আগামী ২০২৬–২৭ অর্থবছরের বাজেটে কর আদায় না বাড়লে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে করা বাণিজ্য চুক্তি দেশের অর্থনীতিতে অতিরিক্ত চাপ তৈরি করতে পারে বলে মনে করছে এসডিজি বাস্তবায়নে নাগরিক প্ল্যাটফর্ম বাংলাদেশ। সংস্থাটির গবেষণায় এমন সতর্কবার্তা উঠে এসেছে।
আজ সোমবার (১৮ মে) রাজধানীর গুলশানের লেকশোর হোটেলে ‘জাতীয় বাজেট ২০২৬–২৭ : রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি ও নাগরিক প্রত্যাশা’ শীর্ষক সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) অতিরিক্ত গবেষণা পরিচালক তৌফিকুল ইসলাম খান।
সংলাপে সভাপতিত্ব করেন নাগরিক প্ল্যাটফর্মের আহ্বায়ক ও সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. মোহাম্মদ আবু ইউছুফ, বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) মহাপরিচালক ড. এ কে এনামুল হক, নাগরিক প্ল্যাটফর্মের কোর গ্রুপ সদস্য ও সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক শারমিন্দ নীলোর্মি এবং প্লামি ফ্যাশনস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সাবেক সভাপতি মো. ফজলুল হক।
মূল প্রবন্ধে তৌফিকুল ইসলাম খান বলেন, কর আদায় না বাড়িয়ে পরিচালন ব্যয় বাড়ালে সরকারের ওপর চাপ আরও বাড়বে। উন্নয়ন ব্যয় বাড়াতে হলে কর আদায় বৃদ্ধিও জরুরি। কর না বাড়লে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে হওয়া বাণিজ্য চুক্তিও সরকারের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করবে।
তিনি আরও বলেন, সরকারের ঋণ বাড়ছে, একই সঙ্গে উন্নয়ন চাহিদাও বাড়ছে। আসন্ন বাজেটে ঋণের চাপ আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলও বলছে, বাংলাদেশ বর্তমানে ঋণের চাপে রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে কর না বাড়িয়ে ব্যয় বাড়ালে আর্থিক চাপ তীব্র হবে। তিনি জানান, আগামী অর্থবছরের বাজেটে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আহরণের লক্ষ্য ধরা হচ্ছে। এটি অর্জন করতে হলে প্রায় ৪২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি প্রয়োজন হবে, যা বর্তমান কাঠামোতে বাস্তবায়ন সম্ভব কি না তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, ২০১১ সালে রাজস্ব আদায়ে সর্বোচ্চ ২৭ শতাংশের কিছু বেশি প্রবৃদ্ধি হয়েছিল, এরপর আর সেই মাত্রায় পৌঁছানো যায়নি।
তৌফিকুল ইসলাম খান বলেন, কর আদায় বাড়াতে হলে করের পরিধি বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে কিছু ক্ষেত্রে করহার কমানোর প্রয়োজন হতে পারে। তিনি আরও বলেন, কর আদায় না বাড়লে কর্মকর্তা–কর্মচারীদের বেতন কাঠামো বৃদ্ধির বিষয়েও নতুন করে বিশ্লেষণ দরকার।
সংলাপে সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, বাজেটে জনগণ কত দিচ্ছে এবং কত পাচ্ছে—এর সঠিক মূল্যায়ন হওয়া দরকার। পাশাপাশি জনগণের অর্থ থেকে কতটা অপচয় বা দুর্নীতি হচ্ছে, সেটিরও পরিমাপ থাকা উচিত।
তিনি আরও বলেন, আগামী বাজেটে ঋণের সুদ বাবদ এক লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করতে হবে। এ ধরনের ঋণনির্ভরতা কমানো জরুরি। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বোয়িং বিমান চুক্তিসহ যেসব চুক্তি হয়েছে, সেখানে শুল্কছাড়ের বিষয় থাকলেও বাস্তবে শুল্কহার কতটা কমবে, তার পূর্ণ মূল্যায়ন প্রয়োজন বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
বিকেএমইএ’র সাবেক সভাপতি মো. ফজলুল হক বলেন, খাতভিত্তিক বরাদ্দ বারবার না বাড়িয়ে বরং মান উন্নয়নে গুরুত্ব দেওয়া উচিত। বরাদ্দ বাড়লেও লক্ষ্য ও বাস্তবায়নের মধ্যে বড় ব্যবধান রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে দুর্নীতির অভিযোগও ওঠে। তিনি বলেন, বরাদ্দ না বাড়িয়ে ব্যয়ের মান নিশ্চিত করলে বাজেট ঘাটতি কমে আসতে পারে।
তিনি আরও বলেন, ব্যাংক খাতে তারল্য সংকট ও বিদ্যুৎ সমস্যা এখনো পুরোপুরি সমাধান হয়নি। বর্তমান সরকারের বয়স স্বল্প হওয়ায় এখনই কঠোর সমালোচনার সময় নয়। তবে কিছু উন্নতি হয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে বিনিয়োগে অনিশ্চয়তা থাকলেও এখন তা কিছুটা কমেছে এবং ভবিষ্যতে ব্যক্তিগত বিনিয়োগ বাড়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

