চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতির চিত্র মোটেও আশাব্যঞ্জক নয়। সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে সম্প্রতি এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (এডিবি) ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) থেকে প্রকাশিত তথ্য এবং শর্তাদির পর্যালোচনায় এ চিত্র স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। জিডিপি প্রবৃদ্ধি হ্রাস, মূল্যস্ফীতির চাপ, রাজস্ব আদায়ে দুর্বলতা এবং ব্যাংক খাতে ঋণখেলাপির লাগামছাড়া প্রবণতা মিলিয়ে বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি।
এডিবির সর্বশেষ পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৪ অর্থবছর শেষে দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৯ শতাংশে নেমে আসবে। যা আগের বছরগুলোর তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম। আগামী অর্থবছরে প্রবৃদ্ধির হার কিছুটা বেড়ে ৫ দশমিক ১ শতাংশ হতে পারে বলে ধারণা করা হলেও তা এখনও কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যের অনেক নিচে। মূল্যস্ফীতি নিয়েও রয়েছে উদ্বেগ। এ বছর তা ১০ দশমিক ২ শতাংশে পৌঁছাতে পারে বলে জানায় এডিবি, যদিও ২০২৬ সালে এসে এই হার কিছুটা কমে ৮ শতাংশে নামবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক চিত্রে আরেকটি বড় উদ্বেগ তৈরি করেছে রাজস্ব আদায়ের দুর্বলতা। আইএমএফ থেকে নেওয়া ৪৭০ কোটি ডলারের ঋণের চতুর্থ ও পঞ্চম কিস্তি পেতে হলে আগামী জুনের মধ্যে জিডিপির ৭ দশমিক ৯ শতাংশ হারে রাজস্ব আদায় করতে হবে বলে শর্ত জুড়ে দিয়েছে সংস্থাটি। অথচ বর্তমানে এই হার ৭ দশমিক ৪ শতাংশে অবস্থান করছে। ফলে রাজস্ব ঘাটতির পরিমাণ প্রতি বছর লাখ কোটি টাকার বেশি দাঁড়ায়।
মূলত আওয়ামী সরকারের সময়ে অব্যবস্থাপনা, অপরিকল্পিত অবকাঠামো প্রকল্প এবং লুটপাটের কারণে বাজেট ঘাটতি মেটাতে দেশি-বিদেশি ঋণের ওপর নির্ভরশীলতা বাড়ে। বাজেট ও জিডিপির আকার বাড়লেও সেই অনুপাতে রাজস্ব সংগ্রহ বাড়েনি। এই অবস্থায় রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) চরম চাপের মধ্যে রয়েছে।
এদিকে আইএমএফের ঋণের প্রথম তিন কিস্তির বিপরীতে বেশিরভাগ শর্ত পূরণ করা গেলেও রাজস্ব আদায়ের শর্তটি এখনো পূরণ হয়নি। এখন পর্যন্ত ৪৭০ কোটি ডলারের ঋণ থেকে তিন কিস্তিতে ২৩১ কোটি ডলার বাংলাদেশ পেয়েছে। বাকি ২৩৯ কোটি ডলার পাওয়ার জন্য চতুর্থ ও পঞ্চম কিস্তির অনুমোদনের অপেক্ষা রয়েছে, যা জুন মাসে পাওয়ার কথা।
এডিবির কান্ট্রি ডিরেক্টর হো ইউন জিয়ং জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পাল্টা শুল্কারোপ নিয়ে যে উত্তেজনা চলছে, তার একটা সাময়িক সমাধান হতে পারে। তবে শুধু এই সাময়িক সমঝোতায় নয়, রপ্তানি বাজারে পণ্যের বৈচিত্র্য আনতে বাংলাদেশকে উদ্যোগ নিতে হবে বলেও মত দেন তিনি। কারণ, দীর্ঘমেয়াদে টিকে থাকতে হলে নির্ভরযোগ্য ও বহুমুখী রপ্তানি খাত গড়ে তোলা ছাড়া বিকল্প নেই।
অন্যদিকে দেশের ব্যাংক খাতও রয়েছে গভীর সংকটে। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর জানিয়েছেন, ব্যাংক খাতে বিতরণ করা ঋণের প্রকৃতপক্ষে প্রায় ৩০ শতাংশই এখন খেলাপি হয়ে গেছে। যদিও সরকারি হিসেবে এটি দেখানো হচ্ছে ২০ শতাংশ। তার মতে, এই ভয়াবহ পরিস্থিতির জন্য প্রধানত দায়ী রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ ও দুর্নীতির মাধ্যমে অর্থপাচার। তিনি আরও বলেন, ব্যাংক খাতে রাজনৈতিক প্রভাব ও প্রশাসনিক দুর্বলতার সুযোগে ঋণ জালিয়াতি এবং অপচয় বেড়েছে, যা অর্থনীতির স্থিতিশীলতার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে রাজস্ব ব্যবস্থার সংস্কার, ব্যাংক খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং রপ্তানিতে পণ্যের বৈচিত্র্য আনাসহ বাস্তবভিত্তিক পরিকল্পনা গ্রহণ এখন সময়ের দাবিতে পরিণত হয়েছে। কারণ শুধু আন্তর্জাতিক সংস্থার ঋণে নির্ভর করে অর্থনীতিকে টিকিয়ে রাখা আর সম্ভব নয়, বরং প্রয়োজন অভ্যন্তরীণ সক্ষমতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দেওয়া।

