চার মাস আগেই বিশ্ব অর্থনীতিকে নাড়িয়ে দিয়েছিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। এপ্রিল মাসে আচমকা আমদানি পণ্যের ওপর ব্যাপক শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়ে তিনি সারা বিশ্বকে চমকে দেন। তবে বিশ্ববাজারে শুরু হওয়া আতঙ্ক ঠেকাতে তখনকার মতো বেশিরভাগ শুল্কই স্থগিত রাখতে হয়েছিল তাঁকে।
কিন্তু এখন, চার মাস পেরিয়ে যাওয়ার পর, ট্রাম্প নিজের পদক্ষেপকে ‘বিজয়’ হিসেবে তুলে ধরছেন। তিনি একের পর এক বাণিজ্য চুক্তি ঘোষণা করছেন, আবার একপাক্ষিকভাবে অন্যদের ওপর শুল্ক বসিয়েও চলেছেন—যার ফলে এখনো পর্যন্ত বড় ধরনের আর্থিক বিপর্যয় দেখা যায়নি। অন্তত আপাতত।
ট্রাম্প এখন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিকে নতুন করে সাজানোর প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। বলছেন, এসব পদক্ষেপ থেকে আসবে বিপুল রাজস্ব, ফিরে আসবে দেশের শিল্প, তৈরি হবে চাকরি, আর বৈদেশিক বিনিয়োগে ভরপুর হবে মার্কিন অর্থনীতি।
কিন্তু প্রশ্ন হলো—এইসব দাবি কতটা টেকসই? আদৌ কি সত্যি হবে সেসব কথা? নাকি বরং দীর্ঘমেয়াদে এর মূল্য দিতে হবে মার্কিন অর্থনীতিকে?
ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদ শুরুর আগেই ‘ফ্রি ট্রেড’ বা মুক্ত বাণিজ্যের পক্ষে থাকা বৈশ্বিক মনোভাব কিছুটা নড়বড়ে হয়ে উঠছিল। এখন তা যেন রীতিমতো এক বদলে যাওয়া ঢেউয়ে রূপ নিয়েছে।
বিশ্বের নানা দেশ আজ নতুন বাণিজ্য জোট গঠনের কথা ভাবছে। ট্রাম্প হয়তো স্বল্পমেয়াদে ‘বিজয়’ দাবি করছেন, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এই পদক্ষেপে তাঁর চাওয়া ফল আদৌ আসবে কিনা, সেটাই এখন বড় প্রশ্ন।
‘৯০ দিনে ৯০ চুক্তি’—বাস্তবে মাত্র ১২টি!
ট্রাম্প প্রশাসন সতর্ক করেছিল, ১ আগস্টের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নতুন বাণিজ্য চুক্তি না করলে বড় ধরনের শুল্কের মুখে পড়তে হবে। হোয়াইট হাউজের বাণিজ্য উপদেষ্টা পিটার নাভারো তো বলেই ফেলেছিলেন—“৯০ দিনে ৯০টি চুক্তি!”
কিন্তু বাস্তবে জুলাইয়ের শেষ নাগাদ চূড়ান্ত ঘোষণা এসেছে মাত্র ১২টির মতো। অনেকগুলোর দৈর্ঘ্য এমনকি দুই পৃষ্ঠার বেশি না, যেখানে পুরোনো যুগের চুক্তিগুলোতে থাকতো বিস্তারিত নিয়ম ও সুরক্ষা।
যুক্তরাজ্য, ইউরোপ, জাপান—শুল্কের ভিন্ন হারে বার্তা স্পষ্ট
সবার আগে এগিয়ে আসে যুক্তরাজ্য। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ব্রিটেনের বাণিজ্য ঘাটতি তুলনামূলক কম হওয়ায় তাদের ওপর আরোপিত ১০% শুল্ক প্রথমে কিছুটা চমকে দিলেও পরে সেটা যেন স্বস্তি এনে দেয়—কারণ ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও জাপানের মতো দেশের জন্য সেটা ১৫% পর্যন্ত দাঁড়ায়।
যেসব দেশ বেশি মার্কিন পণ্য কিনতে রাজি হয়নি, তাদের ওপর বসেছে আরও কড়াকড়ি শুল্ক। দক্ষিণ কোরিয়া, পাকিস্তান, কম্বোডিয়া—তালিকা ক্রমেই দীর্ঘ হচ্ছে।
বিশ্ব অর্থনীতির জন্য আপাতদৃষ্টিতে সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি এড়ানো গেছে। তবে গবেষকেরা সতর্ক করছেন—এর প্রভাব এখনই পুরোপুরি ধরা পড়ছে না।
অক্সফোর্ড ইকোনমিক্সের অর্থনীতিবিদ বেন মে বলছেন, “এই শুল্কগুলো যুক্তরাষ্ট্রে পণ্যের দাম বাড়াবে, এতে ভোক্তাদের আয় কমবে। একইসঙ্গে আমেরিকা যদি কম পণ্য আমদানি করে, তাহলে বৈশ্বিক চাহিদাও কমে যাবে।”
চীনের ওপর শুল্ক-ভীতির ফলে অ্যাপল এখন ফোন উৎপাদনের বড় অংশ ভারতে সরিয়ে নিচ্ছে। ফলে গত কয়েক মাসে মার্কিন বাজারে সবচেয়ে বেশি স্মার্টফোন এসেছে ভারত থেকে।
তবে ভারত জানে, ভিয়েতনাম কিংবা ফিলিপাইনের মতো কম শুল্কভুক্ত দেশগুলোই আবার পরবর্তী ‘প্রিয়’ রপ্তানিকারক হয়ে উঠতে পারে।
অর্থনীতির ভবিষ্যৎ, ট্রাম্পের রাজনৈতিক ঝুঁকি
যদিও শুল্কবৃদ্ধির ফলে সরকারের রাজস্ব বেড়েছে—এই বছরের শুরুর তুলনায় আমদানি শুল্ক বেড়ে গড়ে ১৭% হয়েছে—তবুও এই নীতি রাজনৈতিকভাবে ট্রাম্পের জন্য বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে।
শুল্ক থেকে রাজস্ব বেড়ে $১০০ বিলিয়নের বেশি হলেও, এর চাপ এখনো পুরোপুরি এসে পড়েনি সাধারণ ক্রেতার ঘাড়ে। ইউনিলিভার, অ্যাডিডাসের মতো বড় ব্র্যান্ডগুলো এখন খোলাখুলি বলছে—মূল্যবৃদ্ধি আসছে।
এতে ভোক্তার ব্যয় কমতে পারে, যা ট্রাম্পের স্বপ্নের সুদ কমানোর পথেও বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
সেই আশঙ্কায় হোয়াইট হাউজ ভেবেছে—স্বল্প আয়ের মানুষের জন্য রিবেট চেক চালুর কথা, যাতে কিছুটা ক্ষতিপূরণ দেওয়া যায়। তবে এমন উদ্যোগ নিতে কংগ্রেসের অনুমতি দরকার, আর সেটা একেবারেই সহজ কাজ নয়।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়—অনেক বড় দেশের সঙ্গেই এখনো কোনো চুক্তি হয়নি। কানাডা, তাইওয়ান, এমনকি চীন—এই দেশগুলো এখনো আলোচনার পর্যায়ে।
চুক্তিগুলোর অনেকটাই মৌখিক, কাগজে-কলমে সই হয়নি এখনো। অনেক দেশ আবার ট্রাম্প যেসব ‘শর্ত’ তুলে ধরছেন, সেগুলোর বাস্তবতা অস্বীকার করছে।
অক্সফোর্ড ইকোনমিক্স বলছে—“শর্তগুলোর গভীরে গেলে দেখা যায়, এসব চুক্তির খুঁটিনাটি এখনো পরিষ্কার নয়।”
যুক্তরাষ্ট্র কি নিজেই নিজের বিশ্বনেতৃত্বকে দুর্বল করছে?
বিশ্ব যেন ধীরে ধীরে এক পুরোনো অচলায়তন থেকে বেরিয়ে নতুন বাণিজ্য কাঠামোর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র একসময় যে ব্যবস্থার নেতৃত্ব দিয়েছিল, সেই বাণিজ্যিক বিশ্বব্যবস্থাই এখন আমূল বদলে যেতে পারে।
আর সেটা যদি হয়, তাহলে ভবিষ্যতে এর সুফল আদৌ যুক্তরাষ্ট্র পাবে কিনা, সে বিষয়ে সন্দেহ থাকছেই।
ট্রাম্প হয়তো এখন নতুন চুক্তি আর রাজস্বের জয়গান গাইছেন। কিন্তু বছরের শেষে সাধারণ মার্কিন নাগরিক যদি দেখতে পান—দাম বেড়েছে, পছন্দের পণ্য কমেছে, চাকরি সেই আগের জায়গাতেই দাঁড়িয়ে—তাহলে এই নীতির রাজনৈতিক মূল্য তাঁকেই দিতে হতে পারে।
এই নতুন বাণিজ্য বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্র হয়তো এখনো নেতৃত্বে আছে, কিন্তু তার ওপর অন্য দেশগুলোর আস্থা আগের মতো নেই। আগামী বছরগুলোয় হয়তো আরও নতুন জোট, নতুন বাজার তৈরি হবে—যেখানে ট্রাম্পের যুক্তরাষ্ট্র থাকবে না বলেই ধরছে অনেকেই। এখন সময়ই বলে দেবে, এই ‘বিজয়’ আসলে কতটা টেকসই আর কতটা ব্যয়বহুল।

