আবর্জনাকে বিভিন্ন পদ্ধতির মাধ্যমে জ্বালানি সম্পদে রূপান্তর করা যায় যেমন: জৈবিক প্রক্রিয়া- অ্যানেরোবিক হজম, থার্মাল প্রক্রিয়া- গ্যাসীফিকেশন এবং রিফ্যুজ-ডেরিভড ফুয়েল (RDF) তৈরি করা। অ্যানেরোবিক হজম প্রক্রিয়ায় জৈব বর্জ্য থেকে মিথেনযুক্ত বায়োগ্যাস তৈরি হয়, যা শক্তি উৎপাদনে ব্যবহার করা যায়। থার্মাল প্রক্রিয়ায় উচ্চ তাপে আবর্জনাকে প্রক্রিয়াজাত করে জ্বালানি গ্যাস বা তেল তৈরি করা হয়। RDF হল এমন এক ধরনের জ্বালানি যা পৌর বর্জ্য প্রক্রিয়াজাত করে তৈরি হয় এবং শিল্পে ব্যবহৃত হয়।
আবর্জনা বা বর্জ্য থেকে শক্তি ( WtE- Waste-to-Energy) বলতে বর্জ্য পদার্থকে ব্যবহারযোগ্য শক্তিতে, সাধারণত বিদ্যুৎ বা তাপে রূপান্তর করার জন্য ডিজাইন করা প্রক্রিয়াগুলির একটি সিরিজকে বুঝায়। শক্তি পুনরুদ্ধারের একটি রূপ হিসাবে WtE ল্যান্ডফিলগুলিতে বর্জ্যের পরিমাণ হ্রাস করে এবং একটি বিকল্প শক্তির উৎস প্রদান করে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং টেকসই শক্তি উৎপাদন উভয় ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
WtE-এর সবচেয়ে সাধারণ পদ্ধতি হলো তাপ উৎপাদনের জন্য বর্জ্যের সরাসরি দহন যা পরবর্তীতে বাষ্পীয় টারবাইনের মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য ব্যবহার করা যেতে পারে। এই পদ্ধতিটি অনেক দেশে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয় এবং এর দ্বৈত সুবিধা রয়েছে। এটি শক্তি উৎপাদনের সময় বর্জ্য নিষ্কাশন করে, যা বর্জ্য হ্রাস এবং শক্তি উৎপাদন উভয়ের জন্যই একটি দক্ষ প্রক্রিয়া করে তোলে।
দহন ছাড়াও অন্যান্য WtE প্রযুক্তিগুলি বর্জ্যকে জ্বালানি উৎসে রূপান্তর করার উপর জোর দেয়। উদাহরণস্বরূপ- গ্যাসিফিকেশন এবং পাইরোলাইসিস হলো এমন প্রক্রিয়া যা অক্সিজেনের অনুপস্থিতিতে জৈব পদার্থগুলিকে তাপ-রাসায়নিকভাবে পচিয়ে সিঙ্গাস তৈরি করে, যা মূলতঃ হাইড্রোজেন, কার্বন মনোক্সাইড এবং অল্প পরিমাণে কার্বন ডাই অক্সাইড দ্বারা গঠিত একটি সিন্থেটিক গ্যাস। এই সিঙ্গাসকে মিথেন , মিথানল , ইথানল , এমনকি সিন্থেটিক জ্বালানিতে রূপান্তরিত করা যেতে পারে , যা বিভিন্ন শিল্প প্রক্রিয়ায় বা পরিবহনে বিকল্প জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে।
বিশ্বে সুইডেন, চীন, ভারত, ইরান ও বাংলাদেশসহ অনেক দেশ আবর্জনাকে জ্বালানি সম্পদে রূপান্তরিত করছে। সুইডেন বর্জ্য আমদানি করে জ্বালানি উৎপন্ন করছে, যেখানে চীন বর্জ্যকে সম্পদে পরিণত করার উপর জোর দিচ্ছে। ইরান বর্জ্যের নিচে থাকা অর্থনৈতিক সুযোগ ব্যবহার করছে এবং বাংলাদেশ বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা করছে।
বাংলাদেশ বর্জ্যকে জ্বালানিতে রূপান্তরের ক্ষেত্রে পরীক্ষামূলক পর্যায়ে সফলতা পেয়েছে, তবে এটি একটি উন্নয়নশীল প্রযুক্তি বিদায় এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। ফরিদপুরে পলিথিন বর্জ্য থেকে জ্বালানি তেল উৎপাদন এবং হাইড্রোজেন ফুয়েল তৈরির প্রস্তুতি চলছে। এছাড়া শহুরে আবর্জনা ও মানববর্জ্যকে বায়োগ্যাস এবং অন্যান্য জ্বালানিতে রূপান্তরের প্রকল্পও হাতে নেওয়া হয়েছে। পলিথিন বর্জ্য রিসাইকেলিংয়ের মাধ্যমে পরীক্ষামূলকভাবে ১ হাজার ২০০ লিটার জ্বালানি তেল উৎপাদন করা হয়েছে। অপরদিকে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন (চসিক) জাপানি কোম্পানির সঙ্গে মিলে বর্জ্য থেকে নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদনের পরিকল্পনা করছে। এই প্রযুক্তি এখনো বাণিজ্যিকভাবে ব্যাপক আকারে চালু না হলেও, এটি ভবিষ্যতে একটি সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে, যা পরিবেশগত প্রভাব কমিয়ে স্থিতিশীল জ্বালানি সরবরাহে সাহায্য করতে পারে।
এখানে আমরা ইরান আবর্জনাকে যেভাবে জ্বালানি সম্পদে পরিণত করেছে তা বিস্তারিত আলোকপাত করার প্রয়াস চালানোর জন্য চেষ্টা করছি।ময়লা-আবর্জনার স্তুপের দুর্গন্ধ আর পচনের নীচেই চাপা পড়ে আছে একটি অপ্রত্যাশিত ধন। ‘নোংরা সোনা’ খ্যাত এই সম্পদ অবিরাম সূর্যের নীচে আবর্জনার একটি পাহাড় আকারে জমে আছে। পুরো এলাকায় ছড়িয়ে রয়েছে এর তীব্র গন্ধ। অপ্রত্যাশিত এই মূল্যবান সম্পদের অবস্থান পশ্চিম ইরানের কেরমানশাহ শহরের বাইরে।
ইরানের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন সংবাদ মিডিয়া সংস্থা প্রেস টিভির মতে, এই নোংরা-আবর্জনার নীচেই চাপা পড়ে রয়েছে উল্লেখযোগ্য মাত্রার একটি অর্থনৈতিক সুযোগ। এটিকে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, শিল্প জ্বালানি খরচ এবং পরিবেশগত স্থায়িত্বের ক্ষেত্রে ইরানের দৃষ্টিভঙ্গির একটি নতুন অধ্যায়ের প্রতীক হিসেবে দেখা হচ্ছে।
আলোচনার সূত্রপাত হয় ২০০০ সালে, এই বছর কেরমানশাহে ইরানের সবচেয়ে অগ্রণী এবং উন্নত বর্জ্য পুনর্ব্যবহারযোগ্য কেন্দ্র উদ্বোধন করা হয়। এটি সেই সময়ে একটি সাহসী পরীক্ষা ছিল। একসময় যেটাকে কেবল আবর্জনা হিসাবে দেখা হতো তা থেকে একটি মূল্যবান সম্পদ তৈরি করার একটি প্রচেষ্টা শুরু হয় তখন থেকে। এরপর থেকে এই বর্জ্য পুনর্ব্যবহারযোগ্য কেন্দ্রটি প্রতিদিন ৬৫০ থেকে ৭০০ টন পৌর বর্জ্য প্রক্রিয়াজাতকরণে উন্নীত হয়েছে এবং আবর্জনার স্তূপ থেকে শক্তি-সমৃদ্ধ জ্বালানি তৈরি করা হচ্ছে যা রিফিউজি-ডেরিভড ফুয়েল বা আরডিএফ নামে পরিচিত।
এই সংকুচিত দাহ্য পদার্থটি (আরডিএফ) প্লাস্টিকের ব্যাগ, টেক্সটাইল এবং ময়লা কাগজের মতো অ-পুনর্ব্যবহারযোগ্য বর্জ্য থেকে তৈরি করা হয়। এর মধ্য দিয়ে জীবাশ্ম জ্বালানি যা দীর্ঘদিন ধরে ইরানের শিল্পকে জ্বালানি যুগিয়ে আসছে সেখান থেকে আমূল পরিবর্তন ঘটিয়েছে দেশটি। বছরের পর বছর ধরে ইরানের সিমেন্ট কারখানা এবং অন্যান্য ভারী শিল্পগুলি জীবাশ্ম জ্বালানির উপর ব্যাপকভাবে নির্ভর করে আসছে, বিশেষ করে মাজুত যা একটি ঘন, দূষণকারী তেলের উৎস।
এখন কেরমানশাহের ওয়েস্ট সিমেন্ট ইন্ডাস্ট্রিজ কোম্পানি দেশটির প্রথম কারখানা হয়ে উঠেছে যেটি আংশিকভাবে আরডিএফ দিয়ে প্রাকৃতিক গ্যাসের ব্যবহার শুরু করেছে। প্রতিদিন প্রায় ১২০ টন আরডিএফ সরবরাহ করা হয়, যা প্ল্যান্টটির প্রাকৃতিক গ্যাস ব্যবহারের প্রায় ১৯ শতাংশের সমান। এটি একটি প্রাথমিক চিত্র কিন্তু পরিচ্ছন্ন জ্বালানির বিকল্পের দিকে একটি শক্তিশালী পদক্ষেপ।
কেরমানশাহ প্রদেশ প্রতিদিন প্রায় ১৪শ থেকে ১৫শ টন বর্জ্য উৎপন্ন করে, যার অর্ধেকেরও বেশি শহর থেকেই আসে। তাই এই অর্জনের মাত্রা কেমন হবে তা উপলব্ধি করতে এটিই যথেষ্ট। জাতীয়ভাবে ইরান প্রতিদিন প্রায় ৬০ হাজার টন বর্জ্য উৎপাদন করে, বছরে প্রায় ২০ মিলিয়ন টন। এটি অনেক দেশের মাথাপিছু উৎপাদিত বর্জ্যের দ্বিগুণেরও বেশি। কাঁচামালের এই প্রাচুর্য থাকা সত্ত্বেও পুনর্ব্যবহারের হার মাত্র ৫ থেকে ১০ শতাংশে দাঁড়িয়ে আছে।
বিশেষজ্ঞরা ধারণা করছেন, ৬ মিলিয়ন টন বর্জ্য সঠিকভাবে বাছাই এবং পুনর্ব্যবহার করতে পারলে কেবল ময়লা-আবর্জনা থেকে বছরে প্রায় ৩ দশমিক ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার মূল্যের সম্পদ বেরিয়ে আসবে দেশটির।
অনেক দেশে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং পুনর্ব্যবহার প্রক্রিয়া আনুষ্ঠানিক এবং অনানুষ্ঠানিক কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ উৎস হয়ে উঠেছে, যা সামাজিক অন্তর্ভুক্তি এবং দারিদ্র্য বিমোচনে অবদান রাখছে। অনুরূপভাবে ইরানও কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য এই খাতের শ্রম-নিবিড় প্রকৃতিকে কাজে লাগাতে পারে, বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে। ফলে অর্থনৈতিক ও সামাজিক নীতিগত লক্ষ্যগুলিও পূরণ হবে।
ল্যান্ডফিল এবং খোলা ডাস্টবিন মাটি এবং ভূগর্ভস্থ পানিকে দূষিত করে। ফলে এই ধরনের বর্জব্যবস্থাপনার সম্প্রসারণ ঘটলে মূল্যবান ভূমি সম্পদ নষ্ট হবে। অন্যদিকে পুনর্ব্যবহার এবং আরডিএফ উৎপাদনের মাধ্যমে এই স্থানগুলি থেকে বর্জ্য সরিয়ে নিয়ে গেলে এই ক্ষতিকারক প্রভাবগুলি নাটকীয়ভাবে হ্রাস পাবে।
এছাড়াও মাজুত এবং অন্যান্য জীবাশ্ম জ্বালানির উপর নির্ভরতা হ্রাস করলে কার্বন নিঃসরণ হ্রাস পাবে যা ক্রমবর্ধমান আন্তর্জাতিক চাপের মধ্যে ইরানকে জলবায়ু প্রতিশ্রুতি পূরণে সহায়তা করবে। ইরানের সরকার বিষয়টি লক্ষ্য করছে। গত সপ্তাহে কেরমানশাহ সফরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এস্কান্দার মোমেনি সহ কর্মকর্তারা আরডিএফ এর বিশাল সম্ভাবনা তুলে ধরেছেন।
WtE প্রযুক্তি বিশ্বব্যাপী জ্বালানি চাহিদা পূরণের পাশাপাশি টেকসইভাবে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ প্রদান করে। এগুলি সমন্বিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কৌশল এবং পুনর্নবীকরণযোগ্য জ্বালানি ব্যবস্থার দিকে পরিবর্তনের একটি অপরিহার্য উপাদান। প্রযুক্তির অগ্রগতির সাথে সাথে, WtE ল্যান্ডফিল ব্যবহার হ্রাস এবং জ্বালানি নিরাপত্তা বৃদ্ধিতে ক্রমবর্ধমান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। যা আমাদের শহুরে পরিবেশকে উন্নত করে, বায়ু দূষণ হ্রাস করে, পরিবেশ বান্ধব সমাজ ব্যবস্থা গড়ে তোলতে সহায়তা করে এবং ভবিষ্যতে বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ও পরিবেশ সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

