চলতি বছরের জানুয়ারি মাসের শুরু থেকেই বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে সক্রিয় ভূমিকায় দেখা যাচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংককে। মাত্র ১২ দিনের ব্যবধানে নিলামের মাধ্যমে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো থেকে মোট ৭০ কোটি বা ৭০০ মিলিয়ন ডলার কিনেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ডলারের চাহিদা কমে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে বাজারে ভারসাম্য ধরে রাখতেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
সোমবার, ১২ জানুয়ারি, বাংলাদেশ ব্যাংক একদিনেই কিনেছে ৮ কোটি ১০ লাখ ডলার, যা মিলিয়নে হিসাব করলে ৮১ মিলিয়ন। এই ডলার কেনা হয়েছে ১০টি বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে, প্রতি ডলারের দাম নির্ধারণ করা হয় ১২২ টাকা ৩০ পয়সা। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিলাম প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই এই লেনদেন সম্পন্ন হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান সাংবাদিকদের জানান, জানুয়ারির প্রথম ১২ দিনেই ডলার কেনার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৭০০ মিলিয়নে। শুধু তাই নয়, চলতি অর্থবছর শুরু হওয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো থেকে মোট ৩৮৩ কোটি বা ৩ দশমিক ৮৩ বিলিয়ন ডলার কিনেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এই পরিসংখ্যানই দেখাচ্ছে, বৈদেশিক মুদ্রাবাজার ব্যবস্থাপনায় আগের তুলনায় অনেক বেশি সক্রিয় অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
মূলত গত বছরের জুলাই মাস থেকে ডলার কেনার ক্ষেত্রে নতুন একটি কৌশল গ্রহণ করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। সরাসরি প্রশাসনিক হস্তক্ষেপের বদলে বাজারভিত্তিক বিনিময় হার ব্যবস্থার আওতায় নিলামের মাধ্যমে ডলার কেনা শুরু হয়। এর উদ্দেশ্য ছিল একদিকে রিজার্ভ শক্তিশালী করা, অন্যদিকে বাজারে অপ্রয়োজনীয় অস্থিরতা ঠেকানো।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিগত অবস্থান স্পষ্ট—বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে সরবরাহ ও চাহিদার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা। সরবরাহ যদি চাহিদার তুলনায় বেশি হয়, তাহলে ডলারের দাম স্বাভাবিকভাবেই কমার সুযোগ পাবে। আবার চাহিদা বেড়ে গেলে বাজারকে দাম বাড়ার সুযোগও দেওয়া হবে। অর্থাৎ কৃত্রিমভাবে দর বেঁধে না রেখে বাজারের স্বাভাবিক গতিকে গুরুত্ব দেওয়ার কৌশলই এখন অনুসরণ করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
ব্যাংক খাতের সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সাম্প্রতিক সময়ে ডলারের চাহিদা কমে যাওয়ার পেছনে বেশ কয়েকটি বাস্তব কারণ রয়েছে। সরকারের বড় অঙ্কের বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের চাপ আগের তুলনায় কমে এসেছে, ফলে হঠাৎ করে ডলারের প্রয়োজনও হ্রাস পেয়েছে। পাশাপাশি দেশের ভেতরে ব্যবসায়িক কার্যক্রমে যে ধরনের স্থবিরতা চলছে, সেটিও ডলার চাহিদা কমানোর ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখছে।
বিশেষ করে বিনিয়োগ দুর্বল থাকায় নতুন শিল্পকারখানা বা সম্প্রসারণমূলক প্রকল্পে ব্যবহৃত মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানির হার কমেছে। এই ধরনের যন্ত্রপাতি আমদানির জন্য বিপুল পরিমাণ ডলারের প্রয়োজন হয়। আমদানি কমে যাওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপও অনেকটাই হালকা হয়েছে।
সব মিলিয়ে, ডলারের চাহিদা যখন তুলনামূলকভাবে কম, তখন বাংলাদেশ ব্যাংক সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে রিজার্ভ বাড়ানোর পথে হাঁটছে। নিলামের মাধ্যমে নিয়মিত ডলার কেনার এই ধারা অব্যাহত থাকলে সামনে বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে স্থিতিশীলতা আরও জোরদার হতে পারে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংকাররা। একই সঙ্গে এটি বাজারভিত্তিক বিনিময় হার ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর ও বিশ্বাসযোগ্য করে তুলবে—এমন প্রত্যাশাও তাদের।

