বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য চলতি অর্থবছর এক বড় সাফল্যের বার্তা নিয়ে এসেছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রবাসীরা দেশে পাঠিয়েছেন ৩০.৩৩ বিলিয়ন ডলার, যা একক অর্থবছরে দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স প্রবাহ। শুধু জুলাই মাসেই এসেছে ২.৩৬৮ বিলিয়ন ডলার, যেখানে গত বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রবৃদ্ধি ৩২ শতাংশ। এই অগ্রগতি নিঃসন্দেহে অর্থনীতিতে আশার বার্তা যোগ করছে, বিশেষত এমন সময়ে যখন বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ নিয়ে নানা উদ্বেগ চলছে।
তবে এই সাফল্যের পেছনে যেসব কারণ রয়েছে, সেগুলোও গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করা দরকার। হুন্ডি বা অনানুষ্ঠানিক চ্যানেলকে নিয়ন্ত্রণে আনতে সরকার গত এক বছরে বেশ কড়াকড়ি ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। সেই সঙ্গে ব্যাংকিং চ্যানেলে টাকা পাঠালে যে নগদ প্রণোদনা মেলে, তা ধরে রাখা হয়েছে এবং রেমিট্যান্স পাঠানোর প্রক্রিয়াকেও কিছুটা সহজতর করা হয়েছে। এসব পদক্ষেপের ফলে প্রবাসীরা আবারও আনুষ্ঠানিক পথে ফিরে এসেছেন। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় থাকা অভিবাসীরা এখন নিয়মিত ব্যাংকের মাধ্যমে অর্থ পাঠাচ্ছেন।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—গত অর্থবছরের তুলনায় এবার প্রবাসী শ্রমিকের সংখ্যা বেড়েছে। সরকার বিভিন্ন দেশের সঙ্গে শ্রমবাজারে চুক্তি পুনরায় চালু করেছে, নতুন ভিসা ইস্যু হয়েছে এবং পুরোনোদের ভিসা নবায়নও বেড়েছে। এসবের সম্মিলিত প্রভাব পড়েছে রেমিট্যান্স প্রবাহে। কিন্তু এই চিত্রের মধ্যেও কিছু সতর্কতা রয়েছে।
রেমিট্যান্স প্রবাহ দীর্ঘমেয়াদে টেকসই করতে হলে প্রবাসীদের জন্য বিদেশে কাজের পরিবেশ, দক্ষতা প্রশিক্ষণ এবং শ্রমবাজারে প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা বৃদ্ধির দিকে নজর দিতে হবে। কারণ শুধুমাত্র প্রণোদনা দিয়ে রেমিট্যান্স ধরে রাখা সম্ভব নয়, যদি প্রবাসীরা ধীরে ধীরে বিদেশে কর্মসংস্থান হারান বা অনিয়মিত হয়ে পড়েন। পাশাপাশি হুন্ডি বা চোরাপথে অর্থপাঠের নতুন কৌশল তৈরি হলে আবারও ব্যাংকিং চ্যানেল হুমকিতে পড়তে পারে।
অর্থনীতিতে রেমিট্যান্স প্রবাহ নিঃসন্দেহে অক্সিজেনের মতো। এটি শুধু বৈদেশিক মুদ্রার সরবরাহ বাড়ায় না, গ্রামীণ অর্থনীতিতে প্রাণচাঞ্চল্য আনে, সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করে এবং ভোক্তা চাহিদাও শক্তিশালী করে। কিন্তু এই প্রবাহকে কেন্দ্র করে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা করতে হবে আরও গভীরভাবে। যেমন—রেমিট্যান্স নির্ভরতা কমিয়ে অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বাড়ানো, রপ্তানি বাজার বহুমুখীকরণ এবং প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতির দিকে এগিয়ে যাওয়া।
এবারের রেকর্ড রেমিট্যান্স নিঃসন্দেহে প্রশংসাযোগ্য। এটি প্রমাণ করে, বিদেশে অবস্থানরত কোটি প্রবাসী এখনও দেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি। কিন্তু এই সাফল্য ধরে রাখতে হলে এখনই আরও দূরদর্শী সিদ্ধান্ত নিতে হবে। স্বস্তির হাসির সঙ্গে সতর্ক দৃষ্টি না রাখলে ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা কঠিন হয়ে পড়তে পারে।

