একটা ভুল সিদ্ধান্ত, আর তার চড়া মূল্য দিতে হলো পুরো জাতিকে। এক যুগেরও বেশি সময় আগের একটি বিদ্যুৎ প্রকল্প নিয়ে নেওয়া অদূরদর্শী পদক্ষেপ আজ সরকারের কাঁধে ২৪৫ কোটি টাকার বোঝা চাপিয়ে দিয়েছে। হ্যাঁ, আমরা কথা বলছি হরিপুর বিদ্যুৎকেন্দ্র নিয়ে স্মিথ কো-জেনারেশন নামের এক মার্কিন কোম্পানির সঙ্গে করা সেই পুরোনো চুক্তির।
ঘটনার শুরু ১৯৯৭ সালে। বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুৎ বোর্ড (পিডিবি) তখন হরিপুরে একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র গড়তে যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানিটির সঙ্গে একটি চুক্তি করে। কিন্তু বছর না যেতেই দেখা যায়, কোম্পানিটি নির্ধারিত শর্তগুলো পূরণে ব্যর্থ হচ্ছে। ফলে ১৯৯৯ সালে চুক্তিটি বাতিল করে পিডিবি। এখান থেকেই শুরু হয় এক জটিল আইনি লড়াই, যার শেষ পরিণতি এখন এসে ঠেকেছে কোটি কোটি টাকার ক্ষতিপূরণে।
চুক্তি বাতিলের পর স্মিথ কো-জেনারেশন আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক সালিশ আদালতে (আইসিসি) অভিযোগ তোলে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে, পিডিবি তখন সালিশ প্রক্রিয়ায় অংশ নেয়নি। খরচ ছিল মাত্র ৬০ হাজার ডলার—আজকের হিসেবে খুব বেশি কিছু নয়। অথচ, এই অনুপস্থিতির কারণে সালিশ ট্রাইব্যুনাল একতরফাভাবে সিদ্ধান্ত দেয় পিডিবির বিপক্ষে। এর ভিত্তিতেই শুরু হয় ক্ষতিপূরণ আদায়ের দীর্ঘ প্রক্রিয়া।
এই রায়ের ফলে একসময় বিশ্বের ছয়টি দেশে মামলা গড়ায়। এমনকি ২০২৪ সালে তো যুক্তরাষ্ট্র সফরে থাকা প্রধানমন্ত্রীর অর্থ উপদেষ্টা ও বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের বিরুদ্ধেও আদালত গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে। তাঁরা তখন ওয়াশিংটনে বাংলাদেশ দূতাবাসে আশ্রয় নিতে বাধ্য হন—দেশের জন্য এক কঠিন ও বিব্রতকর কূটনৈতিক পরিস্থিতি।
শেষ পর্যন্ত সরকার এক জটিল পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে বাধ্য হয়ে মধ্যস্থতা চায়। সেই চুক্তিতেই ২ কোটি মার্কিন ডলারে (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ২৪৫ কোটি টাকা) বিষয়টি নিষ্পত্তি হয়। বলা হয়, এর পুরোটাই দিতে হবে বাংলাদেশ সরকারকে।
যদিও এতে অন্তত গ্রেপ্তারি পরোয়ানা তুলে নেওয়া গেছে এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিনিধিদের স্বাভাবিক কার্যক্রমে ফেরানো গেছে, তবুও প্রশ্ন রয়ে গেছে—এত বড় মূল্য কি একটু বেশি দূরদর্শিতা দেখিয়ে এড়ানো যেত না?
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যদি সরকার সেই সময় সালিশ আদালতে অংশ নিত, তাহলে ন্যায্যভাবে নিজ অবস্থান তুলে ধরতে পারত। কারণ প্রকল্প বাস্তবায়নে ব্যর্থ হয়েছিল মূলত ওই মার্কিন কোম্পানিই। কিন্তু দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের অবহেলা ও সিদ্ধান্তহীনতায় বাংলাদেশই ক্ষতিগ্রস্ত হলো।
এখন সবচেয়ে জরুরি বিষয় হচ্ছে—এই ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত। যেসব কর্মকর্তা বা প্রতিষ্ঠান এ ঘটনার জন্য দায়ী, তাঁদের জবাবদিহির আওতায় আনা দরকার। নয়তো এমন ভুল আবারও হবে, আর পরিণতি আবারও ভোগ করতে হবে আমাদের সবাইকে।

