অনলাইন কেনাকাটায় সময় ও শ্রম দুটোই সাশ্রয় হয়। তাই ব্যস্ত জীবনযাত্রায় এর জনপ্রিয়তা দিন দিন বাড়ছে। ক্রেতার সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় অনলাইন বাজারও সম্প্রসারিত হচ্ছে। সরকারের নজরদারি বেড়েছে, তবে প্রতারিত হওয়ার ঝুঁকি এখনও কমেনি। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, আরও কঠোর নজরদারি এবং কার্যকর নীতি সহায়তা প্রয়োজন।
তরুণ-তরুণীরা অনলাইন ব্যবসায় বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছেন। শুধু দেশে নয়, বিশ্বব্যাপীতেও অনলাইন কেনাকাটার জনপ্রিয়তা বাড়ছে। যারা দোকানে বেচাকেনা করেন, তারা এখন একই সঙ্গে অনলাইনেও ওয়েবসাইট খুলে ব্যবসা চালাচ্ছেন। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, নীতি সহায়তা ও কঠোর আইনি পদক্ষেপ নিলে ক্রেতার আস্থা বাড়বে। এতে ব্যবসাও দ্রুত সম্প্রসারিত হবে এবং এর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে দেশের অর্থনীতিতে। তবে এই বাজারের কিছু সমস্যা রয়েছে। পণ্যের গুণমান যাচাই করা অনেক সময় কঠিন হয়। এছাড়া অনলাইন প্রতারণা ও তথ্য চুরির ঝুঁকিও থাকে।
অনলাইনে পণ্য বিক্রির বিজ্ঞাপনও প্রচলিত। সেলবাজার, বিক্রয় ডটকমের মতো ওয়েবপোর্টালগুলোতে বিক্রেতারা পুরোনো পণ্যের বিজ্ঞাপন দেন। আগ্রহী ক্রেতারা সেই বিজ্ঞাপন দেখে সরাসরি বিক্রেতার সঙ্গে যোগাযোগ করেন। সাধারণত নগদ অর্থ পরিশোধ করতে হয়। কিছু প্রতিষ্ঠান পণ্যের মূল্যের ওপর বড় অঙ্কের ছাড় দেখিয়ে বিজ্ঞাপন দেয়।
অর্থনীতির বিশ্লেষক সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন বলেন, মানুষ অনলাইনে কেনাকাটা করছে মূলত তিনটি কারণে—সময়ের স্বল্পতা, অবস্থানগত সুবিধা এবং পণ্যের বৈচিত্র্য ও প্রকরণ। বিগত কয়েক বছরে অনলাইনে কেনাকাটা বহুগুণ বেড়েছে। দেশে বর্তমানে ছয় হাজারের বেশি ‘সেলার রেটিংসহ’ সক্রিয় অনলাইন সাইট রয়েছে। তবে অনেক অনলাইন শপ তাদের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করছে না এমন অভিযোগও রয়েছে।
বাংলাদেশের জনপ্রিয় অনলাইন শপিং ওয়েবসাইটের মধ্যে দারাজ অন্যতম। এখানে ইলেকট্রনিক্স, ফ্যাশন, গৃহস্থালির সরঞ্জামসহ নানা পণ্য পাওয়া যায়। প্রায় সব ধরনের পণ্যের জন্য পরিচিত আরেকটি প্ল্যাটফর্ম হলো আজকেরডিল। প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের প্ল্যাটফর্ম অথবা ডট কম জনপ্রিয়। মুদি ও দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় জিনিস কেনার জন্য চালডাল ডট কম জনপ্রিয়। ইলেকট্রনিক্স পণ্যের জন্য পিকাবু পরিচিত। ঐতিহ্যবাহী ও হস্তশিল্পের জন্য আড়ং অনলাইন স্টোর বিখ্যাত। সুপারশপ চেইন স্বপ্ন-এর অনলাইন স্টোরও জনপ্রিয়। বিশ্বব্যাপী প্ল্যাটফর্ম অ্যামাজন এবং আমেরিকার ওয়ালমার্টও দেশে ক্রেতাদের কাছে পরিচিত।
নারী উদ্যোক্তাদের সংগঠন ওয়েবের প্রতিষ্ঠাতা সভানেত্রী নাসরিন আউয়াল মিন্টু জানান, সড়কে যানজট ও শপিং সেন্টারের ভিড়ের কারণে অনলাইন কেনাকাটাই এখন প্রথম পছন্দ। বিভিন্ন ব্র্যান্ডের অথেনটিক শপ, পণ্যের গুণগত মান বজায় রাখার ব্র্যান্ডের প্রতিশ্রুতি এবং উন্নত গ্রাহকসেবা ক্রেতাদের আকৃষ্ট করছে। তবে অনলাইনে প্রতারণা ও ভুয়া বিক্রেতার ঝুঁকিও রয়েছে। এজন্য ক্রেতাদের সচেতন ও সতর্ক থাকার পরামর্শ দেন সংশ্লিষ্টরা।
একটি বেসরকারি ব্যাংকের নারী কর্মকর্তা শাহনাজ বেগম বলেন, ঢাকা শহরের যানজট এড়াতে এবং সময় স্বল্পতার কারণে অনলাইনে কেনাকাটা করা হয়। ডিজিটাল পেমেন্টের সুবিধা যেমন বিকাশে টাকা দিয়ে পার্সেল বাড়িতে পৌঁছলেই গ্রহণ করা যায়। অনেক সময় জিনিস দেখে কিনতে গেলে অফিসের মধ্যে পার্সেল দিয়ে নেওয়া যায়। এছাড়া বিভিন্ন অফার ও ডিসকাউন্টও অনলাইন কেনাকাটার আগ্রহ বাড়াচ্ছে।
অনলাইন কেনাকাটার সুবিধা বাড়ছে। ক্রেতারা ইন্টারনেট থেকে পণ্য কিনে বিস্তারিত দেখে সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন। ক্যাশ অন ডেলিভারির সুবিধায় বাসায় বসে পণ্য যাচাই করে দাম পরিশোধ করা যায়। ডিজিটাল পেমেন্ট করলে আরও ক্যাশব্যাকও পাওয়া যায়। তাই অনেকের কাছে অনলাইন কেনাকাটা এখন নিরাপদ ও সুবিধাজনক। তবে সমস্যা আছে। অনলাইনে অর্ডার দিয়ে অনেক সময় কাঙ্ক্ষিত পণ্য পাওয়া যায় না। কম মূল্যের প্রলোভনে শুধু ছবি দেখে অর্ডার নিশ্চিত করলে, ডেলিভারি সময় অনেকেই হতাশ হন। অনলাইন প্রতারণা হলে দ্রুত প্রমাণ সংগ্রহ করা জরুরি। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর বা পুলিশের কাছে অভিযোগ জানানো যেতে পারে। অভিযোগপত্র জমা দেওয়া, হটলাইনে যোগাযোগ করা বা দেওয়ানি ও ফৌজদারি আদালতে মামলা করার সুযোগ রয়েছে।
অনেক অনলাইন বিক্রেতার নির্দিষ্ট দোকান বা অফিস না থাকায় অভিযোগ করার পরও ফলাফল পাওয়া কঠিন। অনেক প্রতিষ্ঠান অগ্রিম অর্থ নিয়ে পণ্য সময়মতো সরবরাহ করে না। “পণ্য শেষ হয়ে গেছে”, “সময় লাগবে”—এরকম অজুহাতের কারণে ক্রেতারা অর্থ ফেরত পান না। ফলে অনেক ক্রেতা নিয়মিত ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক রিফাত রশিদ বলেন, অনলাইন ব্যবসার সম্প্রসারণে স্বচ্ছতা এবং সঠিক নীতিমালা অপরিহার্য। নীতিমালা কঠোরভাবে মানা হলে ভোক্তার আস্থা বাড়বে এবং দেশের অর্থনীতি সচল থাকবে।
জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর কঠোর অবস্থান নিয়েছে। বাড়তি ছাড়ের প্রলোভনে কেউ প্রতারণা করতে না পারে, তা নিশ্চিত করা হচ্ছে। মিথ্যা তথ্য দিয়ে পণ্য বিক্রি করলে অনলাইন বিক্রেতাকে দুই বছরের কারাদণ্ড, অনাদায়ে ১০ লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ড দেওয়া হবে। নির্ধারিত সময়ে পণ্য বা সেবা না দিলে মূল্যের কয়েক গুণ জরিমানা আরোপ করা হবে। নিষিদ্ধ পণ্য বিক্রির ক্ষেত্রেও বড় অঙ্কের জরিমানা আছে।
বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমান জানান, ই-কমার্স খাতের বিকাশ এবং শৃঙ্খলা রক্ষার জন্য অধ্যাদেশ প্রণয়ন করা হয়েছে। বিশেষ কর্তৃপক্ষ ডিজিটাল বাণিজ্যের প্রসার, শৃঙ্খলা রক্ষা, বাণিজ্য-বিরোধ নিষ্পত্তি এবং অপরাধ প্রতিরোধ তদারকি করবে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, ডিজিটাল কোম্পানি বা ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানে টাকা জমা দিয়ে পণ্য না পাওয়ার কারণে দেশের হাজার হাজার গ্রাহক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। ২০২১-২২ সালে পণ্য না পাওয়ায় অনেকেই মিছিল, সমাবেশ ও রাস্তা অবরোধ পর্যন্ত করেছেন। এসব বিবেচনায় অধ্যাদেশ প্রণয়ন করা হয়েছে।

