রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে গুমসংক্রান্ত আইন প্রণয়ন নিয়ে আয়োজিত এক অংশীজন সভায় আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান জানিয়েছেন, গুমের সঙ্গে জড়িত অপরাধীদের কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট সব অংশীজনের সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা শেষে একটি কার্যকর ও যথাযথ আইন প্রণয়ন করা হবে।
গতকাল রবিবার (১৭ মে) অনুষ্ঠিত ওই সভায় সভাপতির বক্তব্যে তিনি বলেন, এ ধরনের আইন প্রণয়নে হঠাৎ সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে না। কারণ এমন কোনো আইন করা যাবে না, যা অপরাধীকে শাস্তি দেওয়ার পরিবর্তে বরং তাকে কোনোভাবে সুবিধা দেয়। মন্ত্রী আরও বলেন, “আমরা বিষয়টি নিয়ে পর্যাপ্ত আলোচনা ও বিশ্লেষণের পর সিদ্ধান্ত নিতে চাই। হুট করে আইন করলে যদি তা বাস্তবে কার্যকর না হয় এবং অপরাধীরা পার পেয়ে যায় বা উপকৃত হয়, তাহলে সে আইনের কোনো প্রয়োজন নেই।”
তিনি গুমকে অত্যন্ত সংবেদনশীল ও গুরুতর অপরাধ হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, এ বিষয়ে নানা দিক বিবেচনা করতে হবে। অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে এসব দিক উঠে আসবে। একই সঙ্গে তিনি আশ্বস্ত করেন, বাংলাদেশে ভবিষ্যতে যেন গুমের মতো ঘটনা আর না ঘটে, সে লক্ষ্যেই আইন প্রণয়ন করা হবে।
সভায় বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সিলেট-২ আসনের সংসদ সদস্য এবং গুম হওয়া বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলীর স্ত্রী তাহসিনা রুশদী। আবেগঘন বক্তব্যে তিনি বলেন, ২০১২ সালের ১৭ এপ্রিল তৎকালীন সরকারের প্রত্যক্ষ মদদে তার স্বামী ইলিয়াস আলীকে গুম করা হয়। দীর্ঘ ১৪ বছর ধরে তারা অপেক্ষা করছেন তিনি ফিরে আসবেন। এমনকি ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পরও তারা কোনো খবর পাওয়ার আশা করেছিলেন, কিন্তু তাও হয়নি। তিনি আরও বলেন, গুমের শিকার পরিবারগুলোর ন্যায়বিচার নিশ্চিতের দাবিতেই তিনি রাজনীতিতে যুক্ত হয়েছেন এবং ভবিষ্যতে যেন আর কোনো পরিবারকে এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে না হয়, তা নিশ্চিত করার আহ্বান জানান।
সংরক্ষিত মহিলা আসনের সংসদ সদস্য এবং গুম হওয়া ব্যক্তিদের স্বজনদের সংগঠন ‘মায়ের ডাক’-এর সমন্বয়ক সানজিদা ইসলাম তুলি বিগত মানবাধিকার কমিশনগুলোর সমালোচনা করে বলেন, অতীতের কমিশনগুলো এই সংবেদনশীল বিষয়টি উপেক্ষা করেছে এবং ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর পাশে কার্যকরভাবে দাঁড়ায়নি। উন্মুক্ত আলোচনায় আইন বিশেষজ্ঞ ও মানবাধিকার কর্মীরা গুম প্রতিরোধে কার্যকর আইন প্রণয়নের জন্য একাধিক প্রস্তাব দেন। এর মধ্যে রয়েছে—
১. গুমসংক্রান্ত অপরাধের মাত্রা ও ভয়াবহতা অনুযায়ী শাস্তির মেয়াদ নির্ধারণ
২. তদন্ত কর্মকর্তার জন্য ন্যূনতম যোগ্যতার উচ্চমানদণ্ড নির্ধারণ
৩. এসব মামলার বিচার কার্যক্রম দীর্ঘসূত্রতায় না ফেলে নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে শেষ করার আইনি বাধ্যবাধকতা
সভায় স্বাগত বক্তব্য দেন আইন মন্ত্রণালয়ের লেজিসলেটিভ ও সংসদ বিষয়ক বিভাগের সচিব ড. হাফিজ আহমেদ চৌধুরী। এছাড়াও সভায় উপস্থিত ছিলেন রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল, জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির আবাসিক প্রতিনিধি স্টিফেন লিলার, সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী, আইন মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সচিব, জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এবং দেশি-বিদেশি মানবাধিকার সংস্থার প্রধান ও প্রতিনিধিরা।

