তিন বছর আগে রাজধানীর কাঁটাবন থেকে বিদেশি জাতের একটি বিড়ালছানা কিনেছিলেন ব্যবসায়ী আকবর আলী। স্ত্রী প্রথমে বিরক্ত হলেও এখন ‘নেকো’ নামের সেই বিড়ালের যত্ন নেন তিনিই। মাসে ক্যাট ফুড, মাছ ও মুরগি মিলিয়ে বিড়ালটির পেছনে খরচ হয় প্রায় তিন হাজার টাকা।
আকবর আলী বলেন, ‘‘খিদে পেলে মিষ্টি সুরে ডাকতে থাকে নেকো। লেজ খাড়া করে গা ঘেঁষে চলে। তবে রাগ করলে কাছে আসে না। বাসার সবাই ওকে খুব আদর করে।’ ঢাকার মতো সারা দেশেই এখন বিড়াল পালনের প্রবণতা বেড়েছে। দেশি-বিদেশি জাতের বিড়াল পালনে মানুষ খরচ করছেন খাবারের পেছনে। শুধু রাজধানীর কাঁটাবন নয়, এখন মোহাম্মদপুর, মিরপুর, বনশ্রী, ধানমন্ডি, গুলশান, বনানী, উত্তরা ও জেলা শহরগুলোতে গড়ে উঠেছে পশুপাখির খাবারের দোকান।
আমিনুল ইসলাম দুই বছর ধরে ‘কুসুম’ ও ‘কুট্টুস’ নামে দুটি বিড়াল পালন করছেন। তিনি জানান, মাছ-ভাতই বেশি দেন, তবে মাঝে মাঝে ক্যাট ফুডও দেন। তাঁর এলাকার বাজারেই এখন পশুর খাবারের দোকান রয়েছে। খাতসংশ্লিষ্টদের হিসাবে দেশে এখন বিড়ালের খাবারের বাজার ৫০০ কোটি টাকার। এর মধ্যে দেশীয় উৎপাদন মাত্র ১০০ কোটি টাকা। বাকি ৪০০ কোটি টাকার খাবার আসে আমদানি করে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, করোনার পর থেকে বিড়াল পালনের প্রবণতা বাড়ায় ক্যাট ফুডের বাজার দ্রুত বড় হয়েছে।
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশে ৩২ হাজার ১৫৬ টন ক্যাট ফুড আমদানি হয়েছে। এর মধ্যে চীন থেকে এসেছে ১৭ হাজার ৭৩৮ টন, থাইল্যান্ড থেকে ৭ হাজার ৪১৮ টন এবং তুরস্ক থেকে ৬ হাজার ৭৪০ টন। ফ্রান্স ও ভারত থেকেও সামান্য পরিমাণে আমদানি হয়েছে। সব মিলিয়ে ওই অর্থবছরে ৩ কোটি ২৩ লাখ মার্কিন ডলারের ক্যাট ফুড আমদানি করা হয়েছে। টাকায় এর পরিমাণ প্রায় ৩৯৪ কোটি ১২ লাখ।
রাজধানীর দোকানগুলোতে মাঝারি মানের ক্যাট ফুড প্রতি কেজি ৫০০ থেকে ৭০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। মেও, ক্যাটি বস, ক্যাপ্টেন, জঙ্গল, পাওপাও জনপ্রিয়। তুলনামূলক সস্তা স্মার্ট হার্টের দাম কেজি প্রতি ৩০০ টাকা। বিক্রেতাদের মতে, মেও ও স্মার্ট হার্ট সবচেয়ে বেশি বিক্রি হয়।
খিলগাঁওয়ের মারুফ খান কাঁটাবন থেকে তিন কেজির ক্যাপ্টেন ক্যাট ফুড কিনেছেন ২ হাজার ১৫০ টাকায়। তাঁর তিনটি বিড়াল মাসে দুই প্যাকেট খাবার খেয়ে ফেলে। আরেক ক্রেতা মঞ্জুর হোসেন বলেন, সাত কেজির এক প্যাকেট কিনে আড়াই হাজার টাকা খরচ হয়, তবে তা দিয়ে দুই মাস চলে।
দেশে প্রথমবারের মতো ২০২৪ সালে চঙ্ক নামে একটি প্রতিষ্ঠান ক্যাট ফুড উৎপাদন শুরু করে। তাদের দেড় কেজির প্যাকেট বিক্রি হয় ৫০০ টাকায়। উদ্যোক্তা মো. আসিফ খান বলেন, ‘‘আমাদের প্রতি কেজির দাম ৩৩২ টাকা, যা আমদানিকৃত খাবারের তুলনায় সস্তা। মানও ভালো রাখছি। এক বছরে বাজারে সাড়া মিলেছে।’
এখনো অবশ্য ক্যাট ফুডের বেশির ভাগই আমদানিনির্ভর। প্রায় ২০টি প্রতিষ্ঠান বিদেশ থেকে এসব খাবার আনে। বার্ড প্যালেসের মালিক বাবুল হাওলাদার জানান, করোনার সময় মানুষ বাসায় থাকতে থাকতে প্রাণীপ্রেমী হয়ে ওঠে। তখন থেকেই বাজার হঠাৎ বড় হয়ে যায়। তবে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর বিত্তবান গ্রাহক কিছুটা কমেছে।
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. আবু সুফিয়ান বলেন, ‘‘পোষা প্রাণীর খাবারের দিকে আমাদের আগের মনোযোগ ছিল না। তাই বাজার আমদানিনির্ভর হয়েছে। এখন চাহিদা বাড়ছে, স্থানীয়ভাবে উৎপাদনে অনেকেই আগ্রহ দেখাচ্ছেন।’

