দেশের অর্থনীতিতে এখন এক ধরনের মিশ্র চিত্র দেখা যাচ্ছে। একদিকে মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমেছে, রেমিট্যান্সপ্রবাহ বেড়েছে এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও তুলনামূলক স্থিতিশীল রয়েছে। অন্যদিকে রপ্তানি আয় কমে যাওয়া, রাজস্ব ঘাটতি, উন্নয়ন ব্যয়ের ধীরগতি এবং জ্বালানি খাতের চাপ সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতিকে অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ (জিইডি) প্রকাশিত এপ্রিল মাসের ‘ইকোনমিক আপডেট অ্যান্ড আউটলুক’-এ এমন পরিস্থিতির চিত্র উঠে এসেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, মার্চ ২০২৬-এ দেশের সার্বিক মূল্যস্ফীতি কমে ৮ দশমিক ৭১ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। ফেব্রুয়ারিতে এ হার ছিল ৯ দশমিক ১৩ শতাংশ। মূলত চালের দাম কমে যাওয়ায় মূল্যস্ফীতিতে এই স্বস্তি এসেছে। বোরো মৌসুমে সরবরাহ বৃদ্ধি, চাল আমদানি এবং খোলাবাজারে বিক্রির কারণে মার্চে চালের মূল্যস্ফীতি নেমে যায় ঋণাত্মক ২ দশমিক ২০ শতাংশে।
তবে খাদ্যপণ্যের অন্য খাতে এখনো চাপ রয়ে গেছে। বিশেষ করে মাংস, মাছ ও সবজির দাম বাড়তে থাকায় সাধারণ মানুষের ব্যয় কমেনি। মাংসের মূল্যস্ফীতি ১৫ শতাংশ ছাড়িয়েছে। একই সঙ্গে খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতিও ৯ শতাংশের ওপরে অবস্থান করছে। বাসাভাড়া, পরিবহন ব্যয়, জ্বালানি এবং বিভিন্ন সেবার মূল্য বৃদ্ধি এই চাপকে আরও বাড়িয়ে তুলছে।
অন্যদিকে মজুরি বৃদ্ধির হারও মূল্যস্ফীতির তুলনায় পিছিয়ে রয়েছে। মার্চে মজুরি প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ০৯ শতাংশে। ফলে মানুষের প্রকৃত আয় ও ক্রয়ক্ষমতার ওপর চাপ অব্যাহত রয়েছে।
বৈদেশিক খাতে অবশ্য ইতিবাচক প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। চলতি অর্থবছরে ধারাবাহিকভাবে রেমিট্যান্স বেড়েছে। মার্চে প্রবাসী আয় প্রায় ৩ দশমিক ৭৬ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। এর প্রভাবে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও শক্ত অবস্থানে রয়েছে। ফেব্রুয়ারিতে রিজার্ভ ৩৫ বিলিয়ন ডলার ছাড়ালেও মার্চে তা সামান্য কমে প্রায় ৩৪ বিলিয়ন ডলারে নেমে আসে।
তবে রপ্তানি খাতে পরিস্থিতি উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে। ২০২৬ সালের প্রথম তিন মাসে রপ্তানি আয় ধারাবাহিকভাবে কমেছে। ফেব্রুয়ারিতে রপ্তানি প্রবৃদ্ধি নেমে যায় মাইনাস ১২ শতাংশে এবং মার্চে তা আরও কমে মাইনাস ১৮ শতাংশে দাঁড়ায়। তৈরি পোশাকসহ বিভিন্ন খাতে এই চাপ স্পষ্ট। বৈশ্বিক বাজারে চাহিদা কমে যাওয়া, জ্বালানি ব্যয় বৃদ্ধি এবং উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়াকে এর প্রধান কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
রাজস্ব আদায়েও বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়েছে। মার্চ মাসে লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় প্রায় ১৯ হাজার ৭৬৯ কোটি টাকা কম রাজস্ব আদায় হয়েছে। মোট আদায় হয়েছে ৩৩ হাজার ৫২১ কোটি টাকা, যা নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার মাত্র ৬২ দশমিক ৯০ শতাংশ। ভ্যাট, আয়কর এবং আমদানি-রপ্তানি শুল্ক—সব ক্ষেত্রেই ঘাটতি রয়েছে। এতে সরকারের বাজেট ব্যবস্থাপনার ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে।
উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নেও ধীরগতি দেখা যাচ্ছে। চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে মার্চ পর্যন্ত সময়ে উন্নয়ন ব্যয় কমেছে। মার্চ মাসে ব্যয় হ্রাস বিশেষভাবে লক্ষণীয়। প্রশাসনিক জটিলতা, প্রকল্প প্রস্তুতিতে ধীরগতি এবং অর্থায়নের সীমাবদ্ধতাকে এ অবস্থার কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
ব্যাংকিং খাতে আমানত কিছুটা বাড়লেও সরকারি ঋণগ্রহণ দ্রুত বাড়ছে। ফেব্রুয়ারিতে সরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি প্রায় ৩০ শতাংশে পৌঁছেছে। বিশেষ করে জ্বালানি খাতসহ বিভিন্ন খাতে সরকারের ব্যয় বৃদ্ধি এর পেছনে ভূমিকা রেখেছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, এই প্রবণতা দীর্ঘমেয়াদে বেসরকারি খাতের ঋণপ্রাপ্তিতে চাপ তৈরি করতে পারে।
এদিকে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা এবং মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনাকেও বড় ঝুঁকি হিসেবে দেখছে জিইডি। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বাড়লে আমদানি ব্যয় বাড়তে পারে। এর প্রভাব পড়তে পারে মূল্যস্ফীতি ও বিনিময় হারের ওপরও। একই সঙ্গে টাকার প্রকৃত কার্যকর বিনিময় হার বৃদ্ধিও মুদ্রার ওপর চাপের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অর্থনীতির কিছু সূচকে ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা গেলেও সামগ্রিক পরিস্থিতি এখনো ঝুঁকিমুক্ত নয়। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, রপ্তানি পুনরুদ্ধার, রাজস্ব ব্যবস্থার সংস্কার এবং বিনিয়োগ বাড়ানোর উদ্যোগ দ্রুত বাস্তবায়ন না হলে অর্থনীতির ওপর চাপ আরও বাড়তে পারে।

