বিশ্বজুড়ে আলোড়ন তুলেছে ট্রাম্প প্রশাসনের নতুন শুল্ক নীতি। এবার সে ঢেউ এসে ঠেকেছে বাংলাদেশে। যেসব দেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য চুক্তি নেই, তাদের জন্য একেবারে ‘ছুরির মুখে’ ফেলে দেওয়া হচ্ছে ১৫ থেকে ৩৫ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক। আর সেই তালিকায় রয়েছে বাংলাদেশও।
এই শুল্ক যদি বাস্তবায়ন হয়, তাহলে দেশের তৈরি পোশাকসহ রপ্তানি খাত ভয়াবহ ঝুঁকিতে পড়বে। তাই শেষ মুহূর্তে রপ্তানি বাজার রক্ষা করতে মরিয়া হয়ে উঠেছে বাংলাদেশ। ওয়াশিংটন ডিসিতে চলছে উচ্চ পর্যায়ের চূড়ান্ত আলোচনা। সময়সীমা—১ আগস্ট। তার আগেই চুক্তিতে পৌঁছাতে না পারলে ফলাফল হতে পারে ভয়াবহ।
বাংলাদেশের পক্ষে এই আলোচনায় নেতৃত্ব দিচ্ছেন বাণিজ্য উপদেষ্টা এসকে বশির উদ্দিন। তার সঙ্গে রয়েছেন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমান, বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমান এবং অতিরিক্ত বাণিজ্য সচিব নাজনীন কাউসার চৌধুরী।
তাদের বিপরীতে মার্কিন পক্ষের নেতৃত্বে রয়েছেন ইউএস ট্রেড রিপ্রেজেন্টেটিভ অফিসের সহকারী বাণিজ্য প্রতিনিধি ব্রেন্ডান লিঞ্চ এবং বাণিজ্য ও শুল্কনীতি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। দুই পক্ষের আলোচনা এখন একেবারে শেষ ধাপে।
বাংলাদেশের অর্থনীতির বড় একটি অংশই দাঁড়িয়ে আছে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে তৈরি পোশাক রপ্তানির ওপর। ২০২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশ প্রায় ৮.২ বিলিয়ন ডলারের পোশাক রপ্তানি করেছে। বর্তমানে যা কিছুটা শুল্কের মধ্য দিয়েই যায়, কিন্তু যদি ট্রাম্পের প্রস্তাবিত নতুন শুল্ক—১৫ শতাংশ থেকে বেড়ে ২৫ বা ৩৫ শতাংশ হয়—তাহলে বাংলাদেশের পক্ষে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে টিকে থাকা প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়াবে।
এই পরিস্থিতিতে দেশের তৈরি পোশাক খাতে নিয়োজিত প্রায় ৪০ লাখ শ্রমিকের ভবিষ্যৎ নিয়েও শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
এক শীর্ষস্থানীয় পোশাক রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানের এক কর্মকর্তা গণমাধ্যমকে বলেন, “আমরা শ্বাসরুদ্ধকর এক অপেক্ষায় আছি। যুক্তরাষ্ট্র আমাদের সবচেয়ে বড় বাজার। ৩৫ শতাংশ শুল্ক হলে এই বাজার ধরে রাখা যাবে না। এমনকি ১৫ শতাংশ শুল্কও আমাদের পায়ের নিচের মাটি কাঁপিয়ে দেবে।”
এই আলোচনার পটভূমিতে রয়েছে ভারত-যুক্তরাষ্ট্রের ব্যর্থতা। ভারতের সঙ্গে কয়েক মাসের আলোচনা ভেস্তে যাওয়ার পর ট্রাম্প সরকার দিল্লির ওপর ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছে।
মূলত মার্কিন কৃষিপণ্যের জন্য ভারতের বাজার উন্মুক্ত না হওয়ায় এই আলোচনা ব্যর্থ হয়। যুক্তরাষ্ট্র গম, চাল, ভুট্টা ইত্যাদি রপ্তানি করতে চেয়েছিল, কিন্তু ভারতের পক্ষ থেকে বলা হয়—প্রান্তিক কৃষকদের স্বার্থ রক্ষায় তারা সেই পথে হাঁটবে না।
ফলে ট্রাম্পের চরম সিদ্ধান্ত—২৫ শতাংশ শুল্ক। এর ফলে ভারতের রপ্তানিকারকদের মধ্যে ব্যাপক আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রে ভারতের ২০২৪ সালের রপ্তানির পরিমাণ যেখানে ছিল ৮৭ বিলিয়ন ডলার।
বাংলাদেশও বুঝেছে—শুধু যুক্তি দিয়ে এই ঝড় থামানো যাবে না। তাই চুক্তির টেবিলে উঠেছে বড় বড় প্রস্তাব।
সরকার আগামী পাঁচ বছরে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ৩৫ লাখ টন গম আমদানি করতে চায়। এছাড়া কয়েক বিলিয়ন ডলারের বোয়িং বিমান কেনার পরিকল্পনাও আছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বিশাল ব্যবসায়িক সুযোগ তৈরি করবে। সেই সঙ্গে এলএনজি, তুলা, সয়াবিন ও অন্যান্য কৃষিপণ্য আমদানি বাড়ানোর প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছে। উদ্দেশ্য—যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ৬ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য ঘাটতি কমানো এবং একটি ভারসাম্য তৈরি করা।
বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমান ওয়াশিংটন থেকে বলেন, “আমাদের অবস্থান গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। আমরা এমন সব প্রস্তাব দিয়েছি যা উভয় দেশের জন্যই লাভজনক। আলোচনা খুব ইতিবাচক পরিবেশে চলছে।”
এই মুহূর্তে বাংলাদেশের সামনে সুযোগ এবং সংকট—দুটোই। যদি আলোচনার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি কার্যকর চুক্তি করা যায়, তাহলে শুধু শুল্ক নয়—রপ্তানি খাতও রক্ষা পাবে, শ্রমবাজারও স্থিতিশীল থাকবে।
আর যদি আলোচনা ব্যর্থ হয়, তাহলে ট্রাম্পের শুল্ক নীতির প্রথম শিকার হতে পারে বাংলাদেশ। এবং তার প্রভাব শুধু তৈরি পোশাকেই নয়, গোটা অর্থনীতিতেই পড়বে।

