কর শনাক্তকরণ নম্বর (টিআইএন) অনেক করদাতার জন্য এখন আর কার্যকর বা প্রয়োজনীয় থাকে না। ব্যবসা বন্ধ হয়ে যাওয়া, দীর্ঘ সময় আয় না থাকা, আইনি কাঠামোর পরিবর্তন কিংবা ভুলবশত নিবন্ধন নেওয়ার মতো পরিস্থিতিতে অনেকেই এই নিবন্ধন বহাল রাখতে সমস্যায় পড়েন। নিয়মিত রিটার্ন জমা দেওয়ার জটিলতা এবং জরিমানার আশঙ্কাও এতে যুক্ত হয়। এই বাস্তবতাকে বিবেচনায় নিয়েই আয়কর আইন, ২০২৩–এ টিআইএন নিবন্ধন বাতিলের সুস্পষ্ট বিধান যুক্ত করা হয়েছে।
টিন সার্টিফিকেট কী?
টিন বা টিআইএন-এর পূর্ণরূপ হলো, ট্যাক্সপেয়ার আইডেনটিফিকেশন নাম্বার। এটি একটি বিশেষ নাম্বার, যার সাহায্যে বাংলাদেশে করদাতাদের শনাক্ত করা হয়। টিন সার্টিফিকেট মূলত করদাতাদের নাম্বারটিই বহন করে থাকে। অর্থাৎ, টিআইএন বা টিন সার্টিফিকেট একজন করদাতার পরিচয়পত্রের মতোই কাজ করে।
কারা টিআইএন বাতিল করতে পারবেন:
আইনের ধারা ২৬২ অনুযায়ী নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ করলে একজন করদাতা টিআইএন বাতিলের আবেদন করতে পারবেন। যদি কেউ আর করযোগ্য আয়ের আওতায় না থাকেন বা আইন অনুযায়ী করদাতা হিসেবে গণ্য না হন, তাহলে তার নিবন্ধন বহাল রাখার বাধ্যবাধকতা থাকে না।
টানা তিন বছর করযোগ্য আয় না থাকলে এবং ভবিষ্যতেও আয় হওয়ার সম্ভাবনা না থাকলে বাতিলের আবেদন গ্রহণযোগ্য হবে। এছাড়া করদাতার মৃত্যু, ব্যবসা বা প্রতিষ্ঠানের অবসান কিংবা বিলুপ্তি ঘটলে নিবন্ধন বাতিল করা যাবে।
কোনো ব্যক্তি স্থায়ীভাবে দেশ ত্যাগ করলে এবং বাংলাদেশে কোনো আয়মূলক কর্মকাণ্ড না থাকলে তিনি এই সুবিধা পাবেন। একই সঙ্গে ডুপ্লিকেট বা ভুল নিবন্ধন, আইনি মর্যাদার পরিবর্তন এবং যুক্তিসংগত অন্য যেকোনো কারণেও বাতিলের আবেদন করা যাবে।
কীভাবে বাতিল হবে নিবন্ধন:
টিআইএন বাতিলের জন্য করদাতাকে আয়কর কর্তৃপক্ষের কাছে কারণ উল্লেখ করে আবেদন করতে হবে। আবেদন যাচাই শেষে কর্তৃপক্ষ কয়েকটি শর্ত পূরণ হলে বাতিল অনুমোদন দিতে পারে। শর্তগুলোর মধ্যে রয়েছে—
- কোনো বকেয়া কর না থাকা
- কর নির্ধারণসংক্রান্ত বিষয় নিষ্পত্তি থাকা
- কোনো কর–বিরোধ চলমান না থাকা
- আবেদনকারীর দেওয়া কারণ সত্য ও প্রমাণিত হওয়া
এনবিআরের নিজ উদ্যোগে বাতিলের ক্ষমতা:
আয়কর আইনে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকেও স্বপ্রণোদিতভাবে টিআইএন বাতিলের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। যদি দেখা যায় কোনো নিবন্ধনের বৈধ আয়ের উৎস নেই, অথবা নিবন্ধন আর্থিক অপরাধ বা অর্থ পাচারের উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হচ্ছে, তাহলে বোর্ড নিজ উদ্যোগে তা বাতিল করতে পারবে। এছাড়া নিবন্ধনের সময় দেওয়া তথ্য ভুল, বিভ্রান্তিকর বা মিথ্যা প্রমাণিত হলেও এই সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে।
টিআইএন বাতিল হলেও করদাতার তথ্য সম্পূর্ণভাবে মুছে যাবে না। আইন অনুযায়ী নির্ধারিত সময় পর্যন্ত এসব তথ্য সংরক্ষণ করবে কর্তৃপক্ষ। এই তথ্য ভবিষ্যৎ যাচাই, আইনগত প্রয়োজনে এবং কর প্রশাসনের কার্যক্রমে ব্যবহার করা হতে পারে।
আইনের ভাষায় টিআইএন বাতিল মানে হলো নিবন্ধন নিষ্ক্রিয় করা, যাতে তা আর ব্যবহারযোগ্য না থাকে। তবে আগের সব তথ্য ও রেকর্ড সংরক্ষিত থাকবে। এই বিধান করদাতাদের জন্য যেমন কিছুটা স্বস্তির, তেমনি কর প্রশাসনের জন্য একটি স্বচ্ছ ও সুশৃঙ্খল ব্যবস্থার পথ তৈরি করেছে।

