দেশের অর্থনীতিতে সামষ্টিক স্থিতিশীলতা কিছুটা ফিরলেও নতুন বিনিয়োগ ও উৎপাদন বাড়ানোর পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে তিনটি বিষয়। ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা, জ্বালানিসংকট এবং কর প্রশাসনের জটিলতা। বিশ্বব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন মনে করেন, বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরাতে হলে এসব জায়গায় জরুরি সংস্কার প্রয়োজন।
তাঁর মতে, অর্থনীতি এখন বেশ কঠিন সময় পার করছে। এর পেছনে যেমন বৈশ্বিক সংকট রয়েছে, তেমনি আছে অভ্যন্তরীণ সমস্যাও। বৈশ্বিক সংকট দেশের নিয়ন্ত্রণে নেই। কিন্তু অভ্যন্তরীণ সমস্যাগুলো মোকাবিলায় কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া সম্ভব। সেই লক্ষ্যে সামষ্টিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা ঠিক রাখার পাশাপাশি ব্যাংকিং খাতের সংস্কার ও জ্বালানি সরবরাহের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করাকেই তিনি বিনিয়োগ ও উৎপাদন বাড়ানোর প্রধান শর্ত হিসেবে দেখছেন।
ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা সরাসরি আঘাত করছে বিনিয়োগ ও শিল্পায়নে। বিশেষ করে রপ্তানিমুখী শিল্পের জন্য সময়মতো আমদানি ঋণপত্র বা এলসি খোলা অত্যন্ত জরুরি। একটি প্রতিষ্ঠান এলসি খুলে কাঁচামাল, সুতা, তুলা বা কাপড় আমদানি করে। এরপর সেগুলো দিয়ে পণ্য তৈরি করে বিদেশে রপ্তানি করে। ব্যাংকিং ব্যবস্থার দুর্বলতায় এই চক্রে বিঘ্ন ঘটলে উৎপাদন ও রপ্তানি, দুটিই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাই নতুন বিনিয়োগ ও চলমান উৎপাদন টিকিয়ে রাখতে ব্যাংকিং খাতের সংস্কারকে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত বলে মনে করেন তিনি।
জ্বালানিসংকটের সমাধানও সমান জরুরি। কারখানাগুলো যেন প্রয়োজনীয় গ্যাস পায় এবং বিদ্যুৎ সরবরাহে বিঘ্ন ঘটে উৎপাদনশীলতা যেন না কমে, তা নিশ্চিত করতে হবে। জাহিদ হোসেনের ভাষ্য, অনিশ্চিত জ্বালানি পরিবেশে বিনিয়োগকারীরা নতুন সিদ্ধান্ত নিতে স্বস্তি পান না। বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ গড়তে তাই নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ অপরিহার্য।
কর প্রশাসন ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কাঠামোগত সংস্কারও বিনিয়োগের পরিবেশের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। তাঁর মতে, বিনিয়োগের সুষ্ঠু পরিবেশের জন্য প্রয়োজন একটি আস্থাভাজন ও স্বচ্ছ কর প্রশাসন। এ জন্য দুটি বড় সংস্কারের কথা বলেছেন তিনি।
প্রথম সংস্কার হলো নীতি ও আদায়ের কাজ আলাদা করা। বর্তমানে যে প্রতিষ্ঠান করনীতি তৈরি করছে, সেই প্রতিষ্ঠানই কর আদায় করছে। এতে স্বার্থের সংঘাত তৈরি হয়। কাস্টমস, ভ্যাট ও আয়কর ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘ অভিজ্ঞতাসম্পন্ন পেশাদারদের নিয়ে নীতিনির্ধারণ ও কর আদায় কার্যক্রম পৃথক করার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।
দ্বিতীয় সংস্কার হলো কর প্রশাসনকে ভৌগোলিক ভিত্তির বদলে কাজের ধরন অনুযায়ী সাজানো। যেমন কর নিরীক্ষা, কর নির্ধারণ ও বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য আলাদা বিশেষায়িত বিভাগ থাকবে। পাশাপাশি আয়কর, ভ্যাট ও কাস্টমস বিভাগের তথ্যভান্ডার একীভূত করা গেলে একই ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের তথ্য সহজে যাচাই করা যাবে। এতে কর ফাঁকি রোধেও সহায়তা মিলবে।
আগামী দুই থেকে তিন বছরে বিনিয়োগ ও সামগ্রিক স্থিতিশীলতা ধরে রাখতে তিনটি বিষয়কে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন এই অর্থনীতিবিদ। এগুলো হলো সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, ব্যাংকিং খাতের সংস্কার এবং জ্বালানিসংকটের স্থায়ী সমাধান।
দীর্ঘমেয়াদে দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তুলতে শিক্ষা খাতের মানোন্নয়নের ওপরও জোর দিয়েছেন তিনি। তাঁর মতে, অর্থনীতির মূল শক্তি তরুণ জনগোষ্ঠী। প্রতিবছর শ্রমবাজারে যোগ হওয়া লাখ লাখ তরুণকে আধুনিক ও মৌলিক শিক্ষায় দক্ষ করে তোলা না গেলে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক ও বিনিয়োগ প্রবৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হবে।
সামষ্টিক অর্থনীতিতে সাম্প্রতিক সময়ে কিছুটা স্বস্তির কথাও জানিয়েছেন তিনি। বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার মোটামুটি স্থিতিশীল রয়েছে। রিজার্ভ উঠেছে ৩১ বিলিয়ন ডলারের ওপরে। এই স্থিতিশীলতা ধরে রাখা জরুরি। রপ্তানি খাতেও নানা প্রতিকূলতার মধ্যে প্রবৃদ্ধি অব্যাহত আছে। যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কনীতি, জ্বালানিসংকট, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা এবং বন্দর ও যোগাযোগব্যবস্থার সমস্যা সত্ত্বেও রপ্তানি ধরে রাখা বড় অর্জন। এই প্রবৃদ্ধি যেন বাধাগ্রস্ত না হয়, সেদিকে নজর রাখার তাগিদ দিয়েছেন তিনি।
তবে প্রবাসী আয়ের সাম্প্রতিক প্রবণতা নিয়ে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন জাহিদ হোসেন। গত কয়েক মাসে প্রবাসী আয় কিছুটা কমেছে। আগে মাসে প্রায় ৩০০ কোটি ডলার এলেও সাম্প্রতিক সময়ে তা নেমে এসেছে প্রায় ২৭০ কোটি ডলারে। এর কারণ খতিয়ে দেখা দরকার বলে মনে করেন তিনি। তাঁর প্রশ্ন, অভিবাসন যেহেতু কমেনি, তাহলে প্রবাসী আয় কমছে কেন? অর্থপাচার কমে যাওয়ায় আগে বৈধ পথে প্রবাসী আয় বেড়েছিল। এখন হুন্ডি আবার সক্রিয় হচ্ছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
সব মিলিয়ে অর্থনীতির বর্তমান স্বস্তি টেকসই করতে হলে ব্যাংক, জ্বালানি ও কর প্রশাসন, এই তিন ক্ষেত্রেই দ্রুত ও দৃশ্যমান সংস্কার দরকার। বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার মধ্যে অভ্যন্তরীণ দুর্বলতা কাটাতে না পারলে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরানো কঠিন হবে, আর তার প্রভাব পড়বে উৎপাদন, রপ্তানি ও কর্মসংস্থানে।

