দেশের বিদ্যুৎ খাত এখন ক্রমেই বড় ধরনের আর্থিক চাপে পড়ছে। বিগত সরকারের নেওয়া কিছু সিদ্ধান্তের কারণে এই খাতকে এখন রাষ্ট্রীয় অর্থনীতির ওপর বাড়তি বোঝা হিসেবে দেখা হচ্ছে। সাম্প্রতিক এক হিসাব অনুযায়ী, বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) লোকসান চলতি বছরেই দাঁড়াতে পারে প্রায় ৬২ হাজার ৯৬৪ কোটি টাকা। আগামী অর্থবছরে (২০২৬–২৭) এই অঙ্ক আরও বেড়ে ৬৫ হাজার ৫৫৪ কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে।
এই ধারাবাহিক লোকসান মূলত দীর্ঘদিনের ভুল পরিকল্পনা ও অদূরদর্শী নীতির ফল বলে অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন। বেশি দামে বিদ্যুৎ কিনে তুলনামূলক কম দামে বিক্রি করার কারণে আর্থিক ভারসাম্য ভেঙে পড়েছে। এর সরাসরি চাপ পড়ছে রাষ্ট্রীয় কোষাগারের ওপর।
নীতিগতভাবে সক্ষমতা বৃদ্ধির কথা বারবার বলা হলেও বাস্তব চিত্র ভিন্ন। বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতার একটি বড় অংশ এখনো কার্যত অলস পড়ে আছে। এতে রাষ্ট্রকে বিপুল পরিমাণ অর্থ ‘ক্যাপাসিটি চার্জ’ হিসেবে পরিশোধ করতে হচ্ছে, যা কোনো উৎপাদন ছাড়াই ব্যয় হয়ে যাচ্ছে।
জ্বালানি খাতে আমদানিনির্ভরতার প্রবণতাও পরিস্থিতিকে জটিল করেছে। দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে পর্যাপ্ত অগ্রগতি না থাকায় দীর্ঘদিন ধরে ফার্নেস অয়েল, কয়লা ও এলএনজি আমদানির ওপর নির্ভরতা বেড়েছে। এর ফলে উৎপাদন ব্যয়ও ক্রমশ বৃদ্ধি পেয়েছে। কিছু বড় বিদ্যুৎকেন্দ্র, বিশেষ করে কয়লাভিত্তিক প্রকল্পগুলো, উচ্চ খরচের কারণে অর্থনৈতিক চাপ আরও বাড়িয়েছে।
বর্তমানে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ২৯ হাজার মেগাওয়াট হলেও জ্বালানি সংকটের কারণে বাস্তবে উৎপাদন হচ্ছে ১৬ হাজার মেগাওয়াটের কিছু বেশি। ফলে অচল বা আংশিক চালু কেন্দ্রগুলোকে বিপুল পরিমাণ অর্থ পরিশোধ করতে হচ্ছে।
এ অবস্থায় বিদ্যুৎ খাতের লোকসান কমাতে সরকার গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর বিষয়টি বিবেচনা করছে। তবে এ পদক্ষেপ নিয়ে অর্থনৈতিক মহলে প্রশ্ন উঠেছে। কারণ ইউনিট প্রতি এক থেকে দেড় টাকা দাম বাড়ালেও সামগ্রিক ঘাটতির একটি অংশ পূরণ করা সম্ভব হলেও বাকি বিপুল অঙ্কের অর্থ ঘাটতি থেকেই যাবে।
অন্যদিকে বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি পেলে এর সরাসরি প্রভাব পড়বে শিল্প উৎপাদনে। উৎপাদন ব্যয় বেড়ে গেলে নিত্যপণ্যের দামে চাপ সৃষ্টি হবে, যা মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি আরও বাড়াতে পারে। অর্থনীতিবিদদের মতে, এক খাতের ঘাটতি সামাল দিতে গিয়ে পুরো অর্থনীতিকে নতুন সংকটে ফেলার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে।
এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘমেয়াদি ও বাস্তবসম্মত জ্বালানি কৌশলের ওপর জোর দিচ্ছেন। তাদের মতে, দেশীয় জ্বালানি অনুসন্ধান ও উত্তোলনে গুরুত্ব না দিলে আমদানিনির্ভরতা কমবে না। একই সঙ্গে নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বিশেষ করে সৌরশক্তি, দ্রুত মূলধারার উৎপাদনে যুক্ত করা প্রয়োজন। বিদ্যমান কিছু বিদ্যুৎ চুক্তি নিয়েও পুনর্মূল্যায়নের দাবি উঠছে, বিশেষ করে যেসব প্রকল্পে উৎপাদন ব্যয় বেশি এবং ব্যবহার কম। একই সঙ্গে আর্থিক শৃঙ্খলা ও সিস্টেম লস কমানো ছাড়া এই লোকসান থেকে উত্তরণ কঠিন হবে বলেও মনে করা হচ্ছে।
সব মিলিয়ে বিদ্যুৎ খাত এখন এক জটিল আর্থিক ও নীতিগত চ্যালেঞ্জের মধ্যে রয়েছে। এই সংকট থেকে বের হতে হলে তাৎক্ষণিক সমাধানের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত সংস্কার জরুরি হয়ে উঠেছে।

