বেক্সিমকো গ্রুপের মতো এবার নাসা গ্রুপকেও বাঁচাতে এগিয়ে আসছে সরকার। দেশের অন্যতম বৃহৎ তৈরি পোশাক প্রস্তুতকারক এই গ্রুপের কারখানা চালু রাখা এবং হাজারো শ্রমিকের বেতন নিশ্চিত করার জন্য পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
নাসা গ্রুপের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ঋণ খেলাপি থাকলেও তাদের ব্যাক-টু-ব্যাক এলসি খোলার সুযোগসহ কিছু নীতিমালা সহায়তা দেওয়া হবে। উদ্দেশ্য কারখানাগুলো অন্তত সচল রাখা। শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের অনুরোধে বাংলাদেশ ব্যাংক এই ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে।
শ্রম মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, নাসা গ্রুপ ১০০ শতাংশ মার্জিনে যেসব ব্যাক-টু-ব্যাক এলসি খুলবে, সেগুলোর আয় থেকে পাওনাদার ব্যাংক কোনো কিস্তি নিতে পারবে না। আগে বেতন, কর্মচারী খরচ এবং অন্যান্য নিয়মিত ব্যয় পরিশোধ করা হবে। বাকি থাকলে ঋণ পরিশোধ করা হবে। বাংলাদেশ ব্যাংককে ঋণদাতা ব্যাংকগুলোর সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে এমন ব্যবস্থা করতে বলা হয়েছে।
গত রোববার বাংলাদেশ ব্যাংক নাসা গ্রুপে অর্থায়নকারী ৭ ব্যাংক ও গ্রুপের প্রতিনিধিদের নিয়ে সভা করেছে। নির্বাহী পরিচালক মো. আশরাফুল আলমের সভাপতিত্বে বৈঠকের পর আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিবকে চিঠি পাঠিয়ে ব্যবসায়িক বাধা দূর করার উদ্যোগ নিতে বলা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোকে পরামর্শ দিয়েছে, তারা ব্যাক-টু-ব্যাক এলসি সুবিধার জন্য নীতিগত সহায়তা চেয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে আবেদন করবে। প্রক্রিয়া দ্রুত করতে নাসা গ্রুপকে ঋণদাতা ব্যাংকে দ্রুত আবেদন করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এই গ্রুপের শতভাগ রপ্তানিমুখী কারখানাগুলো ২০২৩ সালে ৪,৫৮০ কোটি এবং ২০২৪ সালে ৩,২০০ কোটি টাকার পণ্য রপ্তানি করেছে।

নাসা গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান খন্দকার মোহাম্মদ সাইফুল আলম বলেন, “রোববারের সভায় বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। আশা করছি সকল পক্ষ শ্রমিক, রপ্তানি আয় ও কারখানার টেকসইতার দিক থেকে ইতিবাচক মনোভাব দেখাবে।” তিনি বলেন, “জুন পর্যন্ত বেতন পরিশোধ করা হয়েছে। ব্যাক-টু-ব্যাক এলসি না থাকায় আমরা শেষ পর্যায়ে। পাশে না দাঁড়ালে শ্রমিক রাস্তায় নামবে। তবে সরকার ও ব্যাংক থাকলে অর্ডার পাওয়া সম্ভব হবে।”
শ্রম মন্ত্রণালয়ের সচিব এ এইচ এম সফিকুজ্জামান বলেন, “নাসা গ্রুপের কারখানাগুলো চালু রাখতে নীতিগত সহায়তা নেওয়া হয়েছে। বর্তমানে ২৫-২৭ হাজার কর্মী এই গ্রুপে কাজ করছেন। বন্ধ হলে বেকারত্ব ও শ্রমিক অসন্তোষ সৃষ্টি হবে।” বাংলাদেশ ব্যাংকের সহকারী মুখপাত্র মোহাম্মদ শাহরিয়ার সিদ্দিকী জানান, রপ্তানিমুখী কারখানার জন্য এলসি সুবিধার আবেদন ঋণদাতা ব্যাংকের মাধ্যমে বাংলাদেশ ব্যাংকে করা যাবে। এর আগে বেক্সিমকো গ্রুপের শ্রমিকদের পাওনা মেটাতে সরকার ৫২৫.৪৬ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছিল।
নাসা গ্রুপের সংকট:
১৯৯০ সালে যাত্রা শুরু করা নাসা গ্রুপের ৩৪টি কারখানা রয়েছে। গ্রুপের অধীনে তৈরি পোশাক, বস্ত্র, স্পিনিং, লজিস্টিক, প্রোডাক্ট ডেভেলপমেন্ট ও কোয়ালিটি কন্ট্রোল ইউনিট রয়েছে। এছাড়া আবাসন ও ব্যাংকিং খাতেও ব্যবসা আছে। চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম মজুমদার।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পরিবর্তনের পর বিভিন্ন সরকারি ব্যবস্থা নেওয়া হয়। এক্সিম ব্যাংকের চেয়ারম্যান ও বিএবির চেয়ারম্যান পদ থেকে তাকে সরানো হয়। পরিবারের সদস্যদের ব্যাংক হিসাব জব্দ করা হয়। তিনি গা ঢাকা দেন এবং পরবর্তীতে ২০২৪ সালের ১ অক্টোবর গ্রেপ্তার হন।
নাসা গ্রুপের এক কর্মকর্তা জানান, নজরুল ইসলাম মজুমদারের গ্রেপ্তারের পর কার্যক্রমে ভাটা পড়েছে। কারখানাগুলো ঋণ পরিশোধ করতে না পারায় খেলাপি হয়েছে। ব্যাংকগুলো ব্যাক-টু-ব্যাক এলসি বন্ধ করে দিয়েছে। জুন পর্যন্ত বেতন পরিশোধ সম্ভব হলেও জুলাই মাসের বেতন দেওয়া যায়নি। ১৪ আগস্ট শ্রমিকরা বেতনের দাবিতে বিক্ষোভ করেছে। কিছু সম্পদ বিক্রির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তবে নথিতে চেয়ারম্যানের স্বাক্ষর প্রয়োজন। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আবেদন করা হয়েছে। যদিও নাসা গ্রুপের ‘অথরাইজড সিগনেটরি’-এর স্বাক্ষরে কার্যক্রম চলছে।
শ্রম মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগ:
নাসা গ্রুপের ২৫-২৭ হাজার শ্রমিকের জন্য প্রতি মাসে ৪০-৪২ কোটি টাকা বেতন প্রয়োজন। শ্রমিকদের আন্দোলন ও কারখানা বন্ধ এড়াতে শ্রম মন্ত্রণালয় উদ্যোগ নিয়েছে। ১৭ জুলাই শ্রম উপদেষ্টা বিগ্রেডিয়াল জেনারেল (অব.) সাখাওয়াত হোসেনের সভাপতিত্বে উচ্চ পর্যায়ের সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় শ্রম সচিব, অর্থ সচিব, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব, বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর উপস্থিত ছিলেন। অনলাইনে যুক্ত ছিলেন বিজিএমইএ সভাপতি, ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক, পুলিশ প্রতিনিধি ও নাসা গ্রুপের প্রতিনিধি। উপদেষ্টা বলেন, “দেশের কোনো শিল্প প্রতিষ্ঠান বন্ধ করা যাবে না। সর্বোচ্চ সহযোগিতায় কারখানা চালু রাখতে হবে।”
বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, “নাসা গ্রুপের তৈরি পোশাক দেশের ও বিদেশের বাজারে গ্রহণযোগ্য। ব্যবস্থাপনা সক্রিয় থাকলে আমরা সব সমস্যা সমাধানে সহযোগিতা করব।”
নাসা গ্রুপ ও স্বার্থ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের নামে ২২টি ব্যাংক ও একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ১০,৩০০ কোটি টাকার ঋণ নেওয়া হয়েছে। সিংহভাগই এখন খেলাপি। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ইসলামী ব্যাংক থেকে ৩,০০০ কোটি, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক থেকে ১,২০০ কোটি, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক থেকে ২৬৫ কোটি, ন্যাশনাল ব্যাংক থেকে ১,৯৬১ কোটি, আইএফআইসি ব্যাংক থেকে ১,১৫২ কোটি, আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক থেকে ৫৯০ কোটি এবং শাহজালাল ইসলামী ব্যাংক থেকে ৪৫৮ কোটি টাকা নেওয়া হয়েছে।
শাহজালাল ইসলামী ব্যাংকের এমডি মোসলেহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, “নাসা গ্রুপের লোন এক্সপোজার আছে, হিসাব নিয়মিত। অন্য প্রতিষ্ঠান খেলাপি হওয়ায় সিআইবিতে রিপোর্ট গেছে, সমস্যা হচ্ছে। আমরা বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে বিষয়টি পর্যালোচনা করতে বলেছি। ২০২৪ সালে ৯০০ কোটির বেশি রপ্তানি আমাদের ব্যাংকের মাধ্যমে হয়েছে।”
নজরুল ইসলাম মজুমদারের বিরুদ্ধে সিআইডি অর্থ পাচারের মামলা করেছে। অভিযোগে বলা হয়েছে, আন্ডার ও ওভার ইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে শত শত কোটি টাকা সংযুক্ত আরব আমিরাত, যুক্তরাজ্য, কানাডা, সিঙ্গাপুর ও থাইল্যান্ডে পাচার করা হয়েছে। ২০২০ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে নাসা গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান ফিরোজা গার্মেন্টস লিমিটেডের মাধ্যমে ৩০ লাখ ডলার যুক্তরাষ্ট্রে পাঠানো হয়েছে। তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি, অর্থ আত্মসাৎ, অবৈধ সম্পদ অর্জন ও মোট ৭৮১.৩১ কোটি টাকার মানি লন্ডারিংয়ের অভিযোগ রয়েছে।
জুলাই ২২ তারিখ আদালতে তিনি জামিন চেয়ে সব অর্থ ফেরত দেওয়ার অঙ্গীকার করেন। বলেন, “আমি জামিন পেলে সব টাকা পরিশোধ করব। পালাবো না। কোম্পানির সঙ্গে প্রায় ৩ লাখ মানুষ জড়িত। তাদের বেতন দেওয়া জরুরি।” বিচারক বলেন, “জেলহাজতে থেকে টাকা পরিশোধ করুন। ধৈর্য ধরুন, জামিন পাবেন।”

