স্টার্টআপ প্রতিষ্ঠানগুলোর অর্থায়নে নতুন ভেঞ্চার ক্যাপিটাল কোম্পানি গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। একই সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংক এই খাতের জন্য আলাদা তহবিলও গঠন করেছে। ব্যাংক সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, এই উদ্যোগ মূলত স্টার্টআপে বিনিয়োগকে সহজ করতে নেওয়া হয়েছে। নতুন ভেঞ্চার ক্যাপিটাল কোম্পানিতে বেসরকারি ব্যাংকও যুক্ত হবে বলে বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে।
খাতের উদ্যোক্তারা এই উদ্যোগকে স্বাগত জানালেও এর সফল বাস্তবায়ন নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন। তারা বলেন, অতীতে নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, কিন্তু এগুলো শেষ পর্যন্ত সফল হয়নি। তার বড় উদাহরণ হলো বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালনায় গঠিত ইক্যুইটি ও এন্টারপ্রেনার্স ফান্ড (ইইএফ)। তবে উদ্যোক্তারা মনে করছেন, এই নতুন উদ্যোগ সফল হলে স্টার্টআপরা বিনিয়োগ পাওয়া সহজ হবে। এতে নতুন সম্ভাবনাময় উদ্যোগের পথ খোলা হবে এবং তরুণরা এগিয়ে আসবে।
খাত সংশ্লিষ্টরা বলেন, এ ধরনের তহবিল পরিচালনায় প্রয়োজন পেশাদার ব্যবস্থাপনা, বিনিয়োগবান্ধব শর্ত এবং বেসরকারি ভেঞ্চার ক্যাপিটাল কোম্পানির সঙ্গে সমন্বয়। দ্রুত বাস্তবায়ন ও যোগ্য স্টার্টআপে বিনিয়োগের মানসিকতাও জরুরি। প্রাথমিক বা ‘সিড’ পর্যায়ের স্টার্টআপগুলোর জন্য এই উদ্যোগ বিনিয়োগ সহজ করবে। পাশাপাশি সিরিজ এ (পণ্য বা সেবা সম্প্রসারণ) ও সিরিজ বি (বড় পরিসরে সম্প্রসারণ) পর্যায়ের তহবিলের ঘাটতি পূরণ হবে। এজন্য উদ্যোগে যুক্তদের তরুণ এবং উদ্যোক্তাবান্ধব দৃষ্টিভঙ্গি থাকা জরুরি।
বিডি জবসের সিইও এ কে এম ফাহিম মাসরুর বলেন, “আমি বাংলাদেশ ব্যাংকের এই উদ্যোগকে স্বাগত জানাই। তবে সফল বাস্তবায়নের পথে অনেক চ্যালেঞ্জ আছে। অতীতে ইইএফ সফল হয়নি। এটি বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যবস্থাপনায় ছিল। সাফল্যের জন্য বেসরকারি খাতকে যুক্ত করতে হবে।” স্টার্টআপ খাতের বিনিয়োগকারী সংস্থার প্রতিনিধিরা মনে করেন, নতুন ভেঞ্চার ক্যাপিটাল কোম্পানি সরাসরি বাংলাদেশ ব্যাংক ও ব্যাংকগুলো দ্বারা পরিচালিত না হয়ে বরং ‘ফান্ড অব ফান্ডস’ মডেলে থাকা উচিত। ভেঞ্চার ক্যাপিটালে ঝুঁকি থাকে। অভিজ্ঞতা ছাড়া প্রথমবারে সফল করা কঠিন। ‘ফান্ড অব ফান্ডস’ মডেলে ঝুঁকি কমে যায়।
পাঠাওয়ের সিইও ফাহিম আহমেদ বলেন, “যেকোনো নতুন ভেঞ্চার ক্যাপিটাল কোম্পানির সফলতার সম্ভাবনা কম। স্টার্টআপে বিনিয়োগের দক্ষতা আমাদের সীমিত। আন্তর্জাতিক ভেঞ্চার ক্যাপিটাল কোম্পানির সঙ্গে মিলে তহবিল গঠন করলে সফল হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।” অন্যদিকে, ভেঞ্চার ক্যাপিটাল প্রতিষ্ঠান অ্যাঙ্করলেস বাংলাদেশের এমডি রাহাত আহমেদ বলেন, “এই উদ্যোগ দেশের স্টার্টআপ ইকোসিস্টেমের গতিকে আরও ত্বরান্বিত করবে। তবে বিনিয়োগের শর্তগুলো সহজ এবং পেশাদার তহবিল ব্যবস্থাপক থাকা জরুরি।”
সরকারি উদ্যোগে গঠিত স্টার্টআপ বাংলাদেশ লিমিটেড (এসবিএল) এখন পর্যন্ত ৩৭টি স্টার্টআপে ১০৮ কোটি টাকার বেশি অর্থায়ন করেছে। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৫ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত ৯টি স্টার্টআপে ৯ কোটি টাকার বেশি বিনিয়োগ করা হয়েছে। এর আগে ২০২১ সালে স্টার্টআপ খাতের জন্য দুটি তহবিল গঠন করা হয়েছিল। প্রথমটি বাংলাদেশ ব্যাংকের ৫০০ কোটি টাকার পুনঃঅর্থায়ন তহবিল এবং দ্বিতীয়টি ৫২টি তফসিলি ব্যাংকের মুনাফার ১ শতাংশের তহবিল। পরবর্তী তিন বছরে তহবিলে এক হাজার কোটি টাকার বেশি জমা হয়েছে। তবে গত বছর পর্যন্ত স্টার্টআপ কোম্পানিগুলোর মধ্যে বিতরণ করা হয়েছে মাত্র ৩৫ কোটি টাকা।
চালডালের সিইও ওয়াসিম আলিম বলেন, “স্টার্টআপ তহবিলের পর ভেঞ্চার ক্যাপিটাল কোম্পানি গঠনের উদ্যোগ প্রশংসনীয়। তবে সফলতার জন্য প্রয়োজন প্রাথমিক পর্যায়ের স্টার্টআপের ওপর বিশেষ নজর দেওয়া। কারণ তারা অনুকরণীয় উদাহরণ তৈরি করতে পারবে।” ফিন্যান্সিয়াল এক্সিলেন্স ও বিডি ভেঞ্চারের চেয়ারম্যান মামুন রশীদ বলেন, “দেশে কিছু সফল ভেঞ্চার ক্যাপিটাল কোম্পানি ইতিমধ্যেই উঠে এসেছে। তাদেরও যুক্ত করা গেলে ভালো ফল পাওয়া যেতে পারে।”
জানা গেছে, বাংলাদেশ ব্যাংক ও ব্যাংকগুলো মুনাফার অর্থ দিয়ে প্রায় ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা স্টার্টআপ তহবিল গঠন করেছে। একটি স্টার্টআপ এই তহবিল থেকে সর্বোচ্চ ৮ কোটি টাকা পর্যন্ত ঋণ নিতে পারবে, সুদ হবে ৪ শতাংশ। তবে বড় তহবিল থাকলেও এখনো বিনিয়োগ উল্লেখযোগ্য নয়।
সেবা ডট এক্সওয়াইজেডের সিইও আদনান ইমতিয়াজ বলেন, “প্রাথমিক পর্যায়ের বিনিয়োগ এখন শক্তিশালী হলেও সিরিজ এ ও বি পর্যায়ে বড় শূন্যতা রয়ে গেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন ভেঞ্চার ক্যাপিটাল কোম্পানি সেই ঘাটতি পূরণ করতে পারে। তবে সর্বোচ্চ ৮ কোটি টাকার ঋণ সীমা যথেষ্ট নয়।”

