বাংলাদেশের শেয়ারবাজারে বিদেশি পোর্টফোলিও বিনিয়োগ গত কয়েক মাস ধরে ওঠানামার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ডলার বাজারের চাপ, মুদ্রাস্ফীতি, সুদের হার বৃদ্ধি এবং নীতিগত অনিশ্চয়তা, সব মিলিয়ে বিনিয়োগকারীদের আস্থার এক কঠিন পরীক্ষাই চলছে। তবুও এই অস্থিরতার মাঝেও কয়েকটি প্রতিষ্ঠান ধারাবাহিক আয়ক্ষমতা, স্বচ্ছ কর্পোরেট শাসন, নিয়মিত লভ্যাংশ, টেকসই ব্যবসা-মডেল ও যথেষ্ট লিকুইডিটির কারণে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছে “নিরাপদ আশ্রয়” হিসেবে উঠে এসেছে।
এই প্রতিবেদন সেই আস্থার শীর্ষে থাকা পাঁচ কোম্পানিকে কেন্দ্র করে তৈরি করার প্রয়াস চালানো হয়েছে। এখানে বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে বিদেশিদের নিট ক্রয়-বিক্রয় প্রবণতা, টার্নওভার, আয়-বৃদ্ধির ধারাবাহিকতা, মুদ্রা-ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, মূল্যায়ন এবং পরিবেশ-সামাজিক-শাসন (ESG) মানদণ্ড।
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) জুলাই ২০২৫-এর পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ওই মাসে বিদেশি পোর্টফোলিও বিনিয়োগ বেড়েছে প্রায় ২৫০ কোটি টাকা। বর্তমানে ১৪৫টি কোম্পানিতে বিদেশিদের শেয়ার রয়েছে, এর মধ্যে ২৪টির বিনিয়োগ বেড়েছে এবং ২৭টির কমেছে। কিন্তু এই ওঠানামার মাঝেও পাঁচটি কোম্পানি বিশেষভাবে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের আস্থা কুড়িয়েছে, যা বাজার ও নীতিগত দিক থেকে ইতিবাচক সংকেত বহন করছে।
শীর্ষ পাঁচ কোম্পানি: ভালো কর্পোরেট শাসন ব্যবস্থা, টেকসই ব্যবসায়িক সম্ভাবনা এবং আর্থিক প্রতিবেদনে স্বচ্ছতা এসব কারণেই কিছু প্রতিষ্ঠান বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছে বিশেষভাবে আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (DSE) জুলাই ২০২৫-এর পরিসংখ্যান বলছে, এই মাসে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা সর্বাধিক আস্থা রেখেছেন পাঁচটি প্রতিষ্ঠানের ওপর।
তালিকার শীর্ষে রয়েছে BRAC Bank, যেখানে প্রায় ২৩৩ কোটি টাকার বিদেশি বিনিয়োগ প্রবাহিত হয়েছে। ব্যাংকটির ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি ও শক্তিশালী আর্থিক অবস্থান বিনিয়োগকারীদের কাছে একে নিরাপদ গন্তব্যে পরিণত করেছে। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে Prime Bank, যার শেয়ারে বিদেশি বিনিয়োগের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৭৮ কোটি টাকা। আর্থিক খাতে স্থিতিশীল অবস্থান এবং সুসংগঠিত কর্পোরেট নীতি এর প্রতি বিদেশিদের আস্থা বাড়িয়েছে। তৃতীয় স্থানে রয়েছে IDLC Finance। যদিও বিনিয়োগের পরিমাণ তুলনামূলকভাবে কম, তবুও প্রায় ১৯ কোটি টাকা বিদেশি বিনিয়োগ এসেছে এই নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানে। বিশ্লেষকদের মতে, ধারাবাহিক আয়ের প্রবাহ এবং শক্তিশালী বাজার অবস্থান এর মূল কারণ।
ভোক্তা খাতে বিদেশিদের আগ্রহ ধরা পড়েছে Marico Bangladesh-এ। দৈনন্দিন ব্যবহার্য ভোগ্যপণ্যের স্থিতিশীল চাহিদার কারণে প্রতিষ্ঠানটি বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছে আকর্ষণীয় এবং জুলাই মাসে প্রায় ১১ কোটি টাকা বিনিয়োগ হয়েছে এর শেয়ারে। তালিকার পঞ্চম স্থানে রয়েছে Uttara Bank, যেখানে প্রায় ৩ দশমিক ৯২ কোটি টাকার বিদেশি পুঁজি এসেছে। পরিমাণে তুলনামূলকভাবে ছোট হলেও ব্যাংকটি বিদেশিদের আস্থার তালিকায় জায়গা করে নিয়েছে, যা ভবিষ্যতের জন্য ইতিবাচক ইঙ্গিত বহন করছে।
সব মিলিয়ে এই পরিসংখ্যান প্রমাণ করে যে বাংলাদেশের সামগ্রিক বাজারে বিদেশি অংশগ্রহণ ওঠানামা করলেও কিছু প্রতিষ্ঠান নিজেদের দৃঢ়তা, স্বচ্ছতা ও সম্ভাবনার কারণে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের কাছে নিরাপদ ও লাভজনক বিনিয়োগের ক্ষেত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যেসব কোম্পানিতে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা আস্থা দেখাচ্ছেন, এর পেছনে মূলতঃ তিনটি প্রধান কারণ কাজ করছে। প্রথমতঃ এসব প্রতিষ্ঠানের রয়েছে দৃঢ় ব্যবসায়িক ভিত্তি, যা দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করে। দ্বিতীয়ত: স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক কর্পোরেট পরিচালনা বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়িয়েছে। আর তৃতীয়ত: রক্ষণশীল আর্থিক কাঠামোর কারণে বাজারের অস্থিরতা সামলানোর সক্ষমতাও তুলনামূলকভাবে বেশি।
তবে বাংলাদেশের সামগ্রিক প্রেক্ষাপট একেবারে নিরবচ্ছিন্ন নয়। আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা, দেশের মুদ্রানীতি ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সংকট, পাশাপাশি রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা বিদেশি বিনিয়োগে প্রভাব ফেলছে। তবুও এসব চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও বিদেশিদের কাছে বাংলাদেশ এখনও আকর্ষণীয় একটি গন্তব্য, বিশেষত যেসব প্রতিষ্ঠান ধারাবাহিকভাবে ভালো পারফরম্যান্স দেখাতে সক্ষম হয়েছে।
বাজার প্রবাহের দিক থেকে ২০২৪ সাল ছিল তুলনামূলকভাবে দুর্বল একটি বছর। ওই বছরে বিদেশি পোর্টফোলিও বিনিয়োগ প্রায় ২০ শতাংশ কমেছে। এর ফলে বিদেশিদের অংশীদারিত্ব কমে দাঁড়ায় ১ দশমিক শূন্য ৮ বিলিয়ন ডলার থেকে ৮৬৫ মিলিয়ন ডলারে। তবে ২০২৫ সালের শুরুতে চিত্র বদলাতে শুরু করে। জানুয়ারি থেকে মার্চ—প্রথম প্রান্তিকে বিদেশি প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ (FDI) নাটকীয়ভাবে বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ৮৬৪ থেকে ৮৬৫ মিলিয়ন ডলার (নিট), যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। এটি বাংলাদেশের বিনিয়োগ সম্ভাবনার প্রতি বিদেশি আস্থার একটি ইতিবাচক ইঙ্গিত বহন করে।
তবে লক্ষণীয় বিষয় হলো, এই বিনিয়োগের একটি বড় অংশ এসেছে ‘ইনট্রা-কম্পানি লোন’ আকারে। অর্থাৎ বিদেশি মূল কোম্পানি তাদের স্থানীয় সহযোগী প্রতিষ্ঠানকে ঋণ আকারে অর্থ দিয়েছে। এতে দেশের মোট পুঁজির প্রবাহ বেড়েছে ঠিকই, তবে সব বিনিয়োগ সরাসরি উৎপাদন বা নতুন শিল্প খাতে কাজে লাগছে না। ফলে দেশীয় অর্থনীতিতে এর প্রভাব আংশিক হলেও দীর্ঘমেয়াদে টেকসই প্রবৃদ্ধির জন্য প্রকৃত খাতে বিনিয়োগের প্রয়োজনীয়তা থেকেই যাচ্ছে। সব মিলিয়ে বলা যায়, বাংলাদেশের শেয়ারবাজারে বিদেশি বিনিয়োগ ওঠানামার মধ্য দিয়ে গেলেও সুশাসন, স্বচ্ছতা ও সম্ভাবনাময় ব্যবসায়িক মডেল যেসব প্রতিষ্ঠানে বিদ্যমান, সেগুলোই আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের প্রথম পছন্দ হয়ে উঠছে।
বাংলাদেশের শেয়ারবাজার সামগ্রিকভাবে এখনও নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি; রিজার্ভ সংকট, বৈদেশিক মুদ্রার চাপ, নীতিগত অনিশ্চয়তা ও রাজনৈতিক অস্থিরতা বিদেশি বিনিয়োগকারীদের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করছে। তবুও BRAC Bank, Prime Bank, IDLC Finance, Marico Bangladesh ও Uttara Bank-এর মতো কিছু প্রতিষ্ঠান নিজেদের আর্থিক শক্তি, স্বচ্ছ কর্পোরেট শাসন ও টেকসই ব্যবসায়িক সম্ভাবনার কারণে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের কাছে আলাদা আস্থা অর্জন করেছে।
এই প্রবণতা প্রমাণ করে যে, সঠিক নীতি সহায়তা, বাজারে স্বচ্ছতা এবং দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা গেলে বাংলাদেশের মূলধন বাজার আবারও বৈশ্বিক বিনিয়োগকারীদের কাছে একটি আকর্ষণীয় গন্তব্যে পরিণত হতে পারে। শীর্ষ পাঁচ কোম্পানির প্রতি বিদেশি আগ্রহ সেই সম্ভাবনারই ইঙ্গিত দিচ্ছে, যা ভবিষ্যতে বিনিয়োগ প্রবাহ বাড়াতে নীতি নির্ধারকদের জন্য আশাব্যঞ্জক বার্তা বহন করে।

