মালয়েশিয়া বাংলাদেশের জন্য জনশক্তি রপ্তানির শীর্ষ পাঁচ দেশের মধ্যে অন্যতম। একসময় দেশটিতে প্রধানত ইন্দোনেশীয় শ্রমিক কাজ করত; এখন সেই জায়গা দখল করেছেন বাংলাদেশিরা।
বৈধ নথিপত্রধারীর পাশাপাশি উল্লেখযোগ্যসংখ্যক বাংলাদেশি অবৈধভাবে মালয়েশিয়ায় রয়েছেন। দেশটির অভিবাসন বিভাগ নিয়মিত অভিযান চালিয়ে এ ধরনের অভিবাসীদের আটক করছে। এতে বৈধভাবে থাকা বাংলাদেশিরাও আতঙ্ক ও অস্বস্তিতে পড়ছেন। সম্প্রতি দেশটি ঘুরে এমন তথ্য জানা গেছে।
মালয়েশিয়ার সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, শুধু নভেম্বর মাসে ১৮২ বাংলাদেশিকে আটক করা হয়েছে। এর আগে সেপ্টেম্বরের অভিযানে ধরা পড়েছিল ৩৭৭ জন। অভিবাসন বিভাগের প্রায় সব অভিযানে বাংলাদেশিরাই বেশি সংখ্যায় ধরা পড়ছে। আটককৃতরা পরে দেশে পাঠানো হচ্ছে।
মালয়েশিয়ার একটি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানে উচ্চ পদে থাকা একজন বাংলাদেশি, নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “প্রায় সব জায়গায় অনেক বাংলাদেশিকে দেখা যায়। তাদের অর্ধেক হয়তো অবৈধ। তাই যারা পরিবার নিয়ে বৈধভাবে বসবাস করছি, আমরা বিব্রত হচ্ছি। কর্মক্ষেত্রেও প্রশ্নের মুখে পড়তে হয়। অথচ প্রশিক্ষণ দিয়ে বৈধভাবে লোক পাঠানো গেলে আরও বেশি আয় সম্ভব হত।”
নভেম্বরের শেষ সপ্তাহে কুয়ালালামপুরের সুলতান আবদুল সামাদ জামে মসজিদ এলাকায় দেখা হয় কুমিল্লা থেকে যাওয়া একদল বাংলাদেশি শ্রমিকের সঙ্গে। তারা জানান, এখনো কাজ পাননি। প্রত্যেকে দালালের মাধ্যমে পাঁচ লাখ টাকা খরচ করে গেছেন। রাজধানীর বাইরে কোনো কারখানায় কাজের চেষ্টা করছেন।
ঢাকায় রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্টস রিসার্চ ইউনিটের (রামরু) প্রতিষ্ঠাতা চেয়ার তাসনিম সিদ্দিকী বলেন, “লোকদেখানো জনশক্তি রপ্তানির বদলে অবৈধ বাংলাদেশিদের বৈধ করার উদ্যোগ নিতে হবে। আগেও মালয়েশিয়া এভাবে বৈধতা দিয়েছে। এতে দেশে প্রবাসী আয়ের প্রবাহ বাড়বে। নতুন করে শ্রমবাজার সিন্ডিকেটের হাতে তুলে দিলে তারা বাস্তবে কাজে যোগ দিতে পারবে না। এজন্য সরকারকে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে।”
মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশিরা:
বাংলাদেশের শ্রমবাজারের আন্তর্জাতিক যাত্রা শুরু হয় ১৯৭৬ সালে। ১৯৭৮ সালে প্রথম ২৩ জন শ্রমিক মালয়েশিয়ায় যান। পরবর্তীতে ১৯৯২ সালে বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যে আনুষ্ঠানিক জনশক্তি নিয়োগ চুক্তি সই হয়। ১৯৯০ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশি শ্রমিক রপ্তানি বৃদ্ধি পায়। ২০২৩ সালে সর্বোচ্চ ৩ লাখ ৫১ হাজার ৬৮৩ জন বাংলাদেশি মালয়েশিয়ায় যান। ২০২৪ সালের ৩১ মে শ্রমবাজারটি বন্ধ হয়ে যায়। পরে নানা শর্তে এটি আবার চালু হয়।
বাংলাদেশিরা মালয়েশিয়ার নির্মাণ, শিল্প, কৃষি ও সেবা খাতে কাজ করছেন। দেশে বিদেশি শ্রমিকের মধ্যে এখন সর্বোচ্চ ৩৭ শতাংশই বাংলাদেশি। চলতি বছরের জুনের শেষে বৈধভাবে কাজের অনুমতি পাওয়া বাংলাদেশির সংখ্যা ছিল ৮ লাখ ৩ হাজার ৩৩২। এই তথ্য প্রকাশ করেছে মালয়েশিয়ার সংবাদমাধ্যম দ্য স্টার।
তবে বাংলাদেশিরা বলছেন, বাস্তবে সেখানে আরও প্রায় দ্বিগুণ বাংলাদেশি কর্মরত আছেন। অনেকেই শিক্ষা ভিসায় গিয়ে আর ফেরেননি। আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম)-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ সাল পর্যন্ত দেশটিতে ২৫ লাখ বিদেশি নাগরিক ভ্রমণের উদ্দেশ্যে গিয়ে আর দেশে ফেরেননি। এর মধ্যে ৩৮ শতাংশ বাংলাদেশি।
কুয়ালালামপুর, পেনাংসহ বিভিন্ন রাজ্যে আবাসন ব্যবসা জোরদার হওয়ায় নির্মাণশ্রমিকের চাহিদা ব্যাপক। সেবা ও উৎপাদন খাতও দ্রুত বাড়ছে। বৈধ ও অবৈধ বাংলাদেশিরা মূলত এসব খাতেই কাজ করছেন। দেশে সর্বনিম্ন বেতন নির্ধারিত থাকায় অনেক প্রতিষ্ঠান খরচ বাঁচাতে অবৈধ শ্রমিক নিয়োগ করে, যেখানে বাংলাদেশিরা সংখ্যাগরিষ্ঠ।
মালয়েশিয়ার সর্বনিম্ন বেতন প্রতি মাসে ১ হাজার ৭০০ রিঙ্গিত, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৫১ হাজার টাকা। শ্রমিকদের দৈনিক ৮ ঘণ্টা ও সপ্তাহে ৪৫ ঘণ্টা কাজ করতে হয়। চাইলে দৈনিক সর্বোচ্চ চার ঘণ্টা অতিরিক্ত কাজ করা যায়। নির্মাণ, কারখানা, পামবাগান, ইলেকট্রিশিয়ান, প্লাম্বিং, পেইন্টার, সুপারমার্কেটসহ বিভিন্ন খাতে শ্রমিকের চাহিদা রয়েছে।
‘মাই সেকেন্ড হোম’ কর্মসূচিতে বাংলাদেশিদের আগ্রহ:
মালয়েশিয়ায় দ্বিতীয় নিবাস গড়ার সুযোগ দিয়ে চালু করা ‘মালয়েশিয়া মাই সেকেন্ড হোম’ কর্মসূচিতে বাংলাদেশিরা এখন চতুর্থ স্থানে রয়েছেন। ২০২৪ সাল পর্যন্ত ৩ হাজার ৬০৪ বাংলাদেশি এ কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছেন। এই প্রোগ্রামে ৩ কোটি ৬০ লাখ টাকা বিনিয়োগ করলে পাঁচ বছরের ভিসা এবং বেশি অর্থ বিনিয়োগে ২০ বছরের ভিসা পাওয়া যায়। শর্ত হলো, বিনিয়োগ আবাসন খাতে করতে হবে। এর ফলে মালয়েশিয়ায় আবাসন ব্যবসাও আরও চাঙা হয়ে উঠেছে।
কম দূরত্ব, তুলনামূলক কম খরচ এবং সাংস্কৃতিকভাবে কাছাকাছি হওয়ায় বাংলাদেশি শ্রমিকদের অন্যতম প্রধান গন্তব্য মালয়েশিয়া। ২০২২ সালে সেখানে গিয়েছিলেন ৫০ হাজার ৯০ জন; ২০২৩ সালে ৩ লাখ ৫১ হাজার ৬৮৩ জন এবং ২০২৪ সালে নিষেধাজ্ঞার আগে গেছেন ৯৩ হাজার ৬৩২ জন। চলতি বছরের মে পর্যন্ত গেছেন ২ হাজার ৪৮৬ জন।
মালয়েশিয়া থেকে প্রবাসী আয় বাড়ছে:
মালয়েশিয়ায় বেশি বাংলাদেশি শ্রমিক থাকায় দেশে প্রবাসী আয়ও বৃদ্ধি পাচ্ছে। ২০২১-২২ অর্থবছরে দেশে এসেছে ১০২ কোটি, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ১১২ কোটি, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ১৬০ কোটি এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ২৮০ কোটি মার্কিন ডলার। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাইয়ে এসেছে ২৬ কোটি, আর আগস্ট ও সেপ্টেম্বর মাসে প্রতি মাসে ২৭ কোটি ডলার।
কুয়ালালামপুরের টাইমস স্কয়ারের একটি দোকানের কর্মী চুয়াডাঙ্গার মমিনুল ইসলাম জানান, আগে দেশে একটি জুতার দোকানে কাজ করতেন। যা বেতন পেতেন, তাতে সংসার চালানো কঠিন হতো। তাই পাঁচ লাখ টাকা ঋণ নিয়ে মালয়েশিয়ায় পাড়ি দেন। এখন তিনি প্রতি মাসে ২ হাজার ২০০ রিঙ্গিত (প্রায় ৬৬ হাজার টাকা) বেতন পান। ইতিমধ্যে ঋণের টাকা পরিশোধ করেছেন। মমিনুল বলেন, “মালয়েশিয়ায় ভালো আছি। প্রতি মাসে পরিবারের কাছে ভালো পরিমাণ টাকা পাঠাই। সংসারের সবাই ভালো আছেন। সঞ্চয়ও করতে পারছি।”

