বাংলাদেশে আইনশৃঙ্খলার অবনতি ও রাজনৈতিক অস্থিরতার সুযোগে ভয়ংকরভাবে বেড়ে যাচ্ছে গণপিটুনি ও জনরোষে মৃত্যুর ঘটনা। গত বছরের ৫ আগস্টের পর থেকে একের পর এক এমন ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ১৮৫ জন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি শুধু অপরাধ নয়, বরং রাষ্ট্র ও সমাজব্যবস্থার এক গভীর ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি।
গত কয়েকদিনে ঘটেছে একাধিক ভয়াবহ ঘটনা। কুমিল্লার মুরাদনগরের আকবপুর ইউনিয়নের কড়ইবাড়ি গ্রামে তিনজন — মা, মেয়ে ও ছেলে — গণপিটুনিতে নিহত হয়েছেন। স্থানীয় সূত্র জানায়, কয়েকদিন আগে একটি মোবাইল চুরিকে কেন্দ্র করে ঝগড়ার জের ধরেই গ্রামবাসী হামলা চালিয়ে এ হত্যাকাণ্ড ঘটায়।
একইসাথে যশোরের ঝিকরগাছায় রফিকুল ইসলাম নামে এক ব্যক্তি গণপিটুনিতে নিহত হন, যিনি এক ব্যক্তিকে কুপিয়ে জখম করেছিলেন বলে অভিযোগ। গাইবান্ধায় ছয় বছরের শিশুকে ধর্ষণের অভিযোগে হাবিল মিয়া, আর কক্সবাজারে ধর্ষণচেষ্টা ও ছুরিকাঘাতে অভিযুক্ত আব্দুল মান্নান— উভয়ই একইভাবে জনরোষে প্রাণ হারান।
এসব ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়। বরং এটি এখন ভয়াবহ সামাজিক প্রবণতায় রূপ নিচ্ছে। আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)-এর তথ্য বলছে, গত ১০ মাসে দেশের আট বিভাগে ১৭৪ জনকে হত্যা করা হয়েছে গণপিটুনির মাধ্যমে। হত্যার অজুহাত হিসেবে কোথাও বলা হয়েছে চোর, কোথাও বলা হয়েছে ছিনতাইকারী, আবার কোথাও রাজনীতির শত্রু। কিন্তু নিহতদের অনেকের বিরুদ্ধেই কোনো মামলা বা প্রমাণিত অপরাধ ছিল না।
ঢাকায় নিহত হয়েছেন সবচেয়ে বেশি — ৮০ জন। এরপর চট্টগ্রামে ২৮, রাজশাহী ও বরিশালে ১৬ জন করে, খুলনায় ১৪, রংপুরে ৭, ময়মনসিংহে ৬ এবং সিলেটে ৫ জন। সবচেয়ে বেশি ঘটনা ঘটেছে গত বছরের সেপ্টেম্বরে, যেখানে এক মাসেই প্রাণ গেছে ২৮ জনের।
মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটন মনে করেন, বর্তমানের রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতা, অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ এবং দুর্বল আইনপ্রয়োগই এই প্রবণতার মূল কারণ। তাঁর ভাষায়, “সরকার যেভাবে রক্তাক্তভাবে ক্ষমতায় এসেছে, সেই রক্ত এখনও সমাজে রয়ে গেছে। যে বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়েছে, সেখানে সরকার বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কার্যকর কোনও ভূমিকা দেখা যাচ্ছে না।”
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বলেন, “পাঁচ আগস্টের পরে সরকার যথাযথ ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হয়েছে। এখন পর্যন্ত একটি ঘটনাতেও আমরা দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেখিনি। যখন অপরাধ করে কেউ রেহাই পায়, তখন সমাজে সেই অপরাধ আরও ছড়িয়ে পড়ে।”
তাঁর মতে, দীর্ঘমেয়াদে শিক্ষা ব্যবস্থায় সামাজিক মূল্যবোধ জোরদার করতে হবে। পাশাপাশি মানুষকে শেখাতে হবে সহিংসতা নয়, বরং সামাজিক উপায়ে সমস্যা সমাধান কীভাবে করা যায়।
পুলিশ সদর দফতরের এআইজি (মিডিয়া) এনামুল হক সাগর স্পষ্ট ভাষায় বলেন, “আইন কেউ নিজের হাতে তুলে নিতে পারে না। অপরাধীকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে তুলে দিতে হবে। আমরা দ্রুত ব্যবস্থা নেবো।” একইসাথে তিনি সাধারণ নাগরিকদেরও সচেতন হওয়ার আহ্বান জানান।
স্বরাষ্ট্র ও কৃষি উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী দাবি করেন, সরকার কাজ করছে এবং পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে বলেই গণপিটুনির হার কিছুটা কমেছে। তবে বাস্তব চিত্র বলছে, মৃত্যুর সংখ্যা কমেনি—বরং গণপিটুনি এখন নতুন স্বাভাবিকতায় পরিণত হয়েছে।
বাংলাদেশে যখন আইনের শাসন প্রশ্নবিদ্ধ, রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত, তখন সমাজে এক ধরনের নিষ্ঠুর স্বেচ্ছাচারী বিচারব্যবস্থা গড়ে উঠছে। যার ফলাফল, রাস্তায় পিটিয়ে মানুষ হত্যা। এটি শুধু মানবাধিকার লঙ্ঘন নয়, বরং একটি রাষ্ট্র হিসেবে আমাদের ব্যর্থতার দৃষ্টান্ত। এখনই যদি সরকার দৃশ্যমান, কঠোর ও দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা না নেয়— তবে এই সহিংসতা আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। এবং তখন, ফিরিয়ে আনা হয়তো আর সম্ভব হবে না।

