দেশের বেসরকারি খাতে বিনিয়োগে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। বিদায়ী ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি মাত্র ৬.৪০ শতাংশে থেমে গেছে। নিকট অতীতে এ ধরনের ভাটা আগে দেখা যায়নি। বিনিয়োগের খরার প্রভাব পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর ক্ষেত্রেও পড়েছে।
গত এক বছরে উৎপাদন খাতের তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর মধ্যে মাত্র ১২টি কোম্পানি ব্যবসা সম্প্রসারণে মোট প্রায় ২ হাজার ১১৪ কোটি টাকা বিনিয়োগের ঘোষণা দিয়েছে। বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এক বছরে এত কমসংখ্যক কোম্পানির কাছ থেকে নতুন বিনিয়োগের ঘোষণা আগে কখনো আসেনি।
বর্তমানে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানির সংখ্যা ৩৬০। এর মধ্যে উৎপাদন খাতের কোম্পানি ২০০টি, যেখানে স্থানীয় ও বহুজাতিক বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানও রয়েছে। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের আগস্ট থেকে গতকাল পর্যন্ত উৎপাদন খাতের কোম্পানিগুলোর মোট ঘোষণা করা বিনিয়োগের পরিমাণ ২ হাজার ১১৩ কোটি ৮৭ লাখ টাকা।
উৎপাদন খাতের মধ্যে সবচেয়ে বড় বিনিয়োগের ঘোষণা এসেছে এমজেএল বাংলাদেশ পিএলসির কাছ থেকে, প্রায় ৫৫৩ কোটি টাকা (৪ কোটি ৫৩ লাখ ডলার)। গত বছরের ডিসেম্বরে কোম্পানির পর্ষদ ২০ বছরের পুরনো জাহাজ এমটি ওমেরা লিগ্যাসির পরিবর্তে ১২ বছরের ব্যবহৃত জাহাজ এমটি নিসস ডেলোস কেনার সিদ্ধান্ত নেয়। এর দুই মাস পর, চলতি বছরের মার্চে কোম্পানি জানায় ২ কোটি ২৭ লাখ ডলারে পুরনো ট্যাঙ্কার বিক্রির কথা। তবে নতুন জাহাজের হালনাগাদ তথ্য এখনও পাওয়া যায়নি।
এমজেএল বাংলাদেশের চেয়ারম্যান আজম জে চৌধুরী বলেন, ‘বিদেশগামী অয়েল ও গ্যাস ক্যারিয়ার আমাদের ব্যবসার বিনিয়োগ। পূর্বে সরকারের সহায়ক নীতিমালার কারণে আমরা বড় অংকের বিনিয়োগ করেছি। ২০৩০ সাল পর্যন্ত ভ্যাট ও কর মওকুফ সুবিধা ছিল। সম্প্রতি তা বাতিল হওয়ায় বৈদেশিক মুদ্রা আহরণের খাত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।’
স্কয়ার গ্রুপের দুই কোম্পানি – স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস পিএলসি ও স্কয়ার টেক্সটাইলস পিএলসি – ৫৩৫ কোটি টাকার বিনিয়োগের ঘোষণা দিয়েছে। এর মধ্যে স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস গত বছরের অক্টোবর ৫০০ কোটি টাকার মূলধনি যন্ত্রপাতি ও জমি বিনিয়োগের ঘোষণা দেয়। একই সময়ে স্কয়ার টেক্সটাইলসের বিনিয়োগের পরিমাণ ৩৫ কোটি টাকা। কোম্পানি দুইটির পর্ষদ ধারাবাহিকভাবে ব্যবসা সম্প্রসারণে বিনিয়োগ করছে।
স্কয়ারের হিসাব ও অর্থ বিভাগের প্রধান মো. কবীর রেজা বলেন, ‘ধারাবাহিক বিনিয়োগের ফলে ব্যবসায়িক সক্ষমতা বাড়ছে। এর সুফল সামনে দেখা যাবে।’ বহুজাতিক ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো বাংলাদেশ কোম্পানি (বিএটিবিসি) গত জুনে ২৯৭ কোটি টাকার বিনিয়োগের ঘোষণা দেয়। ঢাকার মহাখালী থেকে সাভারে কারখানা স্থানান্তরের জন্য এটি করা হয়েছে। এছাড়া ফেব্রুয়ারি ও ডিসেম্বরে উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াতে আরও মোট প্রায় ৫৩ কোটি টাকার বিনিয়োগের ঘোষণা দেয়।
সিমেন্ট খাতের বহুজাতিক লাফার্জহোলসিম বাংলাদেশ মে মাসে ব্যবসা সম্প্রসারণে ১৮০ কোটি টাকা বিনিয়োগের ঘোষণা দেয়। সুনামগঞ্জের ছাতকে নতুন মিল স্থাপনের জন্য এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তাওফিকা ফুডস অ্যান্ড লাভেলো আইসক্রিম সেপ্টেম্বরে ১৫০ কোটি টাকার বিনিয়োগ ঘোষণা করে। ময়মনসিংহের ভালুকায় নতুন ইউনিট স্থাপন এবং সিঙ্গাপুর, চীন ও ইতালির যন্ত্রপাতি ক্রয় করা হবে। নতুন ইউনিট চালু হলে দৈনিক আইসক্রিম উৎপাদন হবে আড়াই লাখ লিটার।
এনভয় টেক্সটাইল লিমিটেড সুতা উৎপাদন বাড়াতে দুই প্রকল্পে মোট ১২১ কোটি টাকার বিনিয়োগের ঘোষণা দিয়েছে। এর মধ্যে স্পিনিং ইউনিটের জন্য ৯৭.৩০ কোটি টাকা এবং পরিত্যক্ত কাপড় পুনঃপ্রক্রিয়াকরণ কারখানায় ২৩.৭০ কোটি টাকা। ওয়ালটন হাই-টেক ইন্ডাস্ট্রিজ এপ্রিলে লিথিয়াম আয়ন ব্যাটারি উৎপাদনের জন্য ১১৩.৬৬ কোটি টাকা বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেয়। বাণিজ্যিক উৎপাদন ২০২৬ সালের মাঝামাঝি শুরু হবে, বছরে আনুমানিক ১৪৪.৯৮ কোটি টাকার বিক্রি হবে।
অলিম্পিক ইন্ডাস্ট্রিজ গত এক বছরে ৪৯.৫৭ কোটি টাকা বিনিয়োগের ঘোষণা দেয়। এসিআই পিএলসির দুটি সাবসিডিয়ারি কোম্পানিতে মোট ৩১ কোটি টাকা বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেয়। বস্ত্র খাতের রহিম টেক্সটাইল ২৪.৭৬ কোটি টাকা বিনিয়োগের ঘোষণা দেয়। বহুজাতিক রঙ উৎপাদক বার্জার পেইন্টস বাংলাদেশ লিমিটেড নতুন সাবসিডিয়ারিতে ৫ কোটি ১০ লাখ টাকা বিনিয়োগ করেছে। কয়েক বছর ধরে দেশের বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি মন্থর। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে লক্ষ্য ছিল ৯.৮ শতাংশ, কিন্তু বৃদ্ধি মাত্র ৬.৪০ শতাংশে থেমে গেছে। আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত লক্ষ্য নামানো হয়েছে ৭.২ শতাংশে। ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত নির্ধারিত লক্ষ্য ৮ শতাংশ।
নতুন শিল্প-কারখানা না গড়ে ওঠায় মূলধনি যন্ত্রপাতির আমদানিও কমেছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে শিল্পের মূলধনি যন্ত্রপাতি এলসি খোলা ২৫.৪১ শতাংশ, মধ্যবর্তী পণ্য ৬.২৬ শতাংশ, কাঁচামাল ০.১৫ শতাংশ কমেছে। খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিনিয়োগ খরা, অর্থনৈতিক স্থবিরতা ও ভোগ ব্যয় কমে যাওয়াই এর পেছনের কারণ।
বিএপিএলসির প্রেসিডেন্ট ও বার্জার পেইন্টস বাংলাদেশের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রূপালী হক চৌধুরী বলেন, ‘গত দুই-তিন বছরে আমরা ৮১২ কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছি। একটি প্লাস্টিক কারখানা করার পরিকল্পনা রয়েছে। বর্তমান সময় প্রতিকূল। সুদের হার ঊর্ধ্বমুখী, বিক্রি কমে গেছে। তাই নতুন বিনিয়োগ করা কঠিন। তবে নির্বাচনের পর অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াবে বলে প্রত্যাশা আছে। বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার স্থিতিশীল এবং ডলারের সংকট নেই। সবাই বিনিয়োগের সঠিক সময়ের জন্য অপেক্ষা করছে।’

