আধুনিক অর্থনীতিতে বড় আকারের প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য যৌথ অর্থায়ন বা সিন্ডিকেশন ফাইন্যান্সিং এখন অপরিহার্য কৌশল হিসেবে স্বীকৃত। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বড় অবকাঠামো ও শিল্প প্রকল্পগুলোর জন্য যে পরিমাণ মূলধন প্রয়োজন, একক ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের পক্ষে তা একা বহন করা প্রায় অসম্ভব।
এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্যই সিন্ডিকেশন ফাইন্যান্সিং বা যৌথ অর্থায়ন দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। এতে একাধিক ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান মিলিত হয়ে প্রকল্পের জন্য প্রয়োজনীয় তহবিল যোগান দেয়। ফলস্বরূপ, কোনো একক প্রতিষ্ঠানের ঝুঁকি কমে যায় এবং বড় প্রকল্পগুলো দ্রুত ও কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন সম্ভব হয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বড় প্রকল্পের দ্রুত বাস্তবায়ন ও সঠিক ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার জন্য সিন্ডিকেশন ফাইন্যান্সিং একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হিসেবে বিবেচিত হবে।
সিন্ডিকেটেড ফাইন্যান্সিং: সংজ্ঞা ও প্রাসঙ্গিকতা
সিন্ডিকেশন ফাইন্যান্সিং বা যৌথ অর্থায়ন বলতে বোঝায়, যখন একাধিক ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান সম্মিলিতভাবে একটি ঋণগ্রহীতাকে পূর্বনির্ধারিত শর্তাবলির অধীনে অর্থায়ন করে। বাংলাদেশে শিল্প খাতের উন্নয়নে এ পদ্ধতির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, বিশেষ করে যখন প্রকল্পের আকার বৃহদায়তন হয়, ঝুঁকি বণ্টনের প্রয়োজন দেখা দেয়, বিশেষায়িত জ্ঞানের প্রয়োজন হয় কিংবা অর্থায়নের পরিমাণ কোনো একক প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতার বাইরে চলে যায়।
সিন্ডিকেটেড ফাইন্যান্সিংয়ের বৈশিষ্ট্যগুলো
একটি অর্থায়নকে সিন্ডিকেটেড ফাইন্যান্সিং হিসেবে আখ্যায়িত করতে হলে কিছু মৌলিক বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান থাকতে হয়। যেমন— (ক) বহু ঋণদাতার অংশগ্রহণ: সাধারণত ৫-১০টি বা ততোধিক ব্যাংক/ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান (এনবিএফআই) যৌথভাবে ঋণ প্রদান করে। (খ) সমমানের শর্তাবলি: সব ঋণদাতার জন্য ঋণের একই রকম শর্তাবলিসহ সুদের হার ও জামানতের ধরন অভিন্ন থাকে। (গ) একই রকম আইনি দলিল: সব পক্ষ একই আইনি দলিলে আবদ্ধ হয়। (ঘ) একক ঋণগ্রহীতা: প্রস্তাবিত ঋণটি শুধুমাত্র একটি নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠান বা প্রকল্পের জন্য বরাদ্দ করা হয়। এবং সর্বশেষে (ঙ) নির্দিষ্ট মেয়াদ: সাধারণত মধ্যমেয়াদি থেকে দীর্ঘমেয়াদি হয়।
সিন্ডিকেশন প্রক্রিয়ার বিস্তারিত ধাপ
প্রাক-সিন্ডিকেশন পর্যায়: এ পর্যায়ে ঋণগ্রহীতার প্রাথমিক যোগ্যতা নির্ধারণ, লিড অ্যারেঞ্জার নির্বাচন ও টার্ম শিট প্রস্তুত করা হয়। এরপর রয়েছে সিন্ডিকেশন গঠন পর্যায় যার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে—প্রকল্পের উৎপাদিত পণ্যের বাজার কৌশল নির্ধারণ, ইনফরমেশন মেমোরেন্ডাম প্রস্তুতকরণ ও সম্ভাব্য ঋণদাতাদের কাছে ইনফরমেশন মেমোরেন্ডাম প্রেরণ। এরপর সামগ্রিক ডিউ ডিলিজেন্স প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হয়, যার মধ্যে রয়েছে প্রযুক্তিগত সমীক্ষা, আর্থিক বিশ্লেষণ, আইনি পর্যালোচনা ও জামানত মূল্যায়নসহ প্রকল্পভেদে যাবতীয় পদ্ধতিগুলো। সিন্ডিকেশন গঠন পর্যায়ে আরো রয়েছে ফ্যাসিলিটি এগ্রিমেন্টসহ যাবতীয় আইনি দলিল ও জামানতের দলিল প্রস্তুতকরণ এবং ঋণগ্রহীতা ও ঋণদাতাদের সমন্বয়ে স্বাক্ষর অনুষ্ঠানের আয়োজন করা। এ সব কিছুই করে থাকে লিড অ্যারেঞ্জার। এরপর শুরু হয় পোস্ট বা ফান্ড উত্তোলন পরবর্তী কার্যক্রম।
এর মধ্যে রয়েছে ফ্যাসিলিটি এগ্রিমেন্টের শর্তাবলি পূরণ সাপেক্ষে ধাপে ধাপে প্রয়োজনীয় অর্থ প্রদান, মনিটরিং কার্যক্রম পরিচালনা, নিয়মিত প্রতিবেদন প্রণয়ন ও ঋণ পরিশোধ তদারকি কার্যক্রম পরিচালনা। উল্লেখ্য, প্রাক-সিন্ডিকেশন ও সিন্ডেকশন গঠন পর্যায়গুলো করে থাকে লিড অ্যারেঞ্জার এবং ফ্যাসিলিটি এগ্রিমেন্ট ও অন্যান্য যাবতীয় আইনি দলিল তৈরিসহ ঋণ বিতরণ থেকে শুরু করে ঋণের সর্বশেষ কিস্তি আদায় পর্যন্ত যে প্রতিষ্ঠান কাজ করে থাকে তাকে বলা হয় সিন্ডিকেশন ঋণের এজেন্ট। মূলত লিড অ্যারেঞ্জারের কাজ যেখানে শেষ সেখান থেকেই এজেন্টের কাজ শুরু। তবে অনেক ক্ষেত্রে লিড অ্যারেঞ্জোর এজেন্টের দায়িত্ব নিয়ে থাকে যা ফ্যাসিলিটি এগ্রিমেন্টের শর্তাবলি অনুযায়ী নির্ধারিত হয়।
সিন্ডিকেশন ফাইন্যান্সিংয়ের চ্যালেঞ্জ
বাংলাদেশে সিন্ডিকেশন ফাইন্যান্সিংয়ের রয়েছে বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ। এর মধ্যে রয়েছে প্রাতিষ্ঠানিক সীমাবদ্ধতা, দক্ষ সিন্ডিকেশন টিমের অভাব, জটিল অনুমোদন প্রক্রিয়া, স্ট্যান্ডার্ডাইজড ডকুমেন্টেশনের ঘাটতি, বাজারের সীমাবদ্ধতা, সেকেন্ডারি মার্কেটের অনুপস্থিতি, ক্রেডিট রেটিং সংস্কৃতির দুর্বলতা, তথ্য আদান-প্রদানের অদক্ষতা, নিয়ন্ত্রণমূলক চ্যালেঞ্জ, জটিল অনুমোদন প্রক্রিয়া, করসংক্রান্ত জটিলতা ও বৈদেশিক মুদ্রার ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা।
বাংলাদেশে সিন্ডিকেশন ফাইন্যান্সিংয়ের রয়েছে উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ ও বিশাল উন্নয়নের সুযোগ। বাংলাদেশের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো এ প্রক্রিয়াকে আরো আধুনিক ও আন্তর্জাতিকীকরণের লক্ষ্যে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারে। যেমন প্রযুক্তির ব্যবহার, ব্লকচেইন-ভিত্তিক সিন্ডিকেশন প্লাটফর্ম, ডিজিটাল ডিউ ডিলিজেন্স প্রক্রিয়া, স্মার্ট কনট্রাক্টের মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয় অর্থায়ন, বাজার সম্প্রসারণ, টেকসই বা গ্রিন ফাইন্যান্সিংয়ের সম্প্রসারণ, এমএসএমই সেক্টরে প্রয়োগ, ক্রস-বর্ডার সিন্ডিকেশনের সম্প্রসারণ, নীতিসহায়তা, সিন্ডিকেশন ফ্রেন্ডলি রেগুলেটরি ফ্রেমওয়ার্ক, ট্যাক্স ইনসেনটিভ প্রদান ও স্ট্যান্ডার্ডাইজড ডকুমেন্টেশন চালু করা। এছাড়া ঋণগ্রহীতাদেরকে সিন্ডিকেশন ঋণের সুবিধা ও উপকারিতা সম্পর্কে সচেতন করতে হবে।
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি টেকসই করতে সিন্ডিকেশন ফাইন্যান্সিং একটি শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে কাজ করতে পারে। তবে এর সফল বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন দক্ষ মানবসম্পদ গঠন, প্রযুক্তির সর্বোত্তম ব্যবহার, অনুকূল নীতিমালা প্রণয়নসহ আন্তঃপ্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় বৃদ্ধি। ভবিষ্যতে যদি আমরা এক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে পারি, তাহলে সিন্ডিকেশন ফাইন্যান্সিং বা যৌথ অর্থায়ন বাংলাদেশের অর্থনীতিতে আরো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে, বিশেষ করে মেগা প্রকল্পগুলোর অর্থায়নে। একই সঙ্গে যৌথ অর্থায়ন ব্যাংক খাতের জন্য আরো নতুন ব্যবসায়িক সুযোগ সৃষ্টি করবে এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনাকে আরো কার্যকর করে তুলবে, যা ব্যাংকিং ঋণখেলাপি কমাতে দৃঢ় ভূমিকা রাখবে।
ড. মো. তৌহিদুল আলম খান: ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী, এনআরবিসি ব্যাংক পিএলসি।
সূত্র: বণিক বার্তা

