বাংলাদেশের এলডিসি (স্বল্পোন্নত দেশ) থেকে উত্তরণ নিয়ে আবারও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বাণিজ্য উপদেষ্টা। তিনি একে আখ্যা দিয়েছেন “টিকটিক করা টাইম বোমা” হিসেবে এবং প্রয়োজনীয় প্রস্তুতির অভাবে হতাশা প্রকাশ করেছেন।
এ প্রশ্ন উঠেছে—এ কি এক হাতে যা হচ্ছে, অন্য হাত জানে না? কারণ গত মার্চে উপদেষ্টা পরিষদ সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, বাংলাদেশ উত্তরণের সময় পিছানোর আবেদন করবে না। তখন প্রধান উপদেষ্টা নির্দেশ দেন, নভেম্বর ২০২৬ সালে পরবর্তী ধাপের জন্য প্রস্তুতি শুরু করতে।
নিজ সিদ্ধান্তে বাংলাদেশ এলডিসি পর্যায়ে থাকতে পারবে না। তবে নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ করলে জাতিসংঘের উন্নয়ন নীতি কমিটি (CDP)-র কাছে সময় পিছানোর আবেদন করা যায়। এই কমিটি প্রতি তিন বছর অন্তর দেশগুলোর অগ্রগতি যাচাই করে—মূলত মাথাপিছু স্থূল জাতীয় আয় (GNI), মানবসম্পদ সূচক (HAI) এবং অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত ঝুঁকি সূচক (EVI) দিয়ে। বাংলাদেশ ২০১৮ এবং ২০২১—দুইবারই সব সূচকে উত্তরণের মানদণ্ড অতিক্রম করেছে।
অতীতে সময় পিছানোর নজির খুবই কম এবং তা কেবল বড় ধরনের বাহ্যিক ধাক্কায় হয়েছে। যেমন—২০১৫ সালের ভূমিকম্পের পর নেপাল এবং ২০২০ সালের মহামারীতে নেপাল ও আরও কিছু দেশ সময় বাড়ায়। ভানুয়াতু সময় পায় সাইক্লোন পামের কারণে। কোভিড-১৯ মহামারীর প্রভাবে বাংলাদেশও ২০২৪ থেকে ২০২৬ পর্যন্ত দুই বছরের অতিরিক্ত সময় পেয়েছিল।
নতুন ধাক্কা ও সম্ভাব্য যুক্তি
২০২৪ সালের জুলাইয়ের রাজনৈতিক অস্থিরতা, নিরাপত্তা ও চলাচলে বিঘ্ন, বন্যা, জ্বালানি দামের অস্থিরতা এবং যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কনীতি (ট্রাম্প ট্যারিফ) মিলিয়ে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বড় চাপ তৈরি করেছে। সিডিপি চাইলে এসব যুক্তিকে প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা মহামারীর মতো গুরুত্ব দিয়ে সময় বৃদ্ধির সুপারিশ করতে পারে। তবে এর পক্ষে বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ দেওয়া কঠিন, কারণ সরকারি ও বেসরকারি বহু সূত্র এখনও বাংলাদেশের অগ্রগতি তুলে ধরছে।
২০২৫ সালের জুলাইয়ে জাতিসংঘের হাই-লেভেল পলিটিক্যাল ফোরামে উপস্থাপিত স্বেচ্ছা জাতীয় পর্যালোচনা (VNR) প্রতিবেদনে বলা হয়—
- ২০১৬ সালে দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করা মানুষের হার ছিল ১৩.৪৭%, যা ২০২২ সালে কমে ৫%-এ নেমে এসেছে।
- গত এক দশকে মাতৃ ও শিশুমৃত্যুর হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
- কোভিড-পরবর্তী সময়ে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ফিরেছে, যদিও উৎপাদনশীলতা ও মাথাপিছু আয় এখনও লক্ষ্যের নিচে।
- জিডিপিতে উৎপাদন খাতের অংশ ২০১৬ সালের ২০.৩৫% থেকে ২০২৪ সালে বেড়ে হয়েছে ২৩.৮২%।
এসব অর্জন ইঙ্গিত দেয়, এলডিসি সুবিধা তুলে নিলেও দেশ সঙ্গে সঙ্গে বিপর্যস্ত হবে না। তবে প্রতিযোগিতা ধরে রাখতে উৎপাদনশীলতা বাড়ানো জরুরি। প্রশ্ন হলো—চার বছর সময় কি যথেষ্ট নয় এই পরিবর্তনের জন্য?
সময় বাড়ানোর ঝুঁকি ও সুযোগ
সময়সীমা পিছিয়ে দিলে স্থানীয় শিল্পখাত পুনর্গঠনের সুযোগ পাবে। কিন্তু এতে অর্থনৈতিক সংস্কার ও বহুমুখীকরণের গতি থমকে যেতে পারে। তাই সময় চাইলে তা হতে হবে পরিকল্পিত ও বিশ্বাসযোগ্য পদক্ষেপ, যেন আন্তর্জাতিক মহল মনে না করে যে বাংলাদেশ উন্নয়ন থেকে সরে যাচ্ছে।
একটি সম্ভাব্য যুক্তি হতে পারে—সরকারি পরিসংখ্যানের নির্ভুলতা নিয়ে প্রশ্ন। ২০২২ সালে বিশ্বব্যাংক বলেছিল, বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি কিছুটা বেশি দেখানো হয়েছে। ২০২৪ সালের হোয়াইট পেপারেও বিষয়টি উঠে আসে। কিন্তু এই তথ্যের ভিত্তিতে আন্তর্জাতিক সংস্থা বা সিডিপি-র স্বীকৃতি পাওয়ার মতো স্বাধীন ও গভীর পর্যালোচনা হয়নি।
জাতিসংঘের সূচক পুনর্মূল্যায়নের জন্য সরকার আন্তর্জাতিক সংস্থার সঙ্গে যৌথভাবে তিনটি মূল সূচকের অডিট করতে পারে। তবে অডিটে প্রমাণ করতে হবে, বাংলাদেশ অন্তত দুইটি সূচকে মানদণ্ডের নিচে নেমে গেছে—যা সহজ নয়।
মার্চ ২০২৬ সালে সিডিপি-র পরবর্তী ত্রৈবার্ষিক পর্যালোচনার আগে আবেদন করতে হবে। তাই সরকারকে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হবে—দেশ কি বহিরাগত ধাক্কা ও ভঙ্গুর অর্থনৈতিক ভিত্তির যুক্তি দেখিয়ে সময় চাইবে, নাকি নির্ধারিত সময়েই উত্তরণের প্রস্তুতি নেবে।
উত্তরণের ট্রেন প্ল্যাটফর্ম ছাড়তে শুরু করেছে। এখন প্রশ্ন—বাংলাদেশ কি “ভালনারেবিলিটি” বা “ডেটা” ব্রেক টেনে ট্রেন থামাতে পারবে, নাকি কেবল সময়ক্ষেপণেই সীমাবদ্ধ থাকবে?
লেখক: জাহিদ হুসাইন, সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ, বিশ্বব্যাংক ঢাকা অফিস

