বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ইতিহাসে চিনিশিল্প একসময় ছিল গৌরবের প্রতীক। রাষ্ট্রায়ত্ত চিনিকলগুলো শুধু চিনি উৎপাদনের ক্ষেত্রেই নয়, বরং গ্রামীণ অর্থনীতিকে সচল রাখার একটি বড় ভরসা ছিল। দেশের উত্তরাঞ্চল, দক্ষিণাঞ্চল ও ময়মনসিংহসহ বিস্তীর্ণ এলাকায় আখচাষের উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছিল সমৃদ্ধ কৃষি-অর্থনীতি। আখচাষ ছিল কৃষকদের প্রধান নগদ ফসল, আর চিনিকল ছিল হাজার হাজার শ্রমিকের জীবিকার উৎস।
কিন্তু স্বাধীনতার পরবর্তী কয়েক দশকে এই শিল্প এক গভীর সংকটে পড়ে। আজ দেশের অধিকাংশ চিনিকল বন্ধ, উৎপাদন নামমাত্র পর্যায়ে নেমে এসেছে, কৃষকেরা আখচাষে অনাগ্রহী হয়ে উঠেছেন, আর শ্রমিকরা বেকারত্বের দংশনে ভুগছেন। অথচ সরকার বলছে, এটি নাকি প্রয়োজনীয় সংস্কার, কারণ লোকসানি শিল্প টিকিয়ে রাখলে রাষ্ট্রের আর্থিক ক্ষতি বাড়বে এবং বিনিয়োগ আকর্ষণ ব্যাহত হবে।
এখানেই মূল দ্বন্দ্ব, জাতীয় শিল্প ধ্বংস করে বিনিয়োগ আকর্ষণ এই কেমন অর্থনৈতিক কৌশল? এটা কি বাস্তবতা, নাকি স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর খেলা? এই প্রতিবেদনে আমরা খুঁজে দেখার প্রয়াস চালাবো বাংলাদেশের চিনিশিল্পের ইতিহাস, সংকট, সরকারি নীতি, বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট এবং এই শিল্প ধ্বংসের সামাজিক-অর্থনৈতিক প্রভাব। সবশেষে আলোচনা করব টেকসই সমাধানের পথ।
বাংলাদেশের চিনিশিল্পের ইতিহাস: চিনিশিল্পের শেকড় বাংলাদেশে গভীর। পাকিস্তান আমলে (১৯৫০–৭০) এই অঞ্চলে একের পর এক চিনিকল স্থাপন করা হয়। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ সরকার সবগুলো রাষ্ট্রায়ত্ত করে। ১৯৭২ সালে মুক্তিযুদ্ধ শেষে দেশে মোট ১৫টি চিনিকল সক্রিয় ছিল। এর মধ্যে অনেকগুলো আজও বিদ্যমান যেমন: পাবনা চিনিকল, রাজশাহী চিনিকল, কুষ্টিয়ার কুমারখালী চিনিকল, দিনাজপুরের শাপলা চিনিকল, ঠাকুরগাঁও চিনিকল ইত্যাদি। সে সময় রাষ্ট্র ভেবেছিল চিনিশিল্প হবে দেশের অন্যতম প্রধান রাজস্ব আয়ের খাত।
সুবর্ণ সময় (১৯৭০–৮০-এর দশক): দেশে আখচাষের মোট আবাদ ছিল প্রায় ৪–৫ লাখ একর। তখন চিনিশিল্প বছরে প্রায় ২ থেকে ২ দশমিক ৫ লাখ মেট্রিক টন চিনি উৎপাদন করত। ফলে আখকেন্দ্রিক গ্রামীণ অর্থনীতি গড়ে ওঠে—কৃষক, শ্রমিক, পরিবহন, স্থানীয় বাজার সবই এই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত। সাথে চিনিকল শহরগুলোতে হাসপাতাল, স্কুল, বাজার গড়ে উঠে। তবে সমস্যার বীজ তখনই বপন হয়েছিল। চিনিকলে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি ছিল অত্যন্ত পুরনো, পাকিস্তান আমলের প্রযুক্তি। স্বাধীনতার পর সেগুলো আধুনিকায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।
সংকটের শুরু: ১৯৯০-এর দশক থেকে বাংলাদেশের চিনিশিল্প টেকসই সংকটে পড়ে। এর প্রধান কারণ হলো প্রযুক্তিগত পশ্চাদপদতা, অধিকাংশ চিনিকলের যন্ত্রপাতি ৩০–৪০ বছরের পুরনো ছিল। অপরদিকে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়া, এক কেজি চিনি উৎপাদনে সরকারের খরচ হয় প্রায় ৯০–১০০ টাকা, অথচ বিদেশি চিনি আমদানি করা যায় ৬০–৭০ টাকায়। তাছাড়া রয়েছে দুর্নীতি ও অপব্যবস্থাপনা, আখ সংগ্রহ, গুদামজাতকরণ, বিক্রিতে ব্যাপক অনিয়ম। এতে কৃষকদের আস্থাহীনতা বাড়ে, সময়মতো আখ না কেনা, বকেয়া পরিশোধ না করায় কৃষকরা আখচাষ ছেড়ে দিতে শুরু করেন। বাজার নীতি এর উপর প্রভাব বিস্তার করে। দেশীয় উৎপাদন রক্ষার পরিবর্তে সরকার সহজে আমদানির পথ খুলে দেয়।
২০০০ সালের পর থেকে চিনিশিল্প ক্রমেই লোকসানে ডুবে যায়। বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশন (বিএসএফআইসি) এর তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে রাষ্ট্রায়ত্ত চিনিকলগুলোতে লোকসান দাঁড়ায় প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকা।
২০২০ সালে করোনা মহামারির সময় হাসিনা সরকার হঠাৎ দেশের ১৫টি চিনিকলের মধ্যে ৬টিতে আখমাড়াই বন্ধের ঘোষণা দেয়, খেতে তখন দণ্ডায়মান আখ, কাটার অপেক্ষায় ছিল। একরাতে হাজার হাজার শ্রমিক কর্মহীন হয়ে পড়ে। আখচাষী কৃষকের ফসল মাঠে পড়ে যায়, তারা ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়ে। সরকার মূলতঃ লোকসান এবং পরিচালনাগত সমস্যার কারণে এই বন্ধের সিদ্ধান্ত নেয়। তবে এই সিদ্ধান্তের ফলে আখ চাষী, শ্রমিক এবং স্থানীয় জনগণের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দেয়, কারণ এতে অনেকের কর্মসংস্থান এবং জীবিকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
তখন থমথমে পরিস্থিতিতে আশপাশের হোটেল, দোকান, ছোট ব্যবসা বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়। সবার মুখে তখন একটাই প্রশ্ন কীভাবে হঠাৎ এই সিদ্ধান্ত নিল হাসিনা সরকার? শোক ও ক্ষোভে কৃষকেরা রাস্তায় আখ পুড়িয়ে প্রতিবাদ জানান। জমে থাকা এই ক্ষোভই যেন পরবর্তী সময়ে গণ–অভ্যুত্থানের সময় বাষ্প হয়ে বিস্ফোরিত হয়েছিল।
বন্ধ হয়ে যাওয়া এই চিনিকলগুলি হলো: শ্যামপুর চিনিকল (রংপুর), পঞ্চগড় চিনিকল, পাবনা চিনিকল, সেতাবগঞ্জ চিনিকল (দিনাজপুর), রংপুর চিনিকল এবং কুষ্টিয়া চিনিকল। এই চিনিকলগুলি বন্ধ হওয়ার ফলে আখ চাষ এবং চিনি উৎপাদন দু’টোতেই নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে এবং এই শিল্পে জড়িত অনেকের জীবনযাত্রাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
সরকার যুক্তি দেয় এই কলগুলোতে উৎপাদন কম, লোকসান বেশি। কিন্তু বাস্তবে এর ফলে হাজার হাজার শ্রমিক রাতারাতি বেকার হয়ে যান, কৃষকরা আখ বিক্রির সুযোগ হারান, আর পুরো অঞ্চলের অর্থনীতি স্থবির হয়ে পড়ে। সরকারের বক্তব্য হলো রাষ্ট্রায়ত্ত লোকসানি শিল্প টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়। বরং এই জমি ও সম্পদ বেসরকারি খাত বা বিদেশি বিনিয়োগকারীদের হাতে তুলে দেওয়া হবে।
এখানেই প্রশ্ন জাগে কেন সরকার চিনিকল আধুনিকায়নে বিনিয়োগ করল না? কেন আন্তর্জাতিক মডেল অনুসরণ করা হলো না, যেখানে সাবসিডি দিয়ে শিল্পকে বাঁচানো হয় কেন কৃষক-শ্রমিকের জীবিকা রক্ষার চেয়ে বিনিয়োগকারীর স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া হলো? আসলে এখানে একটি দু’মুখো খেলা চলছে। একদিকে সরকার লোকসান কমানোর যুক্তি দেখাচ্ছে, অন্যদিকে আমদানিকারক ও বিনিয়োগকারী গোষ্ঠী লাভবান হচ্ছে।
৫ আগস্ট ছাত্র- শ্রমিক- জনতার অভ্যুত্থানের পর চিনিকল আবার চালুকরণ টাস্কফোর্সের সুপারিশে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা আখমাড়াই স্থগিতাদেশ তুলে নেন। জীবিকা হারানো মানুষগুলো নতুন করে আশাবাদী হন, আবার খুলবে মিল, আবার ফিরবে কর্মসংস্থান। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে দেরি করে হলেও আখ চাষ শুরু হয়।
এরপর চিনিকলগুলো চালু করতে নতুন বিনিয়োগের প্রস্তুতির সময়, টাস্কফোর্সের সুপারিশ অনুযায়ী করপোরেশন অর্থ বিভাগে সেতাবগঞ্জ ও শ্যামপুর চিনিকলের জন্য তিন বছরের বাজেট প্রস্তাব দেয়। কিন্তু ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে নতুন রোপণ মৌসুম শুরু হওয়ার ঠিক আগে জানা গেল, অর্থ বিভাগ বাজেট অনুমোদন করেনি। অথচ আট-নয় মাস আগেও মিলগেটে লিফলেট দিয়ে কৃষকদের আখ চাষে উৎসাহিত করা হয়েছিল। টাস্কফোর্সকেও জানানো হয়নি, কেন সরকার হঠাৎ অর্থছাড় থেকে সরে এল।
আগের মতোই কারণ জানা গেল সংবাদমাধ্যমের শিরোনামে। ‘খবর এসেছে গত ৫ বছরে ৫০০ কোটি টাকা লোকসান করেছে চিনিকলগুলো।’ পুরোনো লোকসানের একই অজুহাত আবারও দাঁড় করানো করা হলো।
আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট: বিশ্বে চিনি উৎপাদনের শীর্ষ দেশগুলো যেমন: ভারত, ব্রাজিল, থাইল্যান্ড তারা ভিন্ন কৌশল নিয়েছে। ভারত বছরে প্রায় ৩০ মিলিয়ন টন চিনি উৎপাদন করে। কৃষকরা আখ বিক্রিতে নিশ্চয়তা পান, সরকার ভর্তুকি দেয়। পাশাপাশি ইথানল উৎপাদনে আখ ব্যবহার হয়, যা জ্বালানির বিকল্প উৎস। অপরদিকে বিশ্বের ৪০% ইথানল উৎপাদন করা হয় ব্রাজিলের আখ থেকে। এতে বৈদেশিক মুদ্রা আয় হয়। থাইল্যান্ড চিনি রপ্তানির জন্য বড় সরকারি প্রণোদনা দেয়। অথচ বাংলাদেশ উল্টো পথে। আমরা নিজস্ব শিল্প আধুনিকায়ন না করে আমদানিনির্ভর হয়েছি। ফলে বৈদেশিক মুদ্রা খরচ হচ্ছে, আর শ্রমিক-কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
সমাজ-অর্থনীতিতে প্রভাব: চিনিশিল্প ধ্বংসের প্রভাব শুধু অর্থনৈতিক নয়, সামাজিকও। এর ফলে কৃষক দারিদ্র্যে নিমজ্জিত হচ্ছে। আখ বিক্রি না হওয়ায় ঋণগ্রস্ত হচ্ছেন। অনেকেই ফসল পরিবর্তন করছেন, কিন্তু এতে নতুন ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। অপরদিকে শ্রমিক বেকারত্ব বাড়ছে। কয়েক লাখ শ্রমিক প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এই শিল্পের সাথে জড়িত ছিলেন। গ্রামীণ অর্থনীতির পতনের ফলে চিনিকলভিত্তিক বাজার ভেঙে পড়ছে, দোকান, পরিবহন, ক্ষুদ্র ব্যবসা ধ্বংস হচ্ছে। ফলে সামাজিক অস্থিরতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। বেকারত্বের কারণে অপরাধ বাড়ছে, তরুণদের অভিবাসন প্রবণতা বেড়েছে। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে ধস নেমেছে, চিনিকল এলাকার স্কুল-হাসপাতাল অর্থ সংকটে বন্ধ হতে বসেছে।
টেকসই সমাধান: বাংলাদেশের চিনিশিল্পকে বাঁচাতে নিম্নলিখিত পদক্ষেপ অতীব জরুরি। পুরনো যন্ত্রপাতি বদলে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার। আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে আখ কে বহুমুখী ব্যবহার করতে হবে। যেমন: আখ থেকে শুধু চিনি নয়, ইথানল, বায়োগ্যাস, বিদ্যুৎ উৎপাদন। পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপের মাধ্যমে রাষ্ট্র ও বেসরকারি খাত মিলে চিনিকল পরিচালনা। ন্যায্যমূল্য নিশ্চয়তার সাথে কৃষককে সময়মতো টাকা পরিশোধ। রপ্তানি কৌশল গ্রহণ করে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতার জন্য ভর্তুকি ও প্রণোদনা। দুর্নীতি দমনের মাধ্যমে ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা।
বাংলাদেশের চিনিশিল্প একটি ঐতিহাসিক সম্পদ। এটি শুধু একটি শিল্প নয়, এটি কৃষক-শ্রমিকের জীবন, গ্রামীণ অর্থনীতির চাকা এবং জাতীয় স্বনির্ভরতার প্রতীক। বিনিয়োগ আকর্ষণের নামে এই শিল্প ধ্বংস করা মানে হলো দেশের ভবিষ্যৎকে বিদেশি পুঁজির ওপর নির্ভরশীল করে তোলা। অর্থনীতির এই “দুমুখো খেলা” বন্ধ করতে হলে রাষ্ট্রকে দীর্ঘমেয়াদী ভিশন নিতে হবে। স্বল্পমেয়াদী লোকসান নয়, বরং টেকসই উন্নয়ন ও জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। যদি চিনিশিল্পকে আধুনিকায়ন করে কৃষক-শ্রমিকের অধিকার রক্ষা করা যায়, তবে বাংলাদেশ শুধু নিজের চাহিদাই মেটাবে না, বরং আন্তর্জাতিক বাজারেও প্রতিযোগিতা করতে পারবে। অন্যথায় বিনিয়োগের নামে এই ধ্বংসাত্মক নীতি আমাদের অর্থনীতিকে এক গভীর দুঃস্বপ্নের দিকে ঠেলে দেবে।

