বাংলাদেশে ভুট্টা চাষে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হলেও বাজারমূল্য কমে যাওয়ায় চাষিরা এবার হতাশ। গত এক দশকে ভুট্টা উৎপাদনে প্রায় ৭০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে যেখানে উৎপাদন ছিল ২৭ লাখ টন, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭১ লাখ ৬০ হাজার টনে। একই সঙ্গে ভুট্টার চাষের জমিও বেড়ে দাঁড়িয়েছে ছয় লাখ ৫১ হাজার হেক্টরে যা আগের দশকে ছিল মাত্র দুই লাখ ৯০ হাজার হেক্টর।
উৎপাদনের এ অগ্রগতির ফলে বিদেশ থেকে ভুট্টা আমদানি ৯০ শতাংশের বেশি কমে এসেছে। ২০২৩ সালে আমদানি করতে হয়েছিল চার লাখ টন। তবে কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম মনে করেন, উৎপাদন বাড়তে থাকলে আগামী দুই-তিন বছরের মধ্যে বিদেশ থেকে আর ভুট্টা আমদানি করতে হবে না। তার মতে, উৎপাদন বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমে গেলে দেশীয় বাজারেও ভুট্টার দর কমতে পারে। এজন্য দেশজ বাজারে ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করতে একটি নির্ধারিত বাজারদর থাকা প্রয়োজন বলে তিনি মন্তব্য করেন।
বর্তমানে দেশের শীর্ষ ১০ ভুট্টা উৎপাদনকারী জেলার মধ্যে রয়েছে লালমনিরহাট, দিনাজপুর, চুয়াডাঙ্গা, ঠাকুরগাঁও, রংপুর, পঞ্চগড়, নীলফামারী, ঝিনাইদহ, জামালপুর ও গাইবান্ধা। উত্তরাঞ্চলের পাঁচটি জেলা- লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, রংপুর ও নীলফামারীতে এই বছর ভুট্টাচাষ হয়েছে এক লাখ ৪৭ হাজার হেক্টরের বেশি জমিতে। এতে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১৫ লাখ ৬০ হাজার টন। এর প্রায় অর্ধেকই উৎপন্ন হচ্ছে চরাঞ্চলে।
বিশেষ করে লালমনিরহাট জেলায় ভুট্টাকে ‘ব্র্যান্ডিং ফসল’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। এ বছর এ জেলায় চাষ হয়েছে প্রায় ৪০ হাজার হেক্টর জমিতে। অধিকাংশ চাষই তিস্তার চর এলাকায় হওয়ায় স্থানীয় কৃষকদের জীবনে এসেছে সচ্ছলতা।
রংপুর আঞ্চলিক কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক শফিকুল ইসলাম জানান, দেশে সাধারণত রবি মৌসুমে, অর্থাৎ অক্টোবর-নভেম্বরে ভুট্টার বীজ রোপণ করে মার্চ-এপ্রিলে তা মাড়াই করা হয়। এ সময় আবহাওয়া ও জমি ভুট্টা চাষের উপযোগী থাকে। একই জমিতে সাথী ফসলও ফলানো যায়। গমের তুলনায় ভুট্টায় মুনাফা বেশি, পরিচর্যা কম, ফলনও ভালো এসব কারণে কৃষকেরা দিন দিন ভুট্টা চাষে আগ্রহী হচ্ছেন।
চাষিরা জানাচ্ছেন, প্রতি বিঘা জমিতে ভুট্টা চাষে খরচ হয় ১৪ থেকে ১৬ হাজার টাকা। এর সঙ্গে জমি ইজারা নিলে খরচ বাড়ে। সাধারণভাবে এক বিঘা জমি থেকে ৩৫-৪৫ মন ভুট্টা পাওয়া যায়। প্রতি মন বিক্রি হয় এক হাজার ১০০ থেকে এক হাজার ৩০০ টাকায় ফলে বিঘাপ্রতি মুনাফা দাঁড়ায় ২৮ থেকে ৩৪ হাজার টাকা।
তবে কৃষকেরা বলছেন, গত বছরের তুলনায় এবার দাম কমেছে। লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, রংপুর ও দিনাজপুরের কয়েকজন কৃষক জানান, গত বছর প্রতি কেজি ভুট্টা বিক্রি করেছিলেন ৩০-৩২ টাকায় এবার তা নামিয়ে আনতে হচ্ছে ২৮-২৯ টাকায়। বেশি জমিতে চাষ ও উৎপাদন বাড়ার কারণে বাজারে ভুট্টার সরবরাহ বেড়েছে আর সে সুযোগে ব্যবসায়ীরা কম দাম দিচ্ছেন।
তিস্তার চর সানিয়াজানের কৃষক সহিদার রহমান ১৫ বছর ধরে চরে ভুট্টা চাষ করছেন। একসময় যে জমিতে কিছুই ফলত না সেখানে এখন তিনি চাষ করে সচ্ছলতা এনেছেন। তিনি জানান, এবার ১৫ বিঘা জমিতে ভুট্টাচাষ করতে খরচ হয়েছে দুই লাখ আট হাজার টাকা। প্রতি বিঘায় ফলন পেয়েছেন ৪৩ মন। ওই চরে থাকা ২৪০টি পরিবারই এখন ভুট্টা চাষ করে জীবিকা নির্বাহ করছে।
কালীগঞ্জ উপজেলার চর ভোটমারীর কৃষক আফিয়ার রহমান বলেন, ‘গত বছরের তুলনায় এবার দুই-তিন টাকা কমে ভুট্টা বিক্রি করছি। আগের দামে পেলে লাভ আরও বেশি হতো।’ আট বিঘা জমিতে তিনি পেয়েছেন ৩২৬ মন ভুট্টা যেখানে খরচ হয়েছে এক লাখ ২৮ হাজার টাকা।
পাইকাররা জানাচ্ছেন, তারা কেজিপ্রতি ২৭-২৮ টাকায় কৃষকদের কাছ থেকে ভুট্টা কিনে ২৯ টাকায় ফিড মিলে বিক্রি করছেন। পরিবহন খরচ বাদ দিলে লাভ খুব কম থাকে। কুড়িগ্রামের চিলমারীর পাইকার জামিলুর রহমান জানান, এ বছর ভুট্টা উৎপাদন বেশি হওয়ায় সরবরাহ বেড়েছে। ফলে দাম কমে গেছে। একই তথ্য দিয়েছেন লালমনিরহাটের ভোটমারীর পাইকার বাবলু মিয়াও।
অন্যদিকে আফতাব ফিড মিলের প্রতিনিধি আজিজার রহমান বলেন, ‘আমরা কৃষক ও পাইকারদের কাছ থেকেই ভুট্টা কিনছি। আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই দাম দিচ্ছি।’
রংপুরের প্রাণিখাদ্য উৎপাদনকারী আফজাল হোসেন বলেন, ফিড কোম্পানিগুলোর নিজস্ব সংগ্রহকেন্দ্র থেকে ভুট্টা সংগ্রহ করা হয়। দেশে উৎপাদন বাড়লেও জমির স্বল্পতার কারণে আমদানির নির্ভরতা থাকবেই। তার মতে, ব্যাংক সুদের হার ও অন্যান্য খরচ বেড়ে যাওয়ায় ভুট্টার দাম কমলেও ফিডের দাম কমবে না।
বাংলাদেশ মেইজ অ্যাসোসিয়েশনের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট মিজানুর হক বলেন, একসময় তারা ভুট্টার বাজার নিয়ন্ত্রণ করতেন। তখন কৃষকেরা ন্যায্য দাম পেতেন। কিন্তু এখন বাজার নিয়ন্ত্রণ চলে গেছে ফিড মালিকদের হাতে। সিন্ডিকেটের মাধ্যমে তারা দাম নির্ধারণ করছে।
তার ভাষায়, ‘আন্তর্জাতিক বাজারে গমের দাম কমেছে ফলে ভুট্টার ওপরও প্রভাব পড়েছে। তার সঙ্গে দেশে উৎপাদনও বেড়েছে। সব মিলিয়ে কৃষকেরা এবার বাজারে চাপের মুখে পড়েছেন।’
ভুট্টা চাষে বাংলাদেশের অগ্রগতি নিঃসন্দেহে উল্লেখযোগ্য। উৎপাদন বেড়ে কৃষকদের জীবনমান উন্নত হচ্ছে চরাঞ্চলের মতো প্রান্তিক এলাকাতেও সচ্ছলতা এসেছে। তবে ন্যায্য মূল্য না পেলে চাষিরা উৎসাহ হারাবেন যা দীর্ঘমেয়াদে খাদ্য নিরাপত্তা ও কৃষি অর্থনীতির জন্য হুমকি হতে পারে। বাজারে ন্যায্যতা নিশ্চিত করতে সরকারি হস্তক্ষেপ ন্যূনতম মূল্য নির্ধারণ ও বাজার মনিটরিং এখন সময়ের দাবি।

