বাংলাদেশ সরকার ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে ৩,০০০ মেগাওয়াট রুফটপ সোলার ইনস্টল করার নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। এটি আসে চলমান বিদ্যুৎ সংকটের মধ্যে, জানিয়েছে ইন্সটিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিস একটি ব্রিফিং নোটে।
তবে সংস্থাটি লক্ষ্যটিকে অতিমাত্রায় উচ্চাকাঙ্ক্ষী বলে মনে করছে। নোটে বলা হয়েছে, জুন ২০০৮ থেকে জুন ২০২৫ পর্যন্ত বাংলাদেশ মাত্র ২৪৫ মেগাওয়াট রুফটপ সোলার ইনস্টল করেছে। তাই ডিসেম্বর ২০২৫-এর মধ্যে ৩,০০০ মেগাওয়াট পৌঁছাতে দেশের প্রচেষ্টা এখনকার চেয়ে বারো গুণ বেশি বাড়াতে হবে।
IEEFA’র বাংলাদেশের প্রধান এনার্জি বিশ্লেষক শফিকুল আলম বলেন, সরকারি দপ্তর, হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানসমূহ যথেষ্ট অনুমোদিত লোড দিতে পারবে না যা ৩,০০০ মেগাওয়াট রুফটপ সোলার ইনস্টল করার জন্য প্রয়োজন। তিনি সুপারিশ করেছেন যে, টেকসই ও নবায়নযোগ্য শক্তি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ এই ভবনের রুফটপ সোলারের সম্ভাব্যতা যাচাই ও নথিভুক্ত করুন।
ব্রিফিং নোটে বলা হয়েছে, বিভিন্ন প্রকল্পের জন্য তহবিল বরাদ্দ, টেন্ডার প্রক্রিয়া, দরপত্র মূল্যায়ন, কাজের আদেশ জারি ও প্রকল্প বাস্তবায়ন সময়সাপেক্ষ হতে পারে। তাই ডিসেম্বর ২০২৫-এর সময়সীমা বাড়ানোর প্রয়োজন হতে পারে। নোটে আরও উল্লেখ আছে, দেশজুড়ে মাত্র ১৫-২০টি উচ্চমানের প্রকৌশল, ক্রয় ও নির্মাণ (EPC) কোম্পানি আছে। তারা ছয় মাসের কম সময়ে ৩,০০০ মেগাওয়াট ইনস্টল করার সক্ষমতা নাও রাখতে পারে। নতুন সোলার কর্মসূচিতে সরকারি দপ্তর CAPEX মডেলের মাধ্যমে পাবলিক তহবিল ব্যবহার করে ইনস্টলেশন করবে। হাসপাতাল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান OPEX মডেলের অধীনে কাজ করবে, যেখানে প্রাথমিক কোনো খরচ থাকবে না।

শফিকুল আলম বলেন, “CAPEX মডেল দ্রুত ইনস্টলেশন ও বেশি সাশ্রয় দেয়, কিন্তু সমন্বয়হীনতা, রক্ষণাবেক্ষণের অভাব ও তাড়াহুড়োর কারণে ঝুঁকি থাকে। OPEX মডেল মানসম্মত নিশ্চিত করে, কিন্তু সাশ্রয় কম এবং আর্থিক বাধা ও গ্রামাঞ্চলে লোডশেডিং ঝুঁকি থাকে।” নোটে উল্লেখ করা হয়েছে, গ্রামাঞ্চলে ছোট ও ছড়িয়ে ছিটিয়ে প্রকল্পগুলো OPEX মডেলের আওতায় কোম্পানির বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে ব্যর্থ হতে পারে। এছাড়া ধুলাবালি (soiling) সোলার শক্তি উৎপাদন কমাতে পারে। সরকারকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে CAPEX প্রকল্প থেকে মাসিক সাশ্রয় থেকে তহবিল তৈরি করতে এবং দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণ চুক্তি করতে। গ্রামাঞ্চলে লোডশেডিংও সমাধান করতে হবে। না হলে OPEX মডেলে সোলার উৎপাদন ক্ষতির ঝুঁকি থাকবে।
IEEFA নোটে প্রতিবেশী দেশ যেমন ভারত, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কার উদাহরণ দেয়া হয়েছে। এ দেশগুলো বিদ্যুৎ মিশ্রণে নবায়নযোগ্য শক্তির ভাগ ৪৭%-৬৩%। পাকিস্তানে রুফটপ সোলারের সাফল্য দেখিয়েছে, কিভাবে শক্তি ঘাটতি ও উচ্চ ট্যারিফ গ্রহণ বাড়াতে সাহায্য করে। শ্রীলঙ্কা সরকার বহুপাক্ষিক সহায়তায় অর্থায়ন বাধা কাটিয়ে রুফটপ সোলারের জন্য তহবিল দিয়েছে। ভারত মে ২০২৫ পর্যন্ত ১৮ গিগাওয়াটের বেশি রুফটপ সোলার সক্ষমতা অর্জন করেছে ধারাবাহিক নীতি ও বিধিনিষেধ সমর্থনের কারণে। শফিকুল আলম বলেন, “বাংলাদেশের রুফটপ সোলার খাত এখনও নবজাত। মূল অংশীদার ও সরকারি সংস্থার সক্ষমতা বৃদ্ধি অপরিহার্য। প্রকল্পের সুষ্ঠু কার্যক্রম নিশ্চিত করতে স্বাধীন নজরদারি প্রক্রিয়া থাকা জরুরি।”
অতীত কার্যক্রম ও উচ্চাকাঙ্ক্ষী লক্ষ্য:
বাংলাদেশে রুফটপ সোলার খাত এখনও নবজাত। জুন ২০০৮ থেকে জুন ২০২৫ পর্যন্ত দেশে মাত্র ২৪৫ মেগাওয়াট রুফটপ সোলার ইনস্টল হয়েছে। অন্য কথায়, দীর্ঘ ১৭ বছরে মোট অর্জন খুবই সীমিত। এবার সরকারের লক্ষ্য ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে ৩,০০০ মেগাওয়াট রুফটপ সোলার। এটি বর্তমানে ইনস্টল হওয়া ক্ষমতার তুলনায় বারো গুণ বেশি।
মূল চ্যালেঞ্জ:
- বর্তমান অবকাঠামো ও প্রস্তুতি এত দ্রুত সম্প্রসারণের জন্য পর্যাপ্ত নয়।
- সংশ্লিষ্ট সংস্থা ও কোম্পানিগুলোর সক্ষমতা সীমিত।
- সময়সীমা খুব কম, যা প্রকল্প বাস্তবায়নে চাপ বাড়াবে।
ভবনের সীমাবদ্ধতা ও সম্ভাব্যতা: IEEFA’র মতে, সরকারি দপ্তর, হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান পর্যাপ্ত অনুমোদিত লোড দিতে পারবে না। রুফটপে সোলার প্যানেল স্থাপনের জন্য নির্দিষ্ট বিদ্যুৎ লোড জরুরি।
- সরকারি ভবন ও প্রতিষ্ঠানগুলোর ছাদের প্রকৃত শক্তি ধারণ ক্ষমতা সীমিত।
- ভবনের অবকাঠামো অনেক ক্ষেত্রে সোলার ইনস্টলেশনের জন্য মানানসই নয়।
- ভবনের মালিকানা, অনুমোদন ও ব্যবহারকারীর অনুমতি নিয়ে জটিলতা হতে পারে।
প্রকল্প বাস্তবায়ন ও সময়সীমা: রুফটপ সোলার প্রকল্প বাস্তবায়নের ধাপগুলো অনেক সময়সাপেক্ষ। এতে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে:
- তহবিল বরাদ্দ
- টেন্ডার প্রক্রিয়া
- দরপত্র মূল্যায়ন
- কাজের আদেশ জারি
- প্রকল্প বাস্তবায়ন
প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ ও রক্ষণাবেক্ষণ ঝুঁকি: IEEFA’র নোটে বলা হয়েছে, CAPEX এবং OPEX মডেলের প্রকল্পগুলোতে বিভিন্ন প্রযুক্তিগত ও রক্ষণাবেক্ষণ সংক্রান্ত ঝুঁকি আছে।
ধুলাবালি: সোলার প্যানেলের উপর ধুলা, পাতা বা অন্যান্য আবরণ জমে গেলে শক্তি উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে কমতে পারে।
CAPEX মডেল ঝুঁকি:
- দ্রুত ইনস্টলেশন হলেও সমন্বয়হীনতা হতে পারে।
- রক্ষণাবেক্ষণ পর্যাপ্ত না হলে স্থায়িত্ব হ্রাস পাবে।
- তাড়াহুড়োতে ডেভেলপার নির্বাচন করলে মানের সমস্যা হতে পারে।
OPEX মডেল ঝুঁকি:
- প্রকল্পের মান নিশ্চয়তা থাকে, কিন্তু সাশ্রয় কম।
- গ্রামাঞ্চলে লোডশেডিং ও আর্থিক বাধা প্রকল্পে প্রভাব ফেলতে পারে।
- ছোট ও ছড়িয়ে ছিটিয়ে প্রকল্প কোম্পানির বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে ব্যর্থ হতে পারে।

আন্তর্জাতিক শিক্ষণীয় উদাহরণ: IEEFA নোটে প্রতিবেশী দেশগুলোর অভিজ্ঞতা তুলে ধরা হয়েছে, যা বাংলাদেশের জন্য দিকনির্দেশ হতে পারে।
- পাকিস্তান: শক্তি ঘাটতি ও উচ্চ ট্যারিফ সোলার গ্রহণ বাড়াতে প্রভাবশালী, সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগ মিলিয়ে রুফটপ সোলার দ্রুত সম্প্রসারণ হয়েছে।
- শ্রীলঙ্কা: অর্থায়ন বাধা কাটিয়ে সরকারি সহায়তা ও বহুপাক্ষিক তহবিল ব্যবহার করে রুফটপ সোলার প্রকল্প বাস্তবায়ন। সরকারি ভবনে সোলার ইনস্টলেশনের জন্য পরবর্তী সময়ে তহবিল বরাদ্দ।
- ভারত: মে ২০২৫ পর্যন্ত রুফটপ সোলার ক্ষমতা ১৮ গিগাওয়াট। ধারাবাহিক নীতি, বিধিনিষেধ ও সরকারি সমর্থনের কারণে দ্রুত সম্প্রসারণ সম্ভব হয়েছে।
প্রযুক্তিগত ও রক্ষণাবেক্ষণ চ্যালেঞ্জ:
- ধুলাবালি (soiling) সোলার উৎপাদন কমাতে পারে।
- CAPEX প্রকল্পে মাসিক সাশ্রয় থেকে তহবিল তৈরি ও দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণ চুক্তি প্রয়োজন।
- গ্রামাঞ্চলে লোডশেডিং সমাধান করা না হলে OPEX মডেলে ঝুঁকি বাড়বে।
বাংলাদেশের ৩,০০০ মেগাওয়াট রুফটপ সোলার লক্ষ্য উচ্চাকাঙ্ক্ষী, কারণ অতীত কার্যক্রম সীমিত এবং সময়সীমা কম। সরকারি ভবন, হাসপাতাল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পর্যাপ্ত ক্ষমতা দিতে পারবে না। প্রকল্প বাস্তবায়ন ও রক্ষণাবেক্ষণে CAPEX ও OPEX মডেলের ঝুঁকি রয়েছে। ধুলাবালি, লোডশেডিং ও সীমিত কোম্পানির সক্ষমতা প্রকল্পকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে।
তবে আন্তর্জাতিক উদাহরণ দেখায়, স্থিতিশীল নীতি, ধারাবাহিক সমর্থন এবং আর্থিক ব্যবস্থা থাকলে দ্রুত সম্প্রসারণ সম্ভব। বাংলাদেশও SREDA’র মাধ্যমে ভবনের সম্ভাব্যতা যাচাই, অংশীদারদের ক্ষমতা বৃদ্ধি এবং স্বাধীন নজরদারি প্রক্রিয়া চালু করলে লক্ষ্য অর্জনের সম্ভাবনা বেড়ে যাবে।

