সমাজের নানা আর্থিক, রাজনৈতিক ও পারিবারিক সংকটে প্রায় ৪৬ শতাংশ মানুষ ভবিষ্যৎ নিয়ে আশা হারিয়েছেন। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষ। ঘুষ কমলেও হয়রানির শিকাররা বলছেন, ৭৪ শতাংশ ক্ষেত্রে টাকা ছাড়া কোনো কাজ এগোয় না।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) সাম্প্রতিক জরিপে এই চিত্র উঠে এসেছে। গতকাল সোমবার রাতে ভার্চ্যুয়াল আলোচনায় ‘পরিবার পর্যায়ে মনস্তাত্ত্বিক অবস্থান’ শীর্ষক গবেষণার ফল প্রকাশ করা হয়। মে মাসে দেশের ৮ হাজার ৬৭টি খানার মধ্যে এই জরিপ পরিচালনা করা হয়। প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান হোসেন জিল্লুর রহমান।
জরিপে দেখা যায়, প্রায় ২০ শতাংশ মানুষ আর্থিক সংকটে আছেন। এর মধ্যে ৬৭ শতাংশ চিকিৎসা ব্যয় এবং ২৭ শতাংশ ঋণ পরিশোধের চাপ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন। সরকারি কার্যালয় ও স্থানীয় সরকারের সংস্থায় ঘুষ কমলেও হয়রানির মাত্রা বাড়ছে। জরিপে দেখা যায়, হয়রানির শিকার ৭৪ শতাংশ মানুষ মনে করেন টাকা ছাড়া কোনো কাজ হয় না। সরকারি সেবা নিতে হয়রানির শিকার হচ্ছেন ৭১ শতাংশ এবং স্বাস্থ্যসেবায় প্রায় ৪৯ শতাংশ মানুষ।
প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষ দ্রব্যমূল্য নিয়ে চিন্তিত। সন্তানের শিক্ষা নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন ৬৫ শতাংশ। কিশোর অপরাধ নিয়ে চিন্তিত ৫৫ শতাংশ এবং মাদক নিয়ে উদ্বিগ্ন ৫৬ শতাংশ। ব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষায় ৫৩ শতাংশ মানুষ সামাজিক সম্মানকে প্রাধান্য দিয়েছেন। অর্থনৈতিক উন্নতি ও স্বাস্থ্যসেবার উন্নতিও তারা চান। রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষায় ৫৬ শতাংশ মানুষ দুর্নীতি প্রতিরোধকে গুরুত্ব দিয়েছেন। নানা সংকটে ৪৬ শতাংশ মানুষ আশা হারালেও ৫৪ শতাংশ এখনো লড়াই ছাড়তে নারাজ।
সাবেক রাষ্ট্রদূত এম হুমায়ুন কবির বলেন, রাষ্ট্র কাঠামোগতভাবে অপ্রাতিষ্ঠানিক রূপে গড়ে উঠেছে। সংগঠিতরা সুবিধা পাচ্ছে, অসংগঠিতরা বঞ্চিত হচ্ছে। এখন অর্থ উপার্জন যেকোনো উপায়ে মানুষের প্রধান লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষক আলতাফ পারভেজ প্রশ্ন তোলেন, এত বড় পরিবর্তনের পরও কেন ৪৬ শতাংশ মানুষ ভরসা রাখতে পারছে না। তার মতে, নারী ও সংখ্যালঘুদের ভয় বাড়ছে, শিক্ষাব্যবস্থা গুমোট এবং কর্মসংস্থানের অভাব সমাজে হতাশা বাড়াচ্ছে।
জর্জিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটির গবেষক আসিফ বিন আলী মনে করেন, তরুণদের বড় অংশ এখন আশাহীন। জুলাইয়ে তাদের ক্ষোভ আরও বাড়তে পারে এবং সেটা সব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধেই গিয়ে পড়তে পারে। এতে ধর্মীয় বা রাজনৈতিক চরমপন্থা মাথাচাড়া দিতে পারে।
ঢাকা ইনস্টিটিউট অব রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালিটিকসের গবেষক ভূঁইয়া মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান বলেন, তরুণদের ক্ষোভ বাড়লেও এতে প্রতিষ্ঠান দুর্বল হবে না। কারণ প্রতিষ্ঠানগুলোর অপ্রাতিষ্ঠানিক পরিচালনা পদ্ধতিই ক্ষোভের মূল কারণ। শহরে ভাসমান মানুষের উপস্থিতি বেশি হওয়ায় হয়রানিও সেখানে বেশি।
সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, মানুষের বড় অংশ আশাহীন হওয়া হতাশাজনক। কেন এত দ্রুত তাদের আশা ভেঙে গেল, তা গভীরভাবে ভেবে দেখা জরুরি। অনুষ্ঠানে জানানো হয়, এই জরিপ প্রতিবছর পরিচালনা করা হবে।

