চট্টগ্রামকে ঘিরে বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও যোগাযোগ ব্যবস্থার সম্প্রসারণে নতুন করে গতি আনার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। দায়িত্ব নেওয়ার প্রথম ছয় মাসে একাধিক প্রকল্প ও নীতিগত পদক্ষেপ সামনে এসেছে, যার লক্ষ্য বন্দরনির্ভর অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করা, বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং পণ্য পরিবহনের খরচ ও সময় কমানো।
এর মধ্যে আনোয়ারায় চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্পাঞ্চলের নির্মাণকাজ শুরু, মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল প্রতিষ্ঠার কাঠামো প্রণয়ন এবং মাতারবাড়ীতে ১ বিলিয়ন ডলারের সবুজ জাহাজ নির্মাণ ও মেরামতকেন্দ্র স্থাপনের নীতিগত অনুমোদন উল্লেখযোগ্য।
ব্যবসায়ীরা এসব উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখলেও তাদের মতে, শুধু প্রকল্প গ্রহণ করলেই চট্টগ্রামের সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগবে না। দ্রুত বাস্তবায়নের পাশাপাশি রেল ও সড়ক যোগাযোগ উন্নয়ন, বন্দর ও শুল্ক কার্যক্রমের জটিলতা কমানো এবং বিমানবন্দরকে আন্তর্জাতিক পণ্য পরিবহনের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার দিকেও নজর দিতে হবে।
এক দশক পর শুরু চীনা শিল্পাঞ্চলের কাজ
দীর্ঘ এক দশকের অপেক্ষার পর আনোয়ারায় চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্পাঞ্চলের নির্মাণকাজ গত জুলাইয়ের শেষ দিকে শুরু হয়েছে। চট্টগ্রামের শিল্প ও বাণিজ্য কাঠামো বদলে দেওয়ার ক্ষেত্রে এটিকে বড় একটি পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
প্রায় ৮০০ একর জায়গাজুড়ে গড়ে উঠতে যাওয়া এ শিল্পাঞ্চলে ১ বিলিয়ন ডলারের বেশি বিনিয়োগ আসতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে। পাশাপাশি কর্মসংস্থান হতে পারে ১ লাখের বেশি মানুষের।
প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয়েছে ৪ হাজার ১৮৯ কোটি ৪৬ লাখ টাকা। জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি গত জুনে প্রকল্পটি অনুমোদন করে।
বাংলাদেশ ও চীন ২০১৪ সালে শিল্পাঞ্চলটি প্রতিষ্ঠার বিষয়ে প্রাথমিক সমঝোতা স্মারক সই করেছিল। কিন্তু প্রশাসনিক জটিলতা, অর্থায়নসহ বিভিন্ন কারণে এতদিন প্রকল্পটির বাস্তবায়ন আটকে ছিল।
সরকারি ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ এবং চায়না রোড অ্যান্ড ব্রিজ করপোরেশনের অংশগ্রহণে প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হচ্ছে।
শিল্পাঞ্চলের অবকাঠামোর মধ্যে থাকবে বহুমুখী জেটি, চার লেনের সড়ক, কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার, বিদ্যুৎ উপকেন্দ্র, গ্যাস ও পানি সরবরাহ ব্যবস্থা এবং অন্যান্য শিল্প অবকাঠামো।
শুধু কারখানা স্থাপনের মধ্যেই এর অর্থনৈতিক প্রভাব সীমাবদ্ধ থাকবে না। শিল্পাঞ্চলকে ঘিরে পরিবহন, পণ্য সংরক্ষণ, আবাসন, সরবরাহ ব্যবস্থা ও বিভিন্ন সেবা খাতেও নতুন ব্যবসার সুযোগ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চলে নতুন সম্ভাবনা
চট্টগ্রামের বাণিজ্য সম্ভাবনা বাড়াতে সরকার মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল প্রতিষ্ঠার কাঠামোও সামনে এনেছে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সহজ করা এবং বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের ক্ষেত্রে এটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হতে পারে।
বাজেটে অর্থমন্ত্রী শুল্ক আইন সংশোধনের প্রস্তাব দিয়েছেন, যাতে মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চলে পণ্য আমদানি করে শুল্ক ও কর পরিশোধ ছাড়াই নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ায় সেগুলো সংরক্ষণ, বাছাই, প্যাকেটজাত, উৎপাদন ও রপ্তানির সুযোগ তৈরি করা যায়।
মহেশখালীর মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরের কাছে এবং চট্টগ্রাম বন্দরের পাশে আনোয়ারায় দুটি মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল প্রতিষ্ঠার অনুমোদন দিয়েছে অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি।
এর কাঠামো গত ১৬ জুলাই প্রকাশ করা হয়েছে।
আনোয়ারার মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল চলতি বছরেই কার্যক্রম শুরু করতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে। অন্যদিকে মাতারবাড়ীর অঞ্চলটি ২০৩০ থেকে ২০৩৩ সালের মধ্যে চালুর লক্ষ্য রয়েছে।
মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল ঘিরে আমদানি কার্যক্রম পরিচালনার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকও ব্যাংকগুলোকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিয়েছে। বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনার নিয়ম মেনে অনুমোদিত ব্যাংক এবং বিদেশি মুদ্রাভিত্তিক ব্যাংকিং ইউনিটগুলো এসব লেনদেন পরিচালনা করবে।
এর ফলে চট্টগ্রাম শুধু পণ্য আমদানি-রপ্তানির কেন্দ্র নয়, বরং উৎপাদন ও পুনঃরপ্তানির একটি বড় কেন্দ্র হিসেবেও গড়ে উঠতে পারে।
মাতারবাড়ীতে ১ বিলিয়ন ডলারের জাহাজকেন্দ্র
চট্টগ্রামের সামুদ্রিক অর্থনীতিতে আরেকটি বড় সম্ভাবনার দরজা খুলতে পারে মাতারবাড়ীতে প্রস্তাবিত সবুজ জাহাজ নির্মাণ ও মেরামতকেন্দ্র।
নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় বেসরকারি অর্থায়নে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের ভিত্তিতে ১ বিলিয়ন ডলারের প্রকল্পটির নীতিগত অনুমোদন দিয়েছে।
অস্ট্রেলিয়াভিত্তিক এআইএস মেরিন ইনভেস্টমেন্টস প্রকল্পটির অর্থায়ন করতে পারে। এখন এর কারিগরি ও আর্থিক মূল্যায়ন হবে।
প্রস্তাবিত কেন্দ্রটিতে বড় বাণিজ্যিক জাহাজের নোঙর, রক্ষণাবেক্ষণ ও মেরামতের ব্যবস্থা থাকবে। মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর ছাড়াও বাংলাদেশের অন্যান্য বন্দর এবং বঙ্গোপসাগরে চলাচলকারী বড় জাহাজগুলো এই সুবিধা ব্যবহার করতে পারবে।
বর্তমানে বড় ধরনের মেরামতের প্রয়োজন হলে বাংলাদেশের জাহাজকে অনেক সময় সিঙ্গাপুর, সংযুক্ত আরব আমিরাত কিংবা চীনে যেতে হয়। এতে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয়ের পাশাপাশি সময়ও নষ্ট হয়।
দেশের ভেতরেই বড় জাহাজের মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণের ব্যবস্থা গড়ে উঠলে এই খরচের একটি বড় অংশ কমানো সম্ভব হতে পারে। একই সঙ্গে জাহাজ নির্মাণ, মেরামত এবং সামুদ্রিক সেবাখাতে নতুন কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
বন্দর ও শুল্ক জটিলতা কমানোর উদ্যোগ
চট্টগ্রামের বাণিজ্য সম্ভাবনা কাজে লাগানোর ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধাগুলোর একটি দীর্ঘদিনের বন্দর ও শুল্ক জটিলতা। পণ্য খালাসে অতিরিক্ত সময়, নানা ধরনের প্রক্রিয়াগত জটিলতা এবং বন্দর ব্যবহারের উচ্চ ব্যয় ব্যবসার সামগ্রিক খরচ বাড়িয়ে দেয়।
এই সমস্যা কমাতে চট্টগ্রাম বন্দর ও শুল্ক বিভাগের কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে একটি যৌথ কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।
গত ১১ জুলাই চট্টগ্রাম বন্দরে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বৈঠকে বন্দর ও শুল্ক বিভাগের কর্মকর্তা, ব্যবসায়ী প্রতিনিধি এবং অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী উপস্থিত ছিলেন।
বৈঠকে বন্দর ব্যবহারের বাড়তি ব্যয় এবং শুল্ক কার্যক্রমের দীর্ঘসূত্রতাকে ব্যবসার খরচ বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। কোন কোন জায়গায় সমস্যা রয়েছে, তা চিহ্নিত করে সেগুলো সমাধানের জন্য সময়সীমাও নির্ধারণ করা হয়েছে।
এ ধরনের সমন্বয় কার্যকরভাবে কাজ করলে পণ্য খালাসের সময় কমার পাশাপাশি আমদানি-রপ্তানি ব্যবসায়ীদের খরচও কমতে পারে।
শুধু বন্দর নয়, দরকার দ্রুত যোগাযোগব্যবস্থা
ব্যবসায়ীদের মতে, চট্টগ্রামের বাণিজ্য সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগাতে হলে শুধু বন্দর উন্নয়ন যথেষ্ট নয়। বন্দর থেকে দেশের অন্যান্য অঞ্চলে দ্রুত পণ্য পৌঁছে দেওয়ার সক্ষমতাও বাড়াতে হবে।
চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হক মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল, ঢাকা-কুমিল্লা কর্ড রেলপথ এবং ঢাকা-চট্টগ্রাম উড়াল মহাসড়ক দ্রুত বাস্তবায়নের দাবি জানিয়েছেন।
তার মতে, স্থানীয় ও বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং ব্যবসার পরিবেশ সহজ করার জন্য এসব উদ্যোগ দ্রুত বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন।
চট্টগ্রাম বিমানবন্দরকে আন্তর্জাতিক পণ্য পরিবহনের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার বিষয়েও তিনি গুরুত্ব দিয়েছেন।
এখানেই মূল চ্যালেঞ্জটি। একটি শিল্পাঞ্চল তৈরি করা হলো, গভীর সমুদ্রবন্দর তৈরি হলো কিংবা মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল চালু হলো—কিন্তু পণ্য যদি দ্রুত দেশের অভ্যন্তরে কিংবা আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছাতে না পারে, তাহলে অবকাঠামোর কাঙ্ক্ষিত অর্থনৈতিক সুফল পাওয়া কঠিন।
প্রতিযোগিতামূলক বাণিজ্যের জন্য সময় কমানো জরুরি
আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে শুধু উৎপাদন খরচ নয়, পণ্য পরিবহন ও খালাসে কত সময় লাগে সেটিও ব্যবসার প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতার গুরুত্বপূর্ণ নির্ধারক।
চট্টগ্রাম বন্দরে যদি একটি পণ্য খালাসে বেশি সময় লাগে, তাহলে তার সঙ্গে যুক্ত প্রতিটি পর্যায়ে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় হয়। আমদানিকারক থেকে শুরু করে উৎপাদক ও রপ্তানিকারক—সবাই এর প্রভাব বহন করে।
বাংলাদেশ ফ্রেইট ফরওয়ার্ডার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সহসভাপতি খায়রুল আলম সুজন মনে করেন, বন্দর ও শুল্কসংক্রান্ত জটিলতা দূর করা গেলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান আরও শক্তিশালী হবে।
তার মতে, মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল এবং মাতারবাড়ীর সবুজ জাহাজকেন্দ্র বাস্তবায়িত হলে বাণিজ্যের পরিমাণ বাড়ার পাশাপাশি পণ্য পরিবহন ও সরবরাহ ব্যবস্থার দক্ষতাও উন্নত হতে পারে।
চট্টগ্রামকে ঘিরে বড় অর্থনৈতিক প্রশ্ন
চট্টগ্রামকে কেন্দ্র করে নেওয়া সাম্প্রতিক উদ্যোগগুলোর দিকে তাকালে একটি বিষয় স্পষ্ট—সরকার শুধু বন্দর সম্প্রসারণ নয়, পুরো বাণিজ্যিক পরিবেশকে একসঙ্গে উন্নত করার চেষ্টা করছে।
চীনা শিল্পাঞ্চল বিদেশি বিনিয়োগ আনতে পারে। মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল উৎপাদন ও পুনঃরপ্তানির সুযোগ বাড়াতে পারে। মাতারবাড়ীর জাহাজকেন্দ্র দেশের সামুদ্রিক সেবাখাতকে নতুন মাত্রা দিতে পারে। আর বন্দর ও শুল্ক জটিলতা কমলে এসব উদ্যোগের কার্যকারিতা আরও বাড়বে।
তবে বড় প্রকল্পের ঘোষণা থেকে বাস্তব অর্থনৈতিক সুফল পাওয়ার মাঝখানে রয়েছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ—বাস্তবায়ন।
চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীরা তাই দ্রুত বাস্তবায়নের ওপর জোর দিচ্ছেন। কারণ শিল্পাঞ্চল, বন্দর কিংবা বাণিজ্য অঞ্চল একে অপরের সঙ্গে কার্যকরভাবে যুক্ত না হলে সম্ভাবনার বড় অংশই অপূর্ণ থেকে যেতে পারে।
চট্টগ্রামের ভৌগোলিক অবস্থান, সমুদ্রবন্দর এবং দেশের প্রধান শিল্পাঞ্চলগুলোর সঙ্গে যোগাযোগের কারণে অঞ্চলটি বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের কেন্দ্র হিসেবে আগে থেকেই গুরুত্বপূর্ণ। এখন নতুন উদ্যোগগুলোর মাধ্যমে সেই অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
প্রশ্ন হলো, এই সুযোগ কতটা দ্রুত কাজে লাগানো যাবে। বিনিয়োগকারীদের আস্থা, অবকাঠামোর গতি, প্রশাসনিক দক্ষতা এবং ব্যবসার খরচ কমানোর ক্ষেত্রে বাস্তব পরিবর্তন আনতে পারলেই চট্টগ্রাম শুধু বাংলাদেশের প্রধান বন্দরনগরী নয়, দক্ষিণ এশিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য ও উৎপাদনকেন্দ্র হিসেবেও আরও শক্ত অবস্থান তৈরি করতে পারে।

