রাজশাহী পানি সরবরাহ ও পয়ঃনিষ্কাশন কর্তৃপক্ষ (ওয়াসা) প্রতিষ্ঠার পর থেকেই লোকসানের ধারায় ভাসছে। সংস্থাটির গ্রাহক সংখ্যা বাড়ছে। পানির দাম তিনগুণ বেড়েছে। তবুও লোকসান কমছে না, বরং বৃদ্ধি পাচ্ছে। বার্ষিক প্রতিবেদন এবং আর্থিক নিরীক্ষা প্রতিবেদনে রাজস্ব আয়ের বড় ধরনের গরমিলও ধরা পড়েছে। এটি কি অভ্যন্তরীণ অদক্ষতার ফল, নাকি হিসাবরক্ষণে ইচ্ছাকৃত ফাঁকফোকর—দৈনিক শেয়ার বিজ তা অনুসন্ধান করেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠার পর থেকে প্রতি বছর ওয়াসার লোকসান বাড়ছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এটি দাঁড়িয়েছে ১১ কোটি ৬৮ লাখ টাকায়। ওয়াসার বড় চ্যালেঞ্জ হলো অবকাঠামোগত উন্নয়ন। বর্তমানে ‘রাজশাহী ওয়াসা সারফেস ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট’ প্রকল্প চলছে, যার মূল্য ২৭ কোটি ৬২ লাখ ডলার। প্রকল্পটি চায়না এক্সিম ব্যাংকের অর্থায়নে পরিচালিত হচ্ছে। ২০২৭ সালের মধ্যে প্রকল্প শেষ হলে দৈনিক ২০ কোটি লিটার বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ সম্ভব হবে। তবে প্রকল্পের উচ্চ খরচ এবং বিলম্বও লোকসান বাড়াতে ভূমিকা রাখছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরের অডিট রিপোর্টে প্রকল্পের অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণের দুর্বলতা উল্লেখ করা হয়েছে।
বার্ষিক প্রতিবেদন ও আর্থিক নিরীক্ষা প্রতিবেদনের মধ্যে সবচেয়ে বড় গরমিল রাজস্ব আয়ের ক্ষেত্রে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে বার্ষিক প্রতিবেদনে রাজস্ব আয় দেখানো হয়েছে ৫ কোটি ১৩ লাখ টাকা, কিন্তু অডিটে ১৭ কোটি ২৬ লাখ। পার্থক্য প্রায় তিনগুণ। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বার্ষিক প্রতিবেদনে আয় দেখানো হয়েছে ১৭ কোটি ২৬ লাখ, অথচ অডিট রিপোর্টে ১৯ কোটি ৫৮ লাখ। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বার্ষিক প্রতিবেদনে আয় কমে ১৩ কোটি ৬২ লাখ, যদিও গ্রাহক সংখ্যা বেড়েছে ৫১ হাজার ৬৪২ জনে। অডিট রিপোর্টে সেই বছরের রাজস্ব ২০ কোটি ১৮ লাখ।
এ থেকে স্পষ্ট, গ্রাহক বাড়লেও আয়ের অসঙ্গতি রয়ে গেছে। ২০২৩ সালে পানির দাম তিনগুণ বাড়ানো হলেও ২০২৪-২৫-এর বার্ষিক প্রতিবেদনে আয় কম দেখানো হয়েছে। ওয়াসা বিল ইস্যু করে চার কিস্তিতে, প্রতি তিন মাস অন্তর। কিন্তু শেষ কিস্তি দেরিতে হওয়ায় তা পরবর্তী অর্থবছরে যোগ হয়। অডিট রিপোর্টে এটি লক্ষ্যমাত্রা হিসেবে দেখানো হয়, যা প্রকৃত আদায়ের সঙ্গে মেলে না।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ওয়াসার লোকসানের প্রধান কারণ হলো উচ্চ পরিচালন খরচ, বকেয়া বিল আদায়ের অক্ষমতা এবং প্রকল্পের অতিরিক্ত খরচ। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ব্যয় ৩৭ কোটি ৩০ লাখ টাকা, যার বড় অংশ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা (প্রায় ১৫ কোটি) এবং প্রকল্প রক্ষণাবেক্ষণে গেছে। সারফেস ওয়াটার প্রজেক্টের অডিট রিপোর্টে অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণের দুর্বলতা যেমন কেনাকাটায় অস্বচ্ছতা এবং টেন্ডার প্রক্রিয়ায় অনিয়মও উল্লেখ করা হয়েছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওয়াসার সাবেক এক কর্মকর্তা বলেন, ‘লোকসানের পেছনে নিয়ন্ত্রণহীন খরচ এবং বকেয়া বিল আদায়ের অভাব। অনেক গ্রাহক বিল দেন না, কিন্তু সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয় না। প্রকল্পের অর্থ ব্যয়েও অস্বচ্ছতা আছে।’ বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, রাজশাহী ওয়াসার লোকসান ও হিসাবের গরমিল শুধু আর্থিক নয়, প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসনের বড় প্রশ্ন তুলেছে। গ্রাহক বাড়লেও লোকসান কমাতে না পারা অদক্ষতার প্রমাণ। স্বাধীন তদন্ত ও স্বচ্ছতা না থাকলে এর ভার সাধারণ মানুষের ওপর পড়বে।
জানা গেছে, গ্রাহক বাড়লেও আয় না বাড়ার বড় কারণ বকেয়া বিল। রাজশাহী ওয়াসার বকেয়া বিল প্রায় ১০ কোটি টাকা। অস্বচ্ছ কেনাকাটাও একটি বড় কারণ। ঢাকা ওয়াসার মতো রাজশাহীও লোকসানের জন্য পানির দাম ৩০ শতাংশ বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে। এটি গ্রাহকদের ওপর চাপ সৃষ্টি করবে।
রাজশাহী ওয়াসার প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা মেহেদী হাসান বলেন, ‘বিল দেরিতে হওয়ায় কিছু আয় পরবর্তী বছরে যোগ হয়। আমরা চার কিস্তিতে বিল করি, কিন্তু শেষ কিস্তি দেরি হয়েছে।’ প্রধান বাজেট কর্মকর্তা আব্দুর রহমান বলেন, ‘অডিটে লক্ষ্যমাত্রা দেখানো হয়, বার্ষিক প্রতিবেদনে প্রকৃত আদায়। কোনো গরমিল নেই।’
ওয়াসার উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক (অর্থ ও প্রশাসন) তৌহিদুর রহমান বলেন, ‘২০২৩ সালে দাম বাড়ানো হয়েছে, কিন্তু প্রতি বছর ৫ শতাংশ সমন্বয় করা হয়নি। প্রকল্প শেষ হলে লোকসান কমবে। বকেয়া আদায়ে মোবাইল কোর্ট চালাচ্ছি। আগামী দুই বছরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসবে।’ গ্রাহকরা অসন্তুষ্ট। তারা বলছেন, ‘পানির দাম বেড়েছে, সেবা খারাপ। লোকসানের অজুহাতে দাম আরও বাড়ানো হবে। হিসাবের গরমিল তদন্ত করা দরকার।’
রাজশাহী রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সাধারণ সম্পাদক জামাত খান বলেন, ‘গ্রাহক বাড়ছে, বিল দিচ্ছি, তবু লোকসান। এর ভার আমাদের ওপর পড়বে। স্বচ্ছতা না থাকলে দাম বাড়বে। আমরা স্বাধীন তদন্ত চাই।’
ওয়াসার পোর্টালে অভিযোগ প্রতিকার রিপোর্টে দেখা যায়, ২০২৩-২৫ সালে অভিযোগের সংখ্যা বেড়েছে। এর বড় অংশ বিল ও সেবা সংক্রান্ত। রাজশাহী ওয়াসা ২০১৮ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। উদ্দেশ্য ছিল মহানগরীতে নিরাপদ পানি সরবরাহ ও পয়ঃনিষ্কাশন উন্নয়ন। শুরুতে গ্রাহক সংখ্যা কয়েক হাজার, ২০২৬ সালের শুরুতে এটি ৫১ হাজার ছাড়িয়েছে। ওয়াসার প্রধান আয় উৎস হলো পানি বিক্রি, নতুন সংযোগ ফি, নিবন্ধন ফি এবং টেন্ডার বিক্রি।

