বিদেশি ঋণ পরিশোধের চাপ ক্রমেই বাড়ছে বাংলাদেশের। অথচ চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে দেশের প্রধান উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে নতুন ঋণ ও সহায়তার প্রতিশ্রুতি প্রায় আসেনি বললেই চলে। বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক, চীন, ভারত ও রাশিয়ার মতো বড় অর্থায়নকারী দেশ ও সংস্থাগুলো জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নতুন কোনো অর্থায়নের প্রতিশ্রুতি দেয়নি। ফলে আগামী দিনের উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর অর্থায়ন নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) সর্বশেষ সাময়িক পরিসংখ্যানে এই চিত্র উঠে এসেছে। তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে বাংলাদেশের প্রধান উন্নয়ন সহযোগীদের অধিকাংশই নতুন ঋণ অনুমোদন বা সহায়তার প্রতিশ্রুতি দেওয়া থেকে বিরত থেকেছে। তবে আগে অনুমোদিত ঋণের অর্থ ছাড় অব্যাহত রয়েছে।
ইআরডির হিসাবে, চলতি অর্থবছরের জুলাই-সেপ্টেম্বর সময়ে বাংলাদেশ মোট ৬৬ কোটি ২৩ লাখ ১০ হাজার মার্কিন ডলার বৈদেশিক সহায়তা পেয়েছে। একই সময়ে নতুন বৈদেশিক সহায়তার প্রতিশ্রুতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১২৭ কোটি ৩০ লাখ ডলার।
এই প্রতিশ্রুতির প্রায় পুরোটাই এসেছে দেশের প্রচলিত বড় ঋণদাতা গোষ্ঠীর বাইরের উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে।
বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক, এশীয় অবকাঠামো বিনিয়োগ ব্যাংক, চীন, রাশিয়া ও ভারত—এই ছয় উন্নয়ন সহযোগীর কেউই প্রথম প্রান্তিকে নতুন অর্থায়নের প্রতিশ্রুতি দেয়নি।
বড় উন্নয়ন সহযোগীদের মধ্যে একমাত্র জাপান সামান্য পরিমাণ নতুন অর্থায়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। জুলাই-সেপ্টেম্বর সময়ে দেশটির প্রতিশ্রুতির পরিমাণ ছিল ৩৫ লাখ ১০ হাজার মার্কিন ডলার।
অন্যদিকে ইসলামি উন্নয়ন ব্যাংক, জাতিসংঘ, যুক্তরাজ্যের উন্নয়ন সহায়তা, জার্মানি, ডেনমার্ক, নেদারল্যান্ডস, নরওয়ে, সুইডেন ও যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্যান্য উন্নয়ন সহযোগীর কাছ থেকে মোট ১২৬ কোটি ৯০ লাখ ডলারের নতুন প্রতিশ্রুতি পাওয়া গেছে।
নতুন প্রতিশ্রুতিতে বড় ঋণদাতারা পিছিয়ে থাকলেও পুরোনো ঋণচুক্তির আওতায় অর্থ ছাড় করেছে বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান।
চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশকে ১৯ কোটি ৬৫ লাখ ১০ হাজার ডলার ছাড় করেছে। একই সময়ে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক দিয়েছে ১৬ কোটি ২১ লাখ ১০ হাজার ডলার।
ভারত থেকে এসেছে ১০ কোটি ৪৯ লাখ ৯০ হাজার ডলার এবং জাপান ছাড় করেছে ৪ কোটি ৪৬ লাখ ৬০ হাজার ডলার। এ ছাড়া রাশিয়া থেকে ২ কোটি ৬ লাখ ৫০ হাজার ডলার এবং চীন থেকে ১ কোটি ৪৬ লাখ ৬০ হাজার ডলার পাওয়া গেছে।
তবে এশীয় অবকাঠামো বিনিয়োগ ব্যাংক এই সময়ে নতুন কোনো ঋণের প্রতিশ্রুতি দেয়নি, অর্থও ছাড় করেনি।
এখানে নতুন ঋণের প্রতিশ্রুতি এবং অর্থ ছাড়ের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। কোনো উন্নয়ন সহযোগী ভবিষ্যতে নির্দিষ্ট প্রকল্প বা কর্মসূচিতে অর্থায়নের বিষয়ে সম্মত হলে সেটিকে নতুন প্রতিশ্রুতি হিসেবে গণনা করা হয়। অন্যদিকে আগে অনুমোদিত ঋণচুক্তির আওতায় প্রকল্প বাস্তবায়নের অগ্রগতি অনুযায়ী যে অর্থ দেওয়া হয়, সেটিই অর্থ ছাড়।
ফলে বর্তমানে বিদেশি অর্থ ছাড় অব্যাহত থাকলেও নতুন প্রতিশ্রুতি কমে যাওয়ার অর্থ হচ্ছে, ভবিষ্যতের উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর জন্য নতুন অর্থায়নের সুযোগ সীমিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
এদিকে বৈদেশিক ঋণের কিস্তি ও সুদ পরিশোধের চাপও বেড়েছে। সরকারের সর্বশেষ বৈদেশিক অর্থায়ন মূল্যায়ন অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে যে পরিমাণ অর্থ পাওয়া গেছে, তার প্রায় দ্বিগুণ অর্থ ঋণ পরিশোধে ব্যয় হয়েছে।
অর্থাৎ নতুন ঋণের অর্থ দেশে আসার পাশাপাশি আগের ঋণ পরিশোধের জন্যও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা বাইরে চলে যাচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে বড় অঙ্কের ঋণ নেওয়ার ফলে এখন মূলধন ও সুদ পরিশোধের চাপ বাড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে নতুন সহজ শর্তের অর্থায়ন পাওয়া গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
কারণ বিদেশি ঋণ পরিশোধে বৈদেশিক মুদ্রার ব্যবহার বাড়তে থাকলে উন্নয়ন ব্যয় নির্বাহ এবং দেশের বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্য বজায় রাখা আরও কঠিন হতে পারে।
বিশেষ করে আগামী প্রান্তিকগুলোতেও বড় উন্নয়ন সহযোগীদের নতুন প্রতিশ্রুতি কম থাকলে সরকারের উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থায়ন পরিকল্পনায় চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ইআরডির তথ্য থেকে আরও বোঝা যাচ্ছে, বাংলাদেশকে নতুন অর্থায়নের ক্ষেত্রে প্রচলিত বড় ঋণদাতাদের বাইরের উন্নয়ন সহযোগীদের ওপর তুলনামূলক বেশি নির্ভর করতে হচ্ছে।
তবে অর্থ ছাড়ের ধীরগতির পেছনে প্রকল্প বাস্তবায়নের গতিকেও গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
ইআরডির একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বিদেশি উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে অর্থ ছাড় মূলত সংশ্লিষ্ট উন্নয়ন প্রকল্পের বাস্তবায়ন অগ্রগতির সঙ্গে যুক্ত। সরকারি সংস্থাগুলো নির্ধারিত সময় অনুযায়ী প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে পারলে অর্থ ছাড়ের পরিমাণও বাড়বে।
তাঁর মতে, সাধারণত প্রতিটি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে সরকারি সংস্থাগুলোর প্রকল্প বাস্তবায়নের গতি কিছুটা কম থাকে। ফলে এই সময়ে বৈদেশিক সহায়তার অর্থ ছাড়ও তুলনামূলক ধীর হয়।
তিনি আশা প্রকাশ করেছেন, দ্বিতীয় প্রান্তিক থেকে প্রকল্প বাস্তবায়নের গতি বাড়বে এবং এর সঙ্গে বৈদেশিক সহায়তার অর্থ ছাড়ও বৃদ্ধি পাবে।
তবে নতুন ঋণের প্রতিশ্রুতি এবং পুরোনো ঋণের অর্থ ছাড় দুটি আলাদা বিষয় হওয়ায় শুধু প্রকল্প বাস্তবায়নের গতি বাড়লেই ভবিষ্যৎ অর্থায়নের অনিশ্চয়তা পুরোপুরি দূর হবে না।
বাংলাদেশের সামনে এখন একদিকে পুরোনো বৈদেশিক ঋণের কিস্তি ও সুদ পরিশোধের বাধ্যবাধকতা, অন্যদিকে নতুন উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ সংগ্রহের চ্যালেঞ্জ রয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে বড় উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে নতুন সহজ শর্তের ঋণ নিশ্চিত করা এবং চলমান প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়ন ত্বরান্বিত করা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকের পরিসংখ্যান তাই বাংলাদেশের বৈদেশিক অর্থায়নে একটি সতর্কবার্তা হিসেবে দেখা যেতে পারে। আগামী মাসগুলোতে নতুন প্রতিশ্রুতি ও অর্থ ছাড়ের প্রবাহ কতটা বাড়ে, তার ওপর উন্নয়ন অর্থায়নের ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি অনেকাংশে নির্ভর করবে।

