দেশের বেসরকারি খাতে বিনিয়োগের গতি ক্রমেই শ্লথ হয়ে পড়ছে। এর প্রভাব স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে ব্যাংক ঋণের প্রবৃদ্ধিতে। টানা ছয় মাস ধরে বেসরকারি ঋণ প্রবৃদ্ধি ৭ শতাংশের নিচে আটকে আছে।
উচ্চ সুদ ও ব্যাংকঋণ ও আমানতের সুদহারের ব্যবধান বেড়ে যাওয়ায় ঋণ গ্রহণ আরও ব্যয়বহুল হয়ে উঠেছে। অর্থনীতিবিদ ও উদ্যোক্তারা বলছেন, উচ্চ সুদের চাপ ও বিনিয়োগ অনিশ্চয়তা মিলিয়ে ব্যবসায়ীরা এখন দ্বিমুখী সংকটে পড়েছেন। এর ফলে শিল্প সম্প্রসারণ, কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, নভেম্বর পর্যন্ত ঋণ প্রবৃদ্ধির ধীরগতি নতুন শিল্প ও সম্প্রসারণমূলক বিনিয়োগে স্থবিরতার ইঙ্গিত দিচ্ছে। বিনিয়োগ কমে যাওয়ায় ব্যাংক ঋণের চাহিদাও কমেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এতে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান ও রপ্তানিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, দেশে নতুন বিনিয়োগ না হলে বেসরকারি খাতে ব্যাংক ঋণের চাহিদা বাড়ে না। বর্তমান ঋণ প্রবৃদ্ধি স্পষ্ট করে দিচ্ছে, নতুন শিল্প ও সম্প্রসারণমূলক বিনিয়োগ খুবই সীমিত।
ব্যাংকাররাও একই মত প্রকাশ করেছেন। তারা জানান, উচ্চ সুদহার, দুর্বল চাহিদা এবং নীতিগত ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে উদ্যোক্তারা নতুন ঋণ নিতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, চলতি অর্থবছরের জুলাই-নভেম্বর সময়ে মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানির দায় নিষ্পত্তি ১৬ শতাংশের বেশি কমেছে। অর্থনীতিবিদরা এটিকে বিনিয়োগ স্থবিরতার বড় সূচক হিসেবে দেখছেন।
বিশেষজ্ঞরা আরও বলছেন, বড় শিল্পগ্রুপগুলোর অনেক কারখানা বন্ধ বা আংশিক সক্ষমতায় থাকায় ব্যাংক ঋণের চাহিদা আরও কমেছে। কিছু শীর্ষ শিল্পপ্রতিষ্ঠান উৎপাদন উল্লেখযোগ্য হারে কমিয়েছে, ফলে নতুন ঋণের প্রয়োজনও কমে গেছে। ঋণ ও আমানতের সুদহারের ব্যবধান বেড়ে যাওয়ায় ঋণগ্রহণ ক্রমেই ব্যয়বহুল হয়েছে। এর প্রভাব পড়ছে ব্যবসা ও বিনিয়োগে। উদ্যোক্তারা জানাচ্ছেন, উচ্চ সুদের কারণে উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে এবং নতুন বিনিয়োগের আগ্রহ কমছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকও এই পরিস্থিতিকে উদ্বেগজনক হিসেবে দেখছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত অক্টোবরে ব্যাংকগুলো গড়ে ৬.৪০ শতাংশ সুদে আমানত গ্রহণ করলেও ঋণ বিতরণ করেছে গড়ে ১২.১৪ শতাংশে। এতে গড় স্প্রেড দাঁড়িয়েছে ৫.৭৪ শতাংশ। বাস্তবে কিছু ব্যাংকে স্প্রেড ৮ থেকে ১০ শতাংশেরও বেশি। এটি ব্যবসায়ীদের জন্য বড় চাপ সৃষ্টি করছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, সুদহার পুরোপুরি বাজারভিত্তিক করার সুযোগে কয়েকটি ব্যাংক স্প্রেড অস্বাভাবিকভাবে বাড়িয়েছে। এতে ঋণের খরচ বেড়ে ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তারা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। পার্শ্ববর্তী দেশে ঋণ-আমানতের স্প্রেড ৩ শতাংশের নিচে, ইউরোপে ১ শতাংশের বেশি নয়, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ১.৫–২ শতাংশ, ভারতে ৩ শতাংশের মধ্যে।
৭ ডিসেম্বর বাংলাদেশ ব্যাংকে অনুষ্ঠিত ব্যাংকার্স সভায় গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর স্প্রেড বাড়াকে উদ্বেগজনক উল্লেখ করে সম্মিলিত উদ্যোগে তা কমানোর তাগিদ দেন। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সরাসরি নির্দেশ না দিয়ে নৈতিক চাপের মাধ্যমে ব্যাংকগুলোকে নিয়ন্ত্রণে আনছে।
একই সময়, কিছু দুর্বল ব্যাংকের আমানত শক্তিশালী ব্যাংকে চলে যাচ্ছে। ফলে শক্তিশালী ব্যাংক কম সুদেও প্রচুর আমানত পাচ্ছে, কিন্তু ঋণের সুদ কমানো হচ্ছে না। বেসরকারি খাতে ঋণের চাহিদা কম থাকায় ব্যাংকগুলো ট্রেজারি বিল ও বন্ডে বিনিয়োগ করে ১০ শতাংশের বেশি সুদ পাচ্ছে। ফলে স্প্রেড আরও বেড়ে গেছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, উচ্চ স্প্রেড ব্যাংকের মুনাফা বাড়ালেও অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক নয়। ঋণের খরচ বেশি হলে নতুন শিল্প স্থাপন, ব্যবসা সম্প্রসারণ এবং কর্মসংস্থান বাধাগ্রস্ত হয়।
২০২০ সালের এপ্রিল থেকে ২০২৩ সালের জুন পর্যন্ত ব্যাংক ঋণে সর্বোচ্চ ৯ শতাংশ সুদসীমা ছিল। আইএমএফের শর্ত অনুযায়ী ২০২৩ সালের জুলাইয়ে ‘স্মার্ট’ পদ্ধতি চালু হয় এবং একই বছরের নভেম্বরেই স্প্রেডের সর্বোচ্চ সীমা তুলে নেওয়া হয়। ২০২৪ সালের মে মাসে সুদহার পুরোপুরি বাজারে ছেড়ে দেওয়া হয়। ব্যবসায়ীরা বলছেন, বাজারভিত্তিক সুদহার ব্যবস্থা শৃঙ্খলাপূর্ণ না হলে ঋণের উচ্চ খরচ বড় বাধা। বিনিয়োগ ও উৎপাদন সচল রাখতে স্প্রেড নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি উঠছে।
বর্তমানে দেশের অর্থনীতির সবচেয়ে বড় সমস্যা বিনিয়োগ স্থবিরতা। বেসরকারি ও বিদেশি বিনিয়োগ দুটোই সাম্প্রতিক সময়ে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমেছে। নতুন সরকারের জন্য এটি বড় চ্যালেঞ্জ। সিপিডি বলছে, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানকে নীতির কেন্দ্রে না আনলে সংকট আরও গভীর হবে। নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, ‘বিনিয়োগ কমে গেলে কর্মসংস্থান কমে, বেকারত্ব বেড়ে অর্থনীতিতে অস্বস্তি তৈরি হয়।’
দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়াতে এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড গতিশীল রাখতে ভারসাম্যপূর্ণ ব্যাংক সুদহার জরুরি। কিন্তু বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো পাল্লা দিয়ে সুদ বাড়াচ্ছে। বর্তমানে সুদের হার ১৪ শতাংশের ওপরে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীরা ১০–১১ শতাংশ মুনাফা করতে পারছে। এ অবস্থায় উচ্চ সুদ ব্যবসাবান্ধব নয়।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, বর্তমান মূল্যস্ফীতির মূল কারণ উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং সরবরাহজনিত সমস্যা। এই অবস্থায় কেবল সুদ বাড়ালে বিনিয়োগ আরও দুর্বল হয়। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) ঋণের অপ্রতুলতা ও উচ্চ সুদে চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। এর ফলে অনেক প্রতিষ্ঠান টিকে থাকতে পারছে না, যা কর্মসংস্থান সৃষ্টি বাধাগ্রস্ত করছে।
অতএব সরকারকে সুদহার, বিনিয়োগ ও মূল্যস্ফীতির মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করতে হবে। সুদ কমালে উৎপাদন খরচ কমে, প্রতিষ্ঠানগুলো বাজারে ভালো অবস্থানে আসে। নতুন বিনিয়োগ হলে শিল্প ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পায়। বিশেষ করে এসএমই খাত কম সুদে ঋণ পেলে দ্রুত সম্প্রসারণ করতে পারবে।
বিনিয়োগ স্থবিরতা কাটাতে সুদের হার কমানো প্রয়োজন। অগ্রাধিকার খাত যেমন কৃষি, এসএমই, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, আবাসন, গার্মেন্টস ও নারী উদ্যোক্তাদের জন্য স্বল্প সুদে সহজ শর্তের ঋণ নিশ্চিত করতে হবে। নীতি সুদ এমনভাবে বাড়লে ভবিষ্যতে ঋণের খরচ আরও বেড়ে যাবে এবং দেশীয় বিনিয়োগ মুখ থুবড়ে পড়বে।
মূল্যস্ফীতি বাড়ায় দৈনন্দিন খরচ বেড়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুদের হার বাড়িয়েছে। এতে নতুন বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান কমে গেছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ব্যাহত হচ্ছে এবং দেশের অর্থনীতি গতি হারাচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে নীতিনির্ধারকদের বড় চ্যালেঞ্জ হলো বিনিয়োগবান্ধব, যৌক্তিক ও ভারসাম্যপূর্ণ সুদহার নির্ধারণ করা।

