার্বভৌম কর্তৃত্ব থাকবে বাংলাদেশ সরকারের হাতেই।
চুক্তির আর্থিক শর্তে ডিপি ওয়ার্ল্ডের অগ্রিম প্রায় ৬০০ কোটি টাকা দেওয়ার কথা রয়েছে। এর ২৫ শতাংশ চুক্তি সইয়ের সময় এবং বাকি ৭৫ শতাংশ কার্যক্রম শুরুর আগে পরিশোধ করতে হবে। এ ছাড়া প্রথম ১০ বছরে আধুনিক যন্ত্রপাতি ও প্রযুক্তি উন্নয়নে এক হাজার কোটি টাকার বেশি বিনিয়োগ করবে প্রতিষ্ঠানটি।
প্রতি টিইইউস কনটেইনারের বিপরীতে বন্দর কর্তৃপক্ষ ৪০ থেকে ৬৭ শতাংশ হারে রয়্যালটি পাবে। পাশাপাশি বছরে প্রায় ১০ কোটি টাকা নির্ধারিত ফি দেবে ডিপি ওয়ার্ল্ড। চুক্তিতে বছরে ন্যূনতম ১২ লাখ ৩০ হাজার টিইইউস কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের নিশ্চয়তাও রাখা হয়েছে।
কাজের মান ধরে রাখতে ক্রেনের উৎপাদনশীলতা ও ট্রাকের টার্নঅ্যারাউন্ড টাইমসহ বিভিন্ন সূচকে লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করা হয়েছে। টানা তিন মাস নির্ধারিত মান অর্জনে ব্যর্থ হলে আর্থিক জরিমানার বিধান আছে। স্থানীয় জনশক্তির কর্মসংস্থান, কর্মীদের প্রশিক্ষণ, সাইবার নিরাপত্তা এবং তথ্য দেশের ভেতরে সংরক্ষণের শর্তও চুক্তিতে রাখা হয়েছে।
নিউমুরিং টার্মিনালের পাশাপাশি লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনালেও বড় বিনিয়োগ আসছে। এপিএম টার্মিনালসের ৫৫ কোটি ডলারে নির্মিত এই টার্মিনালের কাজ ২০৩০ সালের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা। চালু হলে বছরে আট লাখের বেশি টিইইউস কনটেইনার সামলানো যাবে। এতে দেশের সামগ্রিক পণ্য পরিবহন সক্ষমতা প্রায় ৪০ শতাংশ বাড়বে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে।
এদিকে ১৩ হাজার ৫২৫ কোটি টাকা ব্যয়ে বে টার্মিনাল প্রকল্প অনুমোদন করেছে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক)। প্রকল্পের মেয়াদ ২০৩১ সালের জুন পর্যন্ত। এর আওতায় ব্রেকওয়াটার, নেভিগেশন চ্যানেল, জেটি এবং সড়ক ও রেল যোগাযোগ অবকাঠামো তৈরি করা হবে।
প্রকল্প চালু হলে আট হাজার থেকে ১২ হাজার টিইইউস ধারণক্ষমতার বড় জাহাজ ভেড়ানো সম্ভব হবে। বন্দরের বার্ষিক কনটেইনার হ্যান্ডলিং সক্ষমতাও বাড়বে ৩০ লাখ টিইইউস। বড় ড্রাফটের জাহাজ ভেড়ানোর সুযোগ তৈরি এবং মূল বন্দরের চাপ কমাতে মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণও এগিয়ে চলছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক জাপান সফরে দেশটি মাতারবাড়ী বন্দরে অংশগ্রহণ ও বিনিয়োগের আগ্রহ জানিয়েছে। বঙ্গোপসাগর শিল্প প্রবৃদ্ধি বলয় কাঠামোর আওতায় এ উদ্যোগ বাস্তবায়নের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
এ ছাড়া অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এবং নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলমের উপস্থিতিতে সিঙ্গাপুরের পোর্ট অব সিঙ্গাপুর অথরিটির সঙ্গে সমঝোতা স্মারক সই করেছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ।
অবকাঠামোর পাশাপাশি বন্দরের কার্যক্রম কাগজবিহীন করতে ডিজিটাল রূপান্তরেও জোর দেওয়া হচ্ছে। বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব জানান, আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে সব কার্যক্রম কাগজবিহীন স্মার্ট ব্যবস্থার আওতায় আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
ইতিমধ্যে পণ্য খালাসের নথিপত্র প্রক্রিয়ায় ম্যানুয়াল হস্তক্ষেপ বন্ধ করা হয়েছে। ডেলিভারি অর্ডারের আবেদন থেকে শুরু করে বন্দরের গেট দিয়ে পণ্যবাহী যানের বেরিয়ে যাওয়া পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়া স্বয়ংক্রিয় টার্মিনাল অপারেটিং সিস্টেমের আওতায় এসেছে।
এ ব্যবস্থায় কোনো ধাপ এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ বন্ধ করতে ধারাবাহিক যাচাইব্যবস্থা রাখা হয়েছে। এর ফলে নথি জালিয়াতি ও প্রশাসনিক অনিয়মের সুযোগ কমছে। ব্যবসায়ী ও সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টরাও দূর থেকে ফাইলের সর্বশেষ অবস্থা জানতে পারছেন।
টার্মিনাল অপারেটিং সিস্টেমের সঙ্গে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের অ্যাসাইকুডা ওয়ার্ল্ড ব্যবস্থার তাৎক্ষণিক সংযোগও স্থাপন করা হয়েছে। শুল্ক কর্তৃপক্ষ কোনো কনটেইনার আটকে রাখার নির্দেশ দিলে সেই তথ্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে বন্দরের ব্যবস্থাপনায় পৌঁছে যায়। শুল্ক বিভাগের ছাড়পত্র না পাওয়া পর্যন্ত ওই কনটেইনারের পরবর্তী কার্যক্রম বন্ধ থাকে।
সেবা সহজ করতে সম্প্রতি ওয়ান-স্টপ সার্ভিস সেন্টার চালু হয়েছে। এর সঙ্গে সোনালী ব্যাংকের এপিআই সংযোগ স্থাপন করা হয়েছে। ফলে কনটেইনার ও পণ্যগ্রহীতাদের বিলিং কার্যক্রম টার্মিনাল অপারেটিং সিস্টেমের সঙ্গে যুক্ত করার কাজ এগিয়ে চলছে। বন্দরের কাজে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ নিশ্চিত করতে জিজিআই পোলার পাওয়ার প্ল্যান্টের সঙ্গেও বিদ্যুৎ সরবরাহ চুক্তি হয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, আন্তর্জাতিক অপারেটরদের অংশগ্রহণ ও নতুন অবকাঠামো বন্দরের সক্ষমতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি করবে। তবে এর সুফল পেতে প্রকল্পগুলো সময়মতো বাস্তবায়ন, দক্ষ জনবল তৈরি, শুল্ক ও পরিবহন ব্যবস্থার সমন্বয় এবং বন্দরের প্রবেশ ও বহির্গমন পথে যানজট কমানো জরুরি। একই সঙ্গে জাহাজের অবস্থানকাল ও কনটেইনারের ডুয়েল টাইম কমাতে না পারলে আঞ্চলিক শিপিং হাব হওয়ার লক্ষ্য অর্জন কঠিন হবে।

