বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ (NPL) বাড়ার অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে ভুয়া বাণিজ্য লেনদেনকে চিহ্নিত করেছে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট (BIBM)। গবেষণা বলছে, এ ধরনের প্রতারণামূলক বাণিজ্যের মাধ্যমে দেশের আর্থিক খাত অস্থিতিশীল হয়ে পড়ছে এবং দ্রুত বর্ধনশীল হচ্ছে ট্রেড-ভিত্তিক মানি লন্ডারিং (TBML)।
২০২৫ সালের মার্চ শেষে ব্যাংক খাতে মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪ লাখ ২০ হাজার ৩৩৫ কোটি টাকা, যা দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ।
BIBM-এর নতুন গবেষণা রিপোর্ট ‘Enforcement Status of the Standards to Prevent Trade-Based Money Laundering’ আজ প্রকাশিত হওয়ার কথা।
গবেষণা বলছে, অপরাধীরা যখন রপ্তানি-আমদানি সংক্রান্ত জাল কাগজপত্র বা ভুল ইনভয়েস তৈরি করে, তখন ব্যাংকগুলো তা যাচাই না করেই ঋণ মঞ্জুর করে। বাস্তবে এসব লেনদেন না থাকায় ওই ঋণ আর আদায় সম্ভব হয় না, যা খেলাপিতে পরিণত হয়।
যদিও বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (BFIU) TBML মোকাবেলায় নির্দেশিকা জারি করেছে, বাস্তবায়নে রয়েছে বড় ঘাটতি।
৩৭টি ব্যাংকের ওপর করা একটি জরিপে দেখা গেছে—সব ব্যাংকই বলেছে তাদের স্যাংশন স্ক্রিনিং ব্যবস্থা আছে। কিন্তু মাত্র ৫০ শতাংশ ব্যাংক ‘Global Trade Tracker’ বা ‘Bloomberg’-এর মতো দামের যাচাইকারী টুল ব্যবহার করে।
এর মধ্যে মাত্র ৪০ শতাংশ ব্যাংকের রয়েছে কেন্দ্রীয় মূল্য যাচাই ইউনিট। বেশিরভাগ ব্যাংক এখনো ম্যানুয়াল প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভরশীল, যা গোটা সিস্টেমকে ঝুঁকির মুখে ফেলছে।
রিপোর্ট বলছে, ‘গাইডলাইনে বলা থাকলেও তিন ধাপের এস্কেলেশন সিস্টেম অনেক সময়েই উপেক্ষিত হয়। মৌখিক সিদ্ধান্তের ফলে নেই যথাযথ অডিট ট্রেইল।’
বিশ্বব্যাপী মানি লন্ডারিংয়ের প্রায় ৩০ শতাংশই ট্রেড-ভিত্তিক। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (NBR)-এর হিসেবে বাংলাদেশে এ হার প্রায় ৭৫ শতাংশ।
২০২৪ সালে প্রকাশিত একটি শ্বেতপত্রে দেখা যায়, প্রতিবছর প্রায় ১৬ বিলিয়ন ডলার সমপরিমাণ অর্থ পাচার হয়, যা জিডিপির ৩.৪ শতাংশ। এই অঙ্ক দেশের বাৎসরিক স্বাস্থ্য বাজেটের চেয়েও বেশি।
ভুয়া চালান, ওভার বা আন্ডার ইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে এসব টাকা পাচার হচ্ছে। এতে বিদেশি মুদ্রার রিজার্ভ কমছে, কাস্টমস রাজস্ব হারাচ্ছে এবং ব্যবসার খরচ বাড়ছে।
BIBM-এর গবেষণা আরও বলছে, ব্যাংকগুলোর অনেকেই ট্রেড-ভিত্তিক মানি লন্ডারিং বিষয়ে সার্বিক ঝুঁকি বিশ্লেষণ করে না।
‘যদিও সব ব্যাংকই বলে তারা TBML অ্যালার্ট পর্যালোচনা করে কিন্তু বছরে বরাদ্দকৃত কোনো নির্দিষ্ট টিম বা বিভাগ নেই। নিয়মিত আপডেট বা সতর্কবার্তা ছড়িয়ে দেওয়ার মতো কাঠামোও নেই, যা সিস্টেমিক দুর্বলতা তৈরি করছে।’
বাংলাদেশের ব্যাংকিং সিস্টেম এখনো বিকেন্দ্রীকৃত। প্রায় এক-তৃতীয়াংশ ব্যাংক শাখাভিত্তিক ট্রেড অপারেশন পরিচালনা করছে। এতে নজরদারিতে ফাঁক থেকে যাচ্ছে।
অন্যদিকে সিঙ্গাপুর ও ফিনল্যান্ডের মতো দেশগুলো কেন্দ্রীভূত পদ্ধতি ব্যবহার করে। এতে জবাবদিহিতা বাড়ে এবং দুর্নীতি কমে।
২০১৯ সালের নির্দেশনায় BFIU বলেছে- প্রতিটি এলসি ও রপ্তানি ঋণের ক্ষেত্রে ঝুঁকিভিত্তিক KYC বাধ্যতামূলক। কিন্তু বাস্তবে তা মানা হচ্ছে না।
ব্যাংকের সম্পর্ক ব্যবস্থাপকরা CIB রিপোর্ট ব্যবহার করে তথ্য যাচাইয়ের দায়িত্বে থাকলেও নজরদারির ঘাটতি থেকেই যাচ্ছে।
গবেষণা দলটির নেতৃত্ব দেন BIBM-এর অধ্যাপক শাহ মো. আহসান হাবিব। সদস্যদের মধ্যে ছিলেন সহকারী অধ্যাপক তোফায়েল আহমেদ ও আনিলা আলী, BFIU-এর যুগ্ম পরিচালক শাহ আলম কাজী, ইসলামী ব্যাংকের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মাহমুদুর রহমান এবং মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের নির্বাহী ভাইস প্রেসিডেন্ট এটিএম নেসারুল হক।
রিপোর্টে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব রাখা হয়েছে।
- কাস্টমস ও BFIU-এর তথ্য সমন্বয়ে Trade Transparency Unit গঠন
- Public Beneficial Ownership Register চালু
- Freight এবং Warehouse অপারেটরদের KYC/AML চেকের আওতায় আনা
- স্বয়ংক্রিয় ও ডেটা-ভিত্তিক কমপ্লায়েন্স সিস্টেম গড়ে তোলা
- অসচেতনতা বা অবহেলায় কঠিন শাস্তি ও পুরস্কারভিত্তিক নীতিমালা চালু করা
- জরুরি সংস্কার প্রয়োজন
BIBM রিপোর্টে বলা হয়েছে- ‘বাংলাদেশের রপ্তানি ও বৈদেশিক ঋণের ওপর নির্ভরশীল অর্থনীতির জন্য TBML নিয়ন্ত্রণ এখন আর বিকল্প নয়—এটি একটি কৌশলগত ও অর্থনৈতিক প্রয়োজন।’
যদি দ্রুত পদক্ষেপ না নেওয়া হয়, তাহলে শুধু রাজস্ব ক্ষতি নয় বরং আন্তর্জাতিক মানি লন্ডারিং পর্যবেক্ষণ সংস্থার গ্রে-লিস্টে পড়ার ঝুঁকিও তৈরি হবে। এতে বাংলাদেশের বৈধ বাণিজ্যে লেনদেন খরচও বেড়ে যাবে।

