জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর মধ্যে ঋণের বোঝা বহনে শীর্ষে রয়েছে বাংলাদেশ। বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণে দেশের অংশ মাত্র শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ হলেও মাথাপিছু জলবায়ু ঋণ এখন ৭৯ দশমিক ৬ মার্কিন ডলার। স্বল্পোন্নত দেশগুলোর মধ্যে এই ঋণের চাপ অন্যতম বেশি।
গবেষণা বলছে, বাংলাদেশের ঋণ-অনুদান অনুপাত ২ দশমিক ৭। যেখানে এলডিসি গড় মাত্র শূন্য দশমিক ৭। বহুপক্ষীয় উন্নয়ন ব্যাংক থেকে নেওয়া ঋণের অনুপাত শূন্য দশমিক ৯৪, যা বৈশ্বিক গড় শূন্য দশমিক ১৯-এর প্রায় পাঁচ গুণ। গতকাল শনিবার রাজধানীর বনানীর এক হোটেলে ‘ন্যাশনাল ডিসেমিনেশন অব দ্য ক্লাইমেট ডেবট রিস্ক ইনডেক্স (সিডিআরআই) ২০২৫’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে এ তথ্য প্রকাশ করা হয়। অনুষ্ঠানটি আয়োজন করে ‘চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভ’।
প্রতিবেদনে বলা হয়, জলবায়ু অভিযোজন ও প্রশমন খাতে বাংলাদেশের বিনিয়োগ অনুপাত মাত্র শূন্য দশমিক ৪২। যা এলডিসি গড়ের অর্ধেকেরও কম। এতে জলবায়ু সহনশীলতার প্রচেষ্টা বড় ধরনের অর্থ সংকটে পড়ছে। গবেষণা অনুযায়ী, প্যারিস চুক্তির আওতায় প্রতিশ্রুত আন্তর্জাতিক অর্থায়ন এখন ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর জন্য এক ধরনের ‘জলবায়ু ঋণ ফাঁদ’। কারণ এই অর্থায়নের ৭০ শতাংশেরও বেশি ঋণ আকারে আসে। ফলে দেশগুলো একদিকে জলবায়ুঘটিত দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, অন্যদিকে ক্রমবর্ধমান ঋণ শোধের চাপে আবারও ক্ষতির মুখে পড়ে।
২০০০ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত জলবায়ু পরিবর্তনজনিত দুর্যোগে বাংলাদেশে প্রভাবিত হয়েছে ১৩ কোটিরও বেশি মানুষ। আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ এক হাজার ৩৬০ কোটি মার্কিন ডলার। তবুও অভিযোজন খাতে সহায়তা খুবই সীমিত। এ অবস্থায় দেশের পরিবারগুলো নিজেদের অর্থে প্রতিবছর গড়ে মাথাপিছু ১০ হাজার ৭০০ টাকা ব্যয় করছে জলবায়ু বিপর্যয় মোকাবিলায়। যা প্রায় ৮৮ মার্কিন ডলার সমান। সব মিলিয়ে এ ব্যয় দাঁড়ায় বছরে ১৭০ কোটি ডলার।
প্রতিবেদনে সুপারিশ করা হয়, অভিযোজন খাতের কমপক্ষে ৭০ শতাংশ এবং ক্ষয়ক্ষতি খাতের শতভাগ অর্থ অনুদান হিসেবে দিতে হবে। অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক ক্ষেত্র ছাড়া ঋণ গ্রহণযোগ্য নয়। জলবায়ু ঋণ বাতিল করতে হবে এবং প্রকৃতি ও জলবায়ু সুরক্ষার বিনিময়ে ঋণ মওকুফ কার্যক্রম বাড়াতে হবে। স্থানীয় সরকার, পৌরসভা ও কমিউনিটিকে সরাসরি অর্থায়ন নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি অনুদান বৃদ্ধি, অভিযোজন খাতে ভারসাম্য আনা, জীবাশ্ম জ্বালানিতে ভুল বরাদ্দ বন্ধ ও দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তনের জন্য দেশীয় প্ল্যাটফর্মকে সমর্থন করার আহ্বান জানানো হয়। কার্বন প্রাইসিং ও লেনদেন শুল্কের মাধ্যমে বৈশ্বিক অনুদান ব্যবস্থা গড়ার প্রস্তাব করা হয়। এছাড়া বাংলাদেশ ক্লাইমেট চেঞ্জ ট্রাস্ট ফান্ডকে ‘বাংলাদেশ ন্যাচারাল রাইটস ফান্ডে’ রূপান্তরের সুপারিশ করা হয়।
অনুষ্ঠানে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. ফারহিনা আহমেদ বলেন, জীববৈচিত্র্য রক্ষা করা গেলে জলবায়ুর প্রভাব কমানো সম্ভব কিন্তু কপ সম্মেলনের মতো বৈশ্বিক ফোরামে কার্যকর ফল কম। এতে ঝুঁকি থেকেই যায়। তিনি আরও বলেন, আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের রায়ে অসম কার্বন নিঃসরণের প্রশ্নে বাংলাদেশকে ভূমিকা রাখতে হবে। জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনা ও এনডিসি বাস্তবায়নকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের মহাপরিচালক ড. একে ইনামুল হক বলেন, অনুদান সীমিত এবং ঋণের ঝুঁকি বেশি হওয়ায় বাংলাদেশ গভীর সংকটে আছে। বেসরকারি খাতে অতিনির্ভরতা আর্থিক চাপ বাড়াচ্ছে। চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভের প্রধান নির্বাহী এম জাকির হোসেন খান বলেন, দৃঢ় অঙ্গীকার ও কার্যকর শাসন না থাকলে কপ২৯-এ ঘোষিত এক বিলিয়ন ডলারের ‘ক্লাইমেট ফাইন্যান্স অ্যাকশন ফান্ড’ কাগুজে প্রতিশ্রুতি হয়ে থাকবে।
ঢাকায় সুইডেন দূতাবাসের ফার্স্ট সেক্রেটারি নায়োকা মার্টিনেজ ব্যাকস্ট্রম বলেন, জলবায়ু অর্থায়ন হতে হবে জবাবদিহিমূলক, ন্যায্য ও ন্যায়সংগত রূপান্তরের জন্য। শুধু অনুদান নয়, নতুন অর্থের উৎসও খুঁজতে হবে।
এছাড়া অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের যুগ্ম সচিব ড. কাজী শাহজাহান, বিএনপি চেয়ারপারসনের বিশেষ সহকারী ড. সাইমন পারভেজ, পিকেএসএফের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. ফজলে রাব্বি সাদেক আহমেদ, সুইজারল্যান্ড দূতাবাসের কো-অপারেশন অফিসার শিরিন লিরা এবং গ্রিনপিস দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার গ্রিনস্পিকার ফারিয়া হোসাইন ইকরা প্রমুখ।

