বাংলাদেশের ফার্মাসিউটিক্যাল খাত একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে রয়েছে। ১৯৮০-এর দশকে আমদানিনির্ভরতা থেকে শুরু করে আজ দেশের চাহিদার প্রায় ৯৮ শতাংশ পূরণ এবং ১৫০টিরও বেশি দেশে ওষুধ রফতানি—এ খাতের এই অগ্রগতি সত্যিই প্রশংসনীয়।
বর্তমানে খাতটি ১ লাখ ৫০ হাজারের বেশি কর্মসংস্থান দিয়েছে। দেশীয় বাজারের আকার প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা। ২০২৪ সালে ওষুধ রফতানি আয় ৭০০ মিলিয়ন ডলারের বেশি। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার ট্রিপস ছাড় এই সাফল্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। এর ফলে বাংলাদেশ কম খরচে পেটেন্টকৃত ওষুধের জেনেরিক সংস্করণ উৎপাদন করতে পেরেছে।
তবে এবার খাতটি এক নতুন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। ২০২৬ সালে বাংলাদেশ এলডিসি থেকে উত্তরণ করলে ট্রিপস ছাড়সহ অন্যান্য আন্তর্জাতিক সুবিধা বাতিল হবে। এর ফলে নতুন এবং পেটেন্ট সুরক্ষাধীন ওষুধ উৎপাদনে বাধা আসতে পারে। দেশে অনেক প্রয়োজনীয় ওষুধ সুলভ মূল্যে পাওয়া কঠিন হতে পারে। রফতানি সুযোগও সীমিত হতে পারে। সরকারি জনস্বাস্থ্য কর্মসূচি, যেগুলো মূলত সস্তা জেনেরিক ওষুধের ওপর নির্ভরশীল, তা ব্যাহত হওয়ার সম্ভাবনা আছে।
এলডিসি-পরবর্তী সময়ে খাতকে আন্তর্জাতিক মান মেনে চলতে হবে। একই সঙ্গে বিশ্ববাজারে জেনেরিক ও বায়োলজিক ওষুধে প্রতিযোগিতা আরও তীব্র হবে। প্রযুক্তিগত দুর্বলতা—বিশেষত বায়োটেকনোলজি, অ্যাকটিভ ফার্মাসিউটিক্যাল ইনগ্রেডিয়েন্ট উৎপাদন এবং ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল অবকাঠামোর ঘাটতি—বাংলাদেশের অবস্থানকে দুর্বল করে তুলছে।
প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে বাংলাদেশের ওষুধ শিল্পকে কেবল জেনেরিক উৎপাদনের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে উদ্ভাবন, গুণমান নিশ্চয়তা এবং বৈশ্বিক সংহতকরণে মনোযোগ দিতে হবে। এ জন্য শিল্প ও একাডেমিয়ার ঘনিষ্ঠ, কৌশলগত সহযোগিতা অপরিহার্য। এটি এখন কোনো বিকল্প নয়, বরং সময়ের চাহিদা।
বাংলাদেশে একাডেমিক গবেষণা অনেক সময় শিল্পের বাস্তব চাহিদার সঙ্গে সংযুক্ত হয়নি। দীর্ঘস্থায়ী অর্থায়ন ঘাটতি, পুরনো পরিকাঠামো, যুগোপযোগিতাহীন পাঠক্রম এবং বেসরকারি খাতের সীমিত অংশগ্রহণের কারণে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো উদ্ভাবনের কেন্দ্র হতে পারেনি। বরাদ্দকৃত বাজেটও অপ্রতুল। ফলে শিল্প ও একাডেমিয়ার দূরত্ব বহুমাত্রিক।
একাডেমিয়ার প্রধান প্রতিবন্ধকতা হলো গবেষণার তাত্ত্বিক প্রবণতা। এটি শিল্পের প্রয়োগমুখী চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। টেকনোলজি ট্রান্সফার অফিস বা ইন্ডাস্ট্রি লিয়াজোঁ ইউনিটের মতো কাঠামোগত সুবিধা নেই। অর্থায়নের ঘাটতি, আমলাতান্ত্রিক বিলম্ব এবং দক্ষ মানবসম্পদের অভাব—বিশেষ করে বায়োটেকনোলজি, রেগুলেটরি সায়েন্স ও ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে—সমস্যা আরও জটিল করে।
শিল্পের দিক থেকেও সীমাবদ্ধতা আছে। উদ্ভাবন ও গবেষণায় সীমিত মনোযোগ, একাডেমিক অংশীদারত্বে বিনিয়োগে অনীহা এবং কাঠামোগত সহযোগিতার অভাব অনেক কোম্পানিকে স্বল্পমেয়াদি লাভের দিকে উত্সাহিত করছে। ফলে দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা, পাঠক্রম উন্নয়ন এবং যৌথ প্রকল্পে শিল্পের অংশগ্রহণ সীমিত। পারস্পরিক অবিশ্বাস, মেধাস্বত্বের উদ্বেগ এবং বৈজ্ঞানিক দক্ষতার অভাব সহযোগিতাকে দুর্বল করছে। এক সমন্বিত জাতীয় কৌশলও এখনও নেই।
ফার্মাসিউটিক্যাল উদ্ভাবনে একাডেমিয়া-শিল্প সংযোগ জরুরি:
ফার্মাসিউটিক্যাল খাতে উদ্ভাবন দ্রুত করতে যৌথ গবেষণায় দীর্ঘমেয়াদি এবং পরিকল্পিত বিনিয়োগ প্রয়োজন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি অনুষদের চারটি বিভাগ—বায়োকেমিস্ট্রি অ্যান্ড মলিকুলার বায়োলজি, জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড বায়োটেকনোলজি, মাইক্রোবায়োলজি, ইনস্টিটিউট অব হেলথ ইকোনমিকস—এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট বিভাগ শিল্পের নেতৃস্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে অংশীদারত্বে নতুন বায়োসিমিলার ও উদ্ভাবনী ওষুধ তৈরি করতে পারে।
একাডেমিক প্রাঙ্গণে শিল্প সমর্থিত ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল চালালে বিদেশী ল্যাবনির্ভরতা কমবে, ব্যয় হ্রাস পাবে এবং বাজারে প্রবেশের সময় দ্রুত হবে। গবেষণায় পারদর্শী শিক্ষকদের পারফরম্যান্সভিত্তিক অনুদান শিল্প-প্রাসঙ্গিক গবেষণায় উৎসাহ জোগাতে সহায়ক হবে। শিল্প খাত যখন অটোমেশন, ডাটা অ্যানালাইটিকস ও বায়োটেকনোলজি গ্রহণ করছে, তখন দক্ষ জনশক্তির চাহিদাও বাড়ছে। বাংলাদেশ ফার্মাসিউটিক্যাল সোসাইটির জরিপে দেখা গেছে, ৬৫ শতাংশ শিল্পনেতা মনে করেন স্নাতকদের দক্ষতা শিল্পের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তাই বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠক্রম শিল্পের পরামর্শ অনুযায়ী নতুনভাবে সাজানো জরুরি। এর মধ্যে থাকতে হবে রেগুলেটরি সায়েন্স, বায়োইকুইভ্যালেন্স, জিএমপি মান, ডাটা অ্যানালাইটিকস এবং আধুনিক উৎপাদন পদ্ধতি। ইন্টার্নশিপ ও কো-অপ প্রোগ্রামের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের বাস্তব অভিজ্ঞতা দেওয়া এবং শিক্ষক বিনিময় কার্যক্রম চালু করা সময়োপযোগী হবে।
উদ্ভাবন ঘনীভবনের জন্য সেন্টার অব এক্সেলেন্স প্রতিষ্ঠা সম্ভাবনাময় উদ্যোগ। ভারতের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ফার্মাসিউটিক্যাল এডুকেশন অ্যান্ড রিসার্চের আদলে বাংলাদেশেও বায়োটেকনোলজি, এপিআই ডেভেলপমেন্ট, ক্লিনিক্যাল রিসার্চ এবং রেগুলেটরি কমপ্লায়েন্সভিত্তিক কেন্দ্র গড়ে তোলা যেতে পারে। এগুলো এপিআই আমদানিনির্ভরতা কমাবে এবং আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল ও রফতানিযোগ্য পণ্য তৈরির সক্ষমতা বাড়াবে। সরকার, বিশ্ববিদ্যালয় এবং বেসরকারি খাতের যৌথ পার্টনারশিপে এসব কেন্দ্র টেকসইভাবে পরিচালনা করা সম্ভব।
বাংলাদেশে ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল ও নীতিনির্ধারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকা:
বাংলাদেশে ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল, বায়োইকুইভ্যালেন্স ও বায়োসিমিলার গবেষণার অবকাঠামো এখনও অপর্যাপ্ত। বর্তমানে যে ক’টি ক্লিনিক্যাল রিসার্চ অর্গানাইজেশন (সিআরও) আছে, সেগুলো দক্ষ গবেষক, বায়োস্ট্যাটিস্টিশিয়ান এবং স্বেচ্ছাসেবকের অভাবে কার্যকরভাবে কাজ করতে পারছে না। ফলে কোম্পানিগুলোকে বিদেশী ল্যাবে ট্রায়াল করতে হয়, যা খরচ বাড়ায় এবং বাজারে পণ্যের সময় বিলম্বিত করে।
অ্যাক্রেডিটেড ফ্যাসিলিটি ও বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক এথিকস রিভিউ বোর্ডে বিনিয়োগ করলে এই নির্ভরতা ধীরে ধীরে কমানো সম্ভব। ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল ডিজাইন, রেগুলেটরি কাঠামো এবং ডাটা ম্যানেজমেন্টে শিল্প সমর্থিত প্রশিক্ষণ গবেষকদের পেশাগতভাবে শক্তিশালী করতে পারে।
উদ্ভাবন ও দক্ষতা বৃদ্ধির পাশাপাশি একাডেমিয়াকে নীতিনির্ধারণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে হবে। এলডিসি-উত্তর চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় ইনস্টিটিউট অব হেলথ ইকোনমিকসের মতো প্রতিষ্ঠান মেধাস্বত্ব সংস্কারের অর্থনৈতিক প্রভাব বিশ্লেষণ, প্রয়োজনীয় ওষুধের টেকসই মূল্য নির্ধারণ এবং বাণিজ্য কৌশল পরামর্শ দিতে পারে। ‘পলিসি ল্যাব’ গঠন করে বিশ্ববিদ্যালয়, নীতিনির্ধারক ও শিল্পনেতাদের মধ্যে প্রমাণভিত্তিক সংলাপ এবং কৌশল বিকাশের প্লাটফর্ম তৈরি করা যেতে পারে। বৈশ্বিক মঞ্চে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বাংলাদেশের স্বার্থে ন্যায়সংগত মেধাস্বত্ব কাঠামো ও রূপান্তর সহায়তার কণ্ঠস্বর হতে পারে।
তবে এসব অর্জনের পথ রুদ্ধ থাকবে, যদি কাঠামোগত ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিবন্ধকতা দূর না করা যায়। পারস্পরিক অবিশ্বাস, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং বিক্ষিপ্ত প্রণোদনা ব্যবস্থা বদলে দিয়ে এমন একটি জাতীয় কাঠামো গড়ে তুলতে হবে, যা শিল্প-একাডেমিয়া সহযোগিতাকে সক্রিয়ভাবে উৎসাহিত করবে। এতে করছাড়, আর অ্যান্ড ডি অনুদান এবং যৌথ প্রকল্পে কো-ফাইন্যান্সিং অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোকে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমঝোতা চুক্তি, প্রযুক্তি বাণিজ্যিকীকরণ এবং চুক্তিভিত্তিক গবেষণায় স্বাধীনতা দেওয়া জরুরি। বিশ্ববিদ্যালয়ের পারফরম্যান্স মূল্যায়নের পদ্ধতিতেও পরিবর্তন আনা দরকার, যেখানে পেটেন্ট, বাজারমুখী উদ্ভাবন এবং শিল্পে প্রভাব বিবেচনায় নেওয়া হবে, শুধুমাত্র জার্নাল প্রকাশনায় সীমাবদ্ধ না থেকে। বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্পের মধ্যে স্বচ্ছ মেধাস্বত্ব মালিকানা এবং লাভ বণ্টন কাঠামো গড়ে তোলাও প্রয়োজন, যাতে সহযোগিতার ভিত্তিতে আস্থা প্রতিষ্ঠা হয়।
যদি নীতিনির্ধারক, শিল্পপতি ও একাডেমিক মহল একত্রে দূরদৃষ্টিসম্পন্ন পদক্ষেপ নেন—সমন্বিত নীতিমালা, কৌশলগত বিনিয়োগ এবং যৌথ উদ্যোগের মাধ্যমে—বাংলাদেশ তার ওষুধ শিল্পের বর্তমান অর্জন ধরে রাখতে পারবে। পাশাপাশি বৈশ্বিক পরিসরে সাশ্রয়ী ও উদ্ভাবনী স্বাস্থ্যসেবা প্রদানের অন্যতম নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারবে। সম্ভাবনার ভিত্তি ইতিমধ্যে তৈরি হয়েছে; এখন দরকার সম্মিলিত ইচ্ছাশক্তি, যা এ ভিত্তিকে সুদৃঢ় ভবিষ্যতে রূপ দিতে পারে।
বাংলাদেশের ফার্মাসিউটিক্যাল খাত ইতিমধ্যেই অসাধারণ অগ্রগতি দেখিয়েছে। তবে এলডিসি-পরবর্তী যুগ, প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা এই খাতকে নতুন উচ্চতায় পৌঁছাতে সহযোগিতা ও উদ্ভাবনের ওপর নির্ভরশীল করেছে। শিল্প ও একাডেমিয়ার ঘনিষ্ঠ সমন্বয়, কাঠামোগত সংস্কার, দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ এবং নীতিনির্ধারকদের সমর্থন ছাড়া খাতের টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। সম্ভাবনার ভিত্তি ইতিমধ্যেই তৈরি হয়েছে; এখন দরকার সম্মিলিত উদ্যোগ ও দূরদৃষ্টিসম্পন্ন পদক্ষেপ, যা বাংলাদেশকে সাশ্রয়ী ও উদ্ভাবনী স্বাস্থ্যসেবার বৈশ্বিক নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করবে।

