বাংলাদেশ সরকার জ্বালানি, সার আমদানি, বাজেট সহায়তা এবং কিছু বড় উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থ জোগান দিতে ৪.০৭৪ বিলিয়ন বা ৪০০ কোটির বেশি মার্কিন ডলারের অনমনীয় শর্তযুক্ত বৈদেশিক ঋণ নিচ্ছে। এর মধ্যে প্রায় ২৭৫ কোটি ডলার ব্যয় হবে সার, পেট্রোলিয়াম এবং এলএনজি আমদানিতে, যেগুলোর ঋণ শর্ত তুলনামূলকভাবে কঠিন।
গত বৃহস্পতিবার অর্থ বিভাগের সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত অনমনীয় ঋণ বিষয়ক স্থায়ী কমিটির সভায় এই ঋণ অনুমোদনের সিদ্ধান্ত হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) কর্মকর্তারা জানান, যেসব খাতে নমনীয় অর্থায়ন সম্ভব নয়, বা অতীতে ঋণ পরিশোধে জটিলতা দেখা গেছে, সেসব ক্ষেত্রে বাধ্য হয়েই অনমনীয় বা কঠিন শর্তযুক্ত ঋণ নেওয়া হয়।
বর্তমানে বাজারভিত্তিক ডলার ঋণের সুদের হারও বেড়ে যাওয়ায় উন্নয়ন প্রকল্প ও বাজেট সহায়তায় নেওয়া ঋণগুলো অনমনীয় ঋণের তালিকায় পড়ে যাচ্ছে। তেল, গ্যাস ও এলএনজি আমদানির জন্য মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক ট্রেড ফাইন্যান্স কর্পোরেশন (আইটিএফসি)-এর কাছ থেকে নেওয়া ঋণগুলোর শর্তও কঠিন বলে জানিয়েছে ইআরডি।
সভায় সিদ্ধান্ত হয়, এসব অনমনীয় ঋণনির্ভর প্রকল্পের বাস্তবায়ন যাতে দ্রুত ও দক্ষতার সঙ্গে সম্পন্ন হয়, তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর তদারকি কার্যক্রম জোরদার করতে হবে।
ইআরডি’র ব্যাখ্যা অনুযায়ী, যেসব বৈদেশিক ঋণে ‘গ্রান্ট এলিমেন্ট’ অর্থাৎ অনুদান উপাদান ২৫ শতাংশের নিচে থাকে, সেগুলোকে ‘অনমনীয় ঋণ’ হিসেবে ধরা হয়। এসব ঋণে সুদের হার তুলনামূলক বেশি এবং পরিশোধের সময়সীমা কম। এই গ্রান্ট এলিমেন্ট মূলত নির্ধারণ করে ঋণের সহজতা কতটুকু। এটি নির্ধারিত হয় ঋণের মোট খরচ এবং ভবিষ্যতে পরিশোধযোগ্য অর্থের বর্তমান মূল্যের পার্থক্যের ভিত্তিতে।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন এসব ঋণের উচ্চ সুদ ও সীমিত রিটার্ন নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, এসব ঋণের বার্ষিক সুদের হার প্রায় ৬ শতাংশ, যা কার্যত বাণিজ্যিক হারে নেওয়া ঋণ। তার মতে, এমন ঋণ নেওয়া তখনই যৌক্তিক, যখন তার বিপরীতে নিশ্চিত আয় বা রিটার্ন পাওয়া যায়। নতুবা ভবিষ্যতে দেশের ওপর বড় অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি হতে পারে।
বর্তমানে সরকার ঋণ গ্রহণের ক্ষেত্রে সাধারণত ঋণ-জিডিপি অনুপাত বিবেচনায় নেয়, কিন্তু অর্থনীতিবিদদের মতে, এর পাশাপাশি আরও কিছু সূচক যেমন ঋণ-রপ্তানি আয় অনুপাত কিংবা রাজস্ব আয়ের বিপরীতে ঋণ পরিশোধের ক্ষমতাও বিবেচনায় আনা উচিত। সরকারের একটি গাইডলাইনে বলা হয়েছে, অনমনীয় ঋণের বার্ষিক পরিশোধ যেন রপ্তানি আয়ের ১০ শতাংশ বা রাজস্ব আয়ের ১৫ শতাংশ—এর যেটি কম তার মধ্যে সীমিত থাকে।
প্রথমবারের মতো, সরকার আগামী অর্থবছরে সার আমদানির জন্য বিদেশি ঋণ নিতে যাচ্ছে। বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি) আইটিএফসি থেকে ৫০ কোটি ডলার ঋণ পাচ্ছে। এর মধ্যে ২০ কোটি ডলার ইতোমধ্যে নিশ্চিত, বাকি ৩০ কোটি ডলার সম্ভাব্য। এক বছরের মধ্যে পরিশোধযোগ্য এই ঋণের সুদের হার সোফর + ১.৮০ শতাংশ, যার সঙ্গে ০.২ শতাংশ প্রশাসনিক ফি যুক্ত হবে। সোফর অনুযায়ী, এই ঋণের সম্ভাব্য সুদের হার প্রায় ৬ শতাংশ।
এছাড়া ২০২৫-২৬ অর্থবছরে পেট্রোলিয়াম ও এলএনজি আমদানির জন্য আইটিএফসি থেকে বাংলাদেশ মোট ২২৫ কোটি ডলার ঋণ নিচ্ছে। এর মধ্যে ১৬৫ কোটি ডলার তেল আমদানির জন্য এবং ৬০ কোটি ডলার এলএনজির জন্য। প্রতিটি ঋণ ছাড়ের ছয় মাসের মধ্যে পরিশোধ করতে হবে এবং সুদের হার সোফর + ১.৭৫ শতাংশ হবে, যা প্রায় ৬ শতাংশের কাছাকাছি।
২০২৪ সালের এপ্রিলে আইটিএফসি থেকে নেওয়া ঋণের পরিমাণ ছিল ২১০ কোটি ডলার, যা তুলনামূলকভাবে কম। ২০০৯ সাল থেকে ২০২৫-২৬ অর্থবছর পর্যন্ত আইটিএফসি বাংলাদেশকে মোট ২১.৬৭৫ বিলিয়ন ডলারের ঋণ অনুমোদন দিয়েছে।
বাজেট সহায়তার জন্য এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ‘স্ট্যাবিলাইজিং অ্যান্ড রিফর্মিং দ্য ব্যাংকিং সেক্টর প্রোগ্রাম’-এর আওতায় সরকারকে ৫০ কোটি ডলার অনমনীয় ঋণ দিচ্ছে। এই ঋণের সুদের হার সোফর + ০.৫০ শতাংশ, অর্থাৎ প্রায় ৪.৮২ শতাংশ। তিন বছরের গ্রেস পিরিয়ডসহ ১২ বছরে এই ঋণ পরিশোধ করতে হবে। এর গ্রান্ট এলিমেন্ট মাত্র ১.৮৮ শতাংশ।
প্রথমবারের মতো ব্রিকস দেশের নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (এনডিবি) বাংলাদেশকে ৩২ কোটি ডলার ঋণ দিচ্ছে ‘এক্সপান্ডেড ঢাকা সিটি ওয়াটার রেজিলিয়েন্স’ প্রকল্পের জন্য। ঋণের পরিশোধকাল ৩০ বছর, যার মধ্যে ৭.৫ বছর গ্রেস পিরিয়ড থাকবে। এই ঋণ মার্কিন ডলার, ইউরো এবং চীনের ইউয়ানে নেওয়ার সুযোগ থাকলেও ডলার ও ইউরোতে নেওয়া হলে শর্ত কঠিন। চীনা মুদ্রায় নিলে এর গ্রান্ট এলিমেন্ট হবে ২৮ শতাংশ, অর্থাৎ তুলনামূলকভাবে এটি নমনীয়। তবে ডলারে নেওয়া হলে সুদের হার হবে ৫.৮৫ শতাংশ।
সরকার আরও দুটি এডিবি ঋণ অনুমোদন করেছে। একটি হচ্ছে ২০ কোটি ডলারের পাওয়ার ট্রান্সমিশন প্রকল্পের জন্য, যার মেয়াদ ২৫ বছর এবং সুদের হার সোফর + ০.৬০ শতাংশ। অপরটি ২০৪ মিলিয়ন ডলারের সড়ক উন্নয়ন প্রকল্প, যার গ্রান্ট এলিমেন্ট মাত্র ১.২৫ শতাংশ।
সড়ক প্রকল্পের অর্থনৈতিক সম্ভাব্যতা নিয়ে অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন প্রশ্ন তুলে বলেন, গ্যাস বা জ্বালানি আমদানির মতো খাতে বাজারমূল্যভিত্তিক ঋণ যৌক্তিক হলেও, সড়ক প্রকল্পের বাস্তব রিটার্ন নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। কারণ এসব প্রকল্প সরাসরি উৎপাদন খাতে অবদান রাখে না।
অবশেষে, ওপেক ফান্ড ফর ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট থেকেও বাংলাদেশ সরকার বাজেট সহায়তার জন্য ৯৬.১ মিলিয়ন ইউরো ঋণ নিচ্ছে। এ ঋণের মেয়াদ ১৮ বছর, যার মধ্যে ৩ বছর গ্রেস পিরিয়ড এবং সুদের হার ইউরিবোর + ১.২০ শতাংশ।
এই পুরো ঋণ প্যাকেজের বৈশিষ্ট্য হলো—প্রতিটি ঋণই কঠিন শর্তযুক্ত এবং স্বল্পমেয়াদি পরিশোধযোগ্য। তাই এসব ঋণ যথাযথভাবে ব্যবহৃত না হলে ভবিষ্যতে দেশের অর্থনৈতিক ভারসাম্যে বড় ধরনের চাপ তৈরি হতে পারে।

