কম সুদে দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন ঋণ পাওয়ার সুযোগ সংকুচিত হওয়ায় এবার বেশি সুদের জাপানি ঋণ নিতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। ঋণের সুদ কমানোর জন্য দীর্ঘদিন আলোচনা চালিয়েও জাপানের কাছ থেকে বিশেষ ছাড় আদায় করতে পারেনি সরকার। ফলে ৩ দশমিক ৫ শতাংশ সুদের হারেই নতুন ঋণচুক্তি করতে হচ্ছে। অর্থনীতিবিদদের আশঙ্কা, বড় অবকাঠামো প্রকল্পে জাপানের কাছ থেকে বিপুল অর্থ নেওয়া হলে ভবিষ্যতে ঋণের কিস্তি ও সুদ পরিশোধের চাপ আরও বাড়বে।
অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, উপজেলা পরিচালন ও উন্নয়ন প্রকল্প এবং বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য জাপানের সঙ্গে দুটি ঋণচুক্তি শিগগিরই স্বাক্ষরিত হবে। সংশোধিত সুদের শর্ত অনুযায়ী এসব ঋণ নেওয়ার প্রস্তুতি চলছে।
জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা (জাইকা) ২০২৬ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া ছয় মাসের ঋণচক্রে সুদের হার বাড়িয়ে ৩ দশমিক ৫০ শতাংশ নির্ধারণ করেছে। এর আগের ছয় মাসে এই হার ছিল ৩ দশমিক ০৫ শতাংশ।
গত মাসে টোকিওতে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও জাপানের প্রধানমন্ত্রী তাকাইচি সানায়ের দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে দুটি প্রকল্পে ঋণ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয় জাপান। এর মধ্যে বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য ১৫৮৮ কোটি ইয়েন বা প্রায় ১০ কোটি ৮ লাখ মার্কিন ডলার এবং উপজেলা পরিচালন ও উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য ৩০৬৮ কোটি ইয়েন বা প্রায় ১৯ কোটি ৪৭ লাখ ডলার দেওয়ার কথা রয়েছে।
নতুন সুদের হার কার্যকর হওয়ার পর এসব ঋণের অর্থায়ন ব্যয় আগের তুলনায় বাড়বে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে বড় অবকাঠামো প্রকল্পের জন্য জাপানের কাছ থেকে ঋণ নিতে হলে সরকারকে আরও বেশি সুদ গুনতে হবে।
বিশেষ করে ঢাকায় চলমান মেট্রোরেল-৫ উত্তর রুট ও মেট্রোরেল-১ প্রকল্পের জন্য জাপানের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ নেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে। ফলে এসব প্রকল্পে নতুন সুদের হার কার্যকর হলে সরকারের দীর্ঘমেয়াদি ঋণ পরিশোধের দায় আরও বাড়তে পারে।
একসময় বাংলাদেশের অন্যতম আকর্ষণীয় উন্নয়ন অর্থায়নের উৎস ছিল জাপান। দেশটির ঋণে তুলনামূলক কম সুদের পাশাপাশি দীর্ঘ সময় ধরে ঋণ পরিশোধের সুযোগ পাওয়া যেত। এ কারণে অবকাঠামো, পরিবহন, জ্বালানি ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন প্রকল্পে জাপানের অর্থায়ন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে সুদের হার বাড়তে থাকায় সেই সুবিধা অনেকটাই কমে গেছে। কয়েক বছর আগেও জাইকার ঋণের সুদ ১ শতাংশের নিচে ছিল। এমনকি ২০২২ সালেও জাপানের উন্নয়ন ঋণে ১ শতাংশের কম সুদ পাওয়া যেত।
বাংলাদেশ ২০১৫ সাল পর্যন্ত স্বল্পোন্নত ও নিম্ন আয়ের দেশ হিসেবে জাপানের কাছ থেকে মাত্র ০ দশমিক ১ শতাংশ সুদে ঋণ নেওয়ার সুযোগ পেয়েছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে ঋণের শর্ত কঠোর হয়েছে।
ইআরডির একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, জাপান বাংলাদেশের জন্য আলাদাভাবে সুদের হার কমাবে না। তাই বেশি সুদেই ঋণ নেওয়া ছাড়া সরকারের সামনে আপাতত বিকল্প নেই।
তিনি বলেন, জাপান যদি বাংলাদেশের জন্য সুদের হার কমাতে রাজি না হয়, তাহলে নির্ধারিত হারেই ঋণ নিতে হবে।
সুদের হার বাড়ানোর কারণে বাংলাদেশ গত এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত আগের ঋণচক্রে জাইকার সঙ্গে নতুন কোনো ঋণচুক্তি করেনি। এর আগে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জাপান সফরে গিয়ে দেশটির কাছে উন্নয়ন ঋণের সুদ আরও সহজ করার অনুরোধ জানিয়েছিলেন। তবে সেই প্রচেষ্টা সফল হয়নি।
জাইকা প্রতি ছয় মাস পরপর তাদের উন্নয়ন ঋণের সুদের হার পুনর্নির্ধারণ করে। বর্তমানে কার্যকর সুদের হার ২০২৬ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৭ সালের মার্চ পর্যন্ত বহাল থাকবে।
নতুন ঋণের ক্ষেত্রে সুদের পাশাপাশি অতিরিক্ত কিছু খরচও রয়েছে। জাপান প্রায় সব ঋণের বিপরীতে ০ দশমিক ০২ শতাংশ অগ্রিম ফি আদায় করে থাকে।
তবে ঋণ পরিশোধের সময়সীমা আগের মতোই ৩০ বছর রাখা হয়েছে। এর মধ্যে প্রথম ১০ বছর ঋণের কিস্তি পরিশোধে রেয়াতকাল হিসেবে পাওয়া যাবে। অর্থাৎ এই সময়ের পর থেকে নির্ধারিত শর্ত অনুযায়ী ঋণ পরিশোধ শুরু করতে হবে।
বর্তমানে বাংলাদেশের অন্যান্য উন্নয়ন সহযোগীদের ঋণের সুদের হারের সঙ্গে তুলনা করলেও জাপানের নতুন ঋণ ব্যয়বহুল হয়ে উঠেছে। বিশ্বব্যাংকের ঋণে বাংলাদেশ বর্তমানে ১ দশমিক ৭৫ শতাংশ সুদ দিচ্ছে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের ঋণের সুদ ২ থেকে ৪ দশমিক ৫ শতাংশ। চীনের ঋণে ২ শতাংশ এবং ইসলামি উন্নয়ন ব্যাংকের ঋণে ২ থেকে ৪ শতাংশ সুদ দিতে হচ্ছে।
অর্থাৎ জাপানের ৩ দশমিক ৫ শতাংশ সুদের ঋণ এখন বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নের তুলনায় অনেক বেশি ব্যয়বহুল। বহুপক্ষীয় উন্নয়ন সংস্থাগুলোর কিছু ঋণের সুদের হারও জাপানের নতুন হারের চেয়ে বেশি হলেও দেশটির দীর্ঘদিনের কম সুদের সুবিধা আর আগের মতো থাকছে না।
জাপান ২০১২ সাল থেকে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় দ্বিপক্ষীয় উন্নয়ন সহযোগী হিসেবে অবস্থান ধরে রেখেছে। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর থেকে দেশটি এখন পর্যন্ত প্রায় ৩৩ দশমিক ৬২ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের সরকারি উন্নয়ন সহায়তা দিয়েছে।
তবে ঋণের সুদ বাড়ার ফলে ভবিষ্যতে জাপানের অর্থায়ন ব্যবহারের ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে আরও সতর্ক হতে হবে। বিশেষ করে যেসব প্রকল্প থেকে পর্যাপ্ত অর্থনৈতিক সুফল পাওয়া যাবে না, সেগুলোতে বেশি সুদের ঋণ নেওয়া হলে সরকারের ওপর দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক চাপ তৈরি হতে পারে।
দেশের বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের দায় ইতোমধ্যে বাড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে নতুন ঋণের সুদের হার, রেয়াতকাল, পরিশোধের সময়সীমা এবং প্রকল্প থেকে প্রত্যাশিত আয় বিবেচনা করে অর্থায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া জরুরি হয়ে উঠেছে।

