বাংলাদেশের ব্যাংক খাতের বাড়তে থাকা খেলাপি ঋণ ও কমে যাওয়া রাজস্ব আদায় নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। সংস্থাটি এখন আর আগের মতো নির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে কঠোর অবস্থানে না থাকলেও খেলাপি ঋণ কমাতে সরকারের কাছ থেকে স্পষ্ট ও কার্যকর পরিকল্পনা চেয়েছে। একই সঙ্গে কর-জিডিপি অনুপাত বাড়াতে আগামী বাজেটে কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হবে, সেটিও জানতে চেয়েছে তারা।
২০২৩ সালে আইএমএফের ঋণ কর্মসূচি চালুর সময় শর্ত ছিল, ২০২৬ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে খেলাপি ঋণ ১০ শতাংশের নিচে নামিয়ে আনতে হবে। কিন্তু পরবর্তী সময়ে ব্যাংক খাতের প্রকৃত পরিস্থিতি সামনে আসতে শুরু করলে চিত্র বদলে যায়। ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ খেলাপি ঋণ ৩০ শতাংশ ছাড়িয়ে যায়। এ অবস্থায় বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে আইএমএফ আগের লক্ষ্য শিথিল করলেও সমস্যা সমাধানে দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখতে চাইছে।
সম্প্রতি ওয়াশিংটনে অনুষ্ঠিত আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের বসন্তকালীন বৈঠকে বিষয়গুলো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। সেখানে বাংলাদেশের প্রতিনিধি দলে ছিলেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমান এবং সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারা।
ঋণ কর্মসূচির আলোচনার সঙ্গে যুক্ত এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, খেলাপি ঋণ কমানো ও রাজস্ব আয় বাড়ানোর বিষয়ে বাংলাদেশ আইএমএফকে লিখিত পরিকল্পনা দেবে। এর আগে খেলাপি ঋণ বেড়ে যাওয়ার পেছনের কারণও ব্যাখ্যা করা হয়েছে। বিশেষ করে নীতিগত শিথিলতার আড়ালে লুকিয়ে থাকা ঋণকে প্রকৃত হিসাবের আওতায় আনার বিষয়টি আইএমএফ ইতিবাচকভাবে দেখেছে।
২০২৪ সালের আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে আইএমএফের ঋণ কর্মসূচির পরিমাণ বাড়ানো হয়। ২০২৫ সালের জুনে কর্মসূচির আকার ৮০ কোটি ডলার বাড়িয়ে মোট ৫৫০ কোটি ডলারে উন্নীত করা হয়। এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ পাঁচ কিস্তিতে ৩৬৪ কোটি ডলার পেয়েছে। আরও তিন কিস্তিতে পাওয়ার কথা রয়েছে ১৮৬ কোটি ডলার। এর মধ্যে আগামী জুনের মধ্যে দুই কিস্তিতে ১৩০ কোটি ডলার ছাড়ের কথা থাকলেও তা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এক নীতিনির্ধারক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, খেলাপি ঋণ সর্বোচ্চ অবস্থানে পৌঁছানোর পর ধীরে ধীরে কমতে শুরু করেছে। আইএমএফকে জানানো হবে কীভাবে এই প্রবণতা আরও নিচে নামানো হবে। এজন্য ঋণখেলাপিদের দেশি-বিদেশি সম্পদ জব্দ, আইন প্রয়োগের মাধ্যমে আদায় জোরদার, সমঝোতার ভিত্তিতে ঋণ পুনরুদ্ধার এবং বন্ধ শিল্পকারখানা পুনরায় চালুর মতো পদক্ষেপ তুলে ধরা হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের সেপ্টেম্বরে খেলাপি ঋণ বেড়ে ৩৫ দশমিক ৭৩ শতাংশে পৌঁছায়। পরে ডিসেম্বর শেষে তা কমে ৩০ দশমিক ৬০ শতাংশে নামে। চলতি বছরের মার্চ প্রান্তিকে এটি ২৫ শতাংশের নিচে নেমে আসতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে। তবে একীভূত হওয়া পাঁচটি ব্যাংক বাদ দিলে খেলাপি ঋণ ইতোমধ্যে ২৫ শতাংশের নিচে নেমেছে।
ডিসেম্বর পর্যন্ত একীভূত পাঁচ ব্যাংকের মোট ঋণের পরিমাণ ছিল ১ লাখ ৯৬ হাজার ৮২৭ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি হয়েছে ১ লাখ ৬৫ হাজার ৭৮১ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৮৪ দশমিক ২৩ শতাংশ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ব্যাংক খাতের চলমান সংস্কার কর্মসূচি নিয়েও আইএমএফের সঙ্গে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। ব্যাংক রেজল্যুশন আইনে নতুন ধারা যুক্ত করার পরিকল্পনাও সংস্থাটিকে জানানো হবে।
অন্যদিকে রাজস্ব খাতে পিছিয়ে পড়া নিয়েও উদ্বিগ্ন আইএমএফ। কর-জিডিপি অনুপাত বাড়াতে করের আওতা সম্প্রসারণ, করদাতাদের তথ্য যাচাই এবং পরীক্ষামূলক নিরীক্ষা কার্যক্রমের মতো উদ্যোগের কথা তুলে ধরবে সরকার। একই সঙ্গে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় বিভিন্ন কার্ড ইস্যুর যৌক্তিকতাও ব্যাখ্যা করা হবে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, চলমান ৫০০ কোটি ডলারের ঋণ কর্মসূচির পাশাপাশি আইএমএফ থেকে আরও ২০০ কোটি ডলার এবং বিশ্বব্যাংক থেকে ১০০ কোটি ডলার ঋণ পাওয়ার চেষ্টা করছে বাংলাদেশ। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে সৃষ্ট বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চাপ মোকাবিলায় আইএমএফের ৫ হাজার কোটি ডলার ও বিশ্বব্যাংকের ২ হাজার ৫০০ কোটি ডলারের জরুরি সহায়তা প্যাকেজ থেকে এই অর্থ চাওয়া হয়েছে।
সরকারের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তারা মনে করছেন, আইএমএফের চলমান কর্মসূচি সচল রাখা এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ কোনো কারণে এই কর্মসূচি বাতিল হলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নেতিবাচক বার্তা যেতে পারে। এতে দেশের ঋণমান কমে যাওয়ার ঝুঁকি যেমন বাড়বে, তেমনি বিদেশি ব্যাংকের ক্রেডিট লাইনসহ বিভিন্ন আর্থিক খাতে জটিলতা তৈরি হতে পারে। এ কারণেই আইএমএফ কর্মসূচি অব্যাহত রাখাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। তবে পরবর্তী কিস্তি ছাড় নিয়ে অনিশ্চয়তা এখনও পুরোপুরি কাটেনি।
২০২৩ সালের জানুয়ারিতে বাংলাদেশের সঙ্গে আইএমএফের ৪৭০ কোটি ডলারের ঋণ কর্মসূচি শুরু হয়। তার আগে ২০২২ সালে সংস্থাটি কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত দেয়। এর মধ্যে অন্যতম ছিল ধাপে ধাপে খেলাপি ঋণ কমিয়ে আনা। সে অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুনের মধ্যে বেসরকারি ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ৫ শতাংশের নিচে এবং সরকারি ব্যাংকের খেলাপি ১০ শতাংশের নিচে নামানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল।
একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী খেলাপি ঋণের হিসাব পদ্ধতি চালু এবং সব ধরনের নীতিগত শিথিলতা তুলে দেওয়ার শর্তও দেওয়া হয়। যদিও ২০২২ সালের ডিসেম্বর শেষে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ দেখানো হয়েছিল মাত্র ৮ দশমিক ১৬ শতাংশ। তখন বেসরকারি ব্যাংকে এই হার ছিল ৫ দশমিক ১৩ শতাংশ এবং রাষ্ট্রীয় বাণিজ্যিক ব্যাংকে ২০ দশমিক ২৮ শতাংশ।

