দীর্ঘ কয়েক বছরের টানাপোড়েন আর জটিল আলোচনার পর অবশেষে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য সম্পর্ক নতুন এক মোড় নিতে চলেছে। দু’দেশের মধ্যে ট্যারিফ সংক্রান্ত বিষয়ে বড় অগ্রগতি ঘটেছে—যা এখন পূর্ণাঙ্গ বাণিজ্য চুক্তির দিকেই ইঙ্গিত দিচ্ছে।
বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষস্থানীয় ব্যাংক জেপি মর্গানের প্রধান নির্বাহী জেমি ডিমন জানান, মার্কিন প্রশাসনের একজন উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তা তাকে জানিয়েছেন—ওয়াশিংটন ও নয়াদিল্লি এক ঐতিহাসিক সমঝোতার খুব কাছাকাছি। তাঁর ভাষায়, “এটি হলে দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক এক নতুন যুগে প্রবেশ করবে।”
যদিও সাক্ষাৎকারে আরও কিছু তথ্য তিনি ‘অফ দ্য রেকর্ড’ রেখেছিলেন, তাঁর ইঙ্গিতই যথেষ্ট ছিল বিশ্ববাজারে আলোচনার ঢেউ তোলার জন্য।
হোয়াইট হাউসে দীপাবলির আলাপ
এই সাক্ষাৎকারের অল্প কিছুদিন পর, ২১ অক্টোবর হোয়াইট হাউসে আয়োজিত দীপাবলি উদ্যাপনে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানান, সদ্যই তাঁর সঙ্গে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির টেলিফোনে কথা হয়েছে। আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু ছিল দুটি বিষয়—দুই দেশের বাণিজ্য সম্পর্ক ও রাশিয়া থেকে ভারতের তেল আমদানি কমানোর পরিকল্পনা।
সেই সময় ট্রাম্পের পাশে ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত ভারতীয় রাষ্ট্রদূত বিনয় মোহন কওয়াত্রা। অনুষ্ঠান শেষে মোদি এক্স (টুইটার)-এ লিখেছিলেন, ট্রাম্প তাঁকে দীপাবলির শুভেচ্ছা জানিয়েছেন এবং তিনি আশা করেন, “বিশ্বের দুই বৃহৎ গণতন্ত্র একসঙ্গে পৃথিবীকে আশার আলোয় ভরিয়ে তুলবে।” যদিও মোদি সরাসরি বাণিজ্য প্রসঙ্গে কিছু বলেননি, তাঁর বক্তব্যে সহযোগিতার সুর ছিল স্পষ্ট।
ট্যারিফ কমানোর পথে অগ্রগতি
পরদিন, ২২ অক্টোবর ভারতের প্রভাবশালী অর্থনৈতিক দৈনিক দ্য মিন্ট জানায়—ওয়াশিংটন খুব শিগগিরই ভারতের ওপর আরোপিত ৫০ শতাংশ ট্যারিফ কমিয়ে ১৫–১৬ শতাংশে নামিয়ে আনতে পারে। সূত্রমতে, পরিকল্পনা অনুযায়ী সব কিছু এগোলে এ মাসের শেষ দিকে মালয়েশিয়ায় আয়োজিত আসিয়ান শীর্ষ সম্মেলনের মঞ্চেই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও প্রধানমন্ত্রী মোদি এই ঐতিহাসিক চুক্তি ঘোষণা করতে পারেন।
তবে মোদি ব্যক্তিগতভাবে সেই সম্মেলনে যোগ দেবেন কি না, তা এখনও নিশ্চিত নয়। দিল্লির কূটনৈতিক মহলে ধারণা—চূড়ান্ত ঐকমত্য হলে তিনিও উপস্থিত থাকতে পারেন।
এদিকে দ্য মিন্ট-এর প্রতিবেদন প্রকাশের পর থেকেই ভারতের শেয়ারবাজারে ইতিবাচক সাড়া দেখা দিয়েছে। বৃহস্পতিবার সকালেই মুম্বাই স্টক এক্সচেঞ্জে সূচক বেড়ে যায় প্রায় ৮০০ পয়েন্ট—যা এক নতুন রেকর্ডের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
রাশিয়ার তেলই মূল ‘বাধা’
মার্কিন ট্যারিফের অর্ধেকই রাশিয়া থেকে ভারতের ক্রুড অয়েল আমদানিকে লক্ষ্য করে আরোপিত হয়েছিল, বাকিটা ছিল পাল্টা শুল্কের প্রতিক্রিয়া। ফলে ওয়াশিংটনের শর্ত পূরণ করতে হলে ভারতকে রাশিয়ার তেল আমদানি কমাতেই হবে।
দিওয়ালির অনুষ্ঠানে ট্রাম্প বলেন, “এইমাত্র মোদিজির সঙ্গে কথা হলো—তিনি বলেছেন, রাশিয়া থেকে এখন খুব বেশি তেল কিনবেন না। আমরা দুজনেই চাই যুদ্ধটা শেষ হোক।”
আগে যেখানে ট্রাম্প কঠোরভাবে বলেছিলেন, “ভারতকে রাশিয়ার তেল কেনা বন্ধ করতে হবে,” সেখানে তাঁর সাম্প্রতিক মন্তব্যকেই অনেকে দেখছেন নীতি নরম করার ইঙ্গিত হিসেবে।
অন্যদিকে, নয়াদিল্লির অবস্থানও স্পষ্ট—ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। যেখানে সুলভ দামে তেল পাওয়া যাবে, সেখান থেকেই আমদানি চলবে। তবে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে রাশিয়ার তেল আগের মতো সস্তা না থাকায় সেই সুবিধা অনেকটাই কমে এসেছে।
দ্য মিন্ট জানিয়েছে, ভারতীয় কর্মকর্তারা সম্প্রতি মস্কো সফরে গিয়ে রাশিয়াকে জানিয়েছেন—তেল আমদানি কমাতে তাঁরা বাধ্য হচ্ছেন। তবে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ঘাটতি পূরণ করতে চাইলে আমেরিকান তেলের দামেও ছাড় দরকার, যা ওয়াশিংটন এখনো দিতে রাজি হয়নি।
সম্ভাব্য চুক্তির কাঠামো
ভারত–আমেরিকা বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে আলোচনা চলছে বহু বছর ধরে। একাধিকবার ঘোষণার তারিখ পিছিয়েছে। মূল বাধা ছিল যুক্তরাষ্ট্রের দাবি—ভারতকে তাদের কৃষি, দুগ্ধ ও জেনেটিক্যালি পরিবর্তিত খাদ্যপণ্যের বাজার খুলে দিতে হবে।
কিন্তু দিল্লির মতে, এতে ভারতের কৃষকরা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন। মোদি নিজেও বারবার বলেছেন, “কৃষকের স্বার্থের সঙ্গে আপস করে কোনো বাণিজ্য চুক্তি হবে না।”
তবে সূত্র বলছে, কিছু বিষয়ে ভারত এখন নমনীয় হয়েছে। যেমন, যুক্তরাষ্ট্রের নন-জিএম (অপরিবর্তিত জিনগত) কর্ন ও সয়ামিল আমদানির কোটা পাঁচ লাখ টন থেকে বাড়ানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
চীনের বাজারে আমেরিকান পণ্যের চাহিদা কমে যাওয়ায় যুক্তরাষ্ট্র নতুন বাজার খুঁজছে—এবং ভারত সেই সুযোগ তৈরি করছে। একইসঙ্গে ভারতের অভ্যন্তরে পোলট্রি ফিড, দুগ্ধজাত খাদ্য ও ইথানলের মতো পণ্যের চাহিদাও দ্রুত বাড়ছে, যা এই সিদ্ধান্তকে অর্থনৈতিকভাবে যৌক্তিক করছে।
তবে মার্কিন দুধ ও চিজজাত পণ্যের ওপর ভারতের উচ্চ শুল্ক কমানো হবে কি না, তা এখনো অনিশ্চিত।
চীন–যুক্তরাষ্ট্র টানাপোড়েন, ভারতের জন্য সুযোগ
আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিশেষজ্ঞ ও গ্লোবাল ট্রেড রিসার্চ ইনস্টিটিউট-এর প্রতিষ্ঠাতা অজয় কুমার শ্রীবাস্তবের মতে, এই সম্ভাব্য চুক্তির পেছনে চীনের ভূমিকাও পরোক্ষভাবে কাজ করছে।
“চীন যেমন রেয়ার আর্থ রপ্তানিতে সীমাবদ্ধতা এনেছে, তেমনি যুক্তরাষ্ট্র–চীন বাণিজ্য উত্তেজনাও ক্রমেই বাড়ছে,” তিনি বলেন। “এই অবস্থায় ওয়াশিংটন নতুন সরবরাহ শৃঙ্খল গঠনের জন্য বিকল্প অংশীদার খুঁজছে—আর ভারত সেই জায়গায় সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য সহযোগী হয়ে উঠছে।”
তিনি আরও যোগ করেন, শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র হয়তো ভারতকে ১৬–১৮ শতাংশ ট্যারিফ শ্রেণিতে ফেলবে—যা ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও জাপানের চেয়ে সামান্য বেশি হলেও ভিয়েতনামের তুলনায় কম, অর্থাৎ এক ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান।
যদিও আনুষ্ঠানিক ঘোষণা এখনও বাকি, কিন্তু সব দিক থেকেই বোঝা যাচ্ছে—দুই বৃহৎ গণতন্ত্রের সম্পর্ক নতুন উচ্চতায় উঠতে চলেছে। যদি সব পরিকল্পনা সফল হয়, তবে মালয়েশিয়ার আসিয়ান সম্মেলনের মঞ্চ থেকেই শুরু হতে পারে ভারত–যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যিক বন্ধনের এক নতুন অধ্যায়।

