দেশে ইসলামিক ধারার ব্যাংকগুলো আদৌ কতটা শরিয়াহ নীতি মেনে চলছে, তা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই বিতর্ক রয়েছে। এই বিতর্কের মধ্যেই ইসলামী ব্যাংকিং খাত দেশের মূল ধারার ব্যাংকিং ব্যবস্থার প্রায় এক-চতুর্থাংশ দখল করে নিয়েছে। দ্রুত সম্প্রসারণশীল এই খাতেই ঢুকে পড়ে একটি লুটেরা চক্র। শরিয়াহ নীতির তোয়াক্কা না করে ঋণের নামে অর্থ আত্মসাৎ ও বিদেশে পাচারের অভিযোগ ওঠে। এর পরিণতিতে চরম ভোগান্তিতে পড়েন সাধারণ আমানতকারীরা। সেই দুর্ভোগ এখনো তাদের পিছু ছাড়েনি।
এরই মধ্যে নতুন করে ক্ষোভে ফুঁসছেন একীভূত পাঁচ ব্যাংকের আমানতকারীরা। সম্প্রতি কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানায়, গত দুই বছরের আমানতের ওপর কোনো মুনাফা দেওয়া হবে না। এই সিদ্ধান্তের পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ দেখা যাচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর গতকাল বলেন, ইসলামী শরিয়াহ অনুযায়ী পরিচালিত কোনো ব্যাংক লোকসানে থাকলে আমানতকারীরা মুনাফা পান না। তিনি বলেন, পাঁচটি ব্যাংকের নিরীক্ষা করানো হয়েছে। নিরীক্ষায় দেখা গেছে, ব্যাংকগুলো ওই সময়ে লোকসানে ছিল। এ অবস্থায় শরিয়াহ সুপারভাইজরি কাউন্সিলের পরামর্শ অনুযায়ী দুই বছরের আমানতের ওপর মুনাফা না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। (সূত্র: শেয়ার বিজ)
গভর্নর আরও বলেন, সরকারের দেওয়া অর্থ দিয়েই সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক আমানতকারীদের মূল টাকা ফেরত দিতে পারছে। সরকার সহায়তা না দিলে আমানতের মূল টাকা ফেরত পাওয়াও অনিশ্চিত হয়ে পড়ত।
গত বুধবার বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংক রেজ্যুলেশন ডিপার্টমেন্ট এক চিঠিতে এক্সিম ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক ও ইউনিয়ন ব্যাংককে জানায়, ২০২৪ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের ২৮ ডিসেম্বর পর্যন্ত জমা থাকা আমানতের ওপর কোনো মুনাফা দেওয়া হবে না।
এই পাঁচটি ব্যাংক একীভূত করে সম্প্রতি ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’ নামে নতুন ব্যাংক চালু করা হয়। চলতি বছরের প্রথম দিন থেকেই গ্রাহকরা এই ব্যাংকের মাধ্যমে লেনদেন করছেন। আগামীকাল সোমবার ব্যাংকটির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হওয়ার কথা রয়েছে। এরই মধ্যে বহু শাখায় পুরোনো সাইনবোর্ড বদলে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের নামের ব্যানার টানানো হয়েছে।
সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক থেকে প্রাথমিকভাবে দুই লাখ টাকা পর্যন্ত আমানত ফেরত দেওয়া হচ্ছে। যাদের হিসাবে এর বেশি অর্থ রয়েছে, তারা প্রতি তিন মাসে সর্বোচ্চ এক লাখ টাকা করে দুই বছর পর্যন্ত তুলতে পারবেন।
এ বিষয়ে গত ৩০ ডিসেম্বর বাংলাদেশ ব্যাংক একটি প্রজ্ঞাপন জারি করে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানায়, যারা তাৎক্ষণিকভাবে আমানত তুলবেন না, তারা বাজারভিত্তিক মুনাফা পাবেন। প্রয়োজনে আমানতের বিপরীতে ঋণ নেওয়ার সুযোগও থাকবে।
বাংলাদেশ ব্যাংক আরও জানায়, পাঁচটি ব্যাংকের সব চলতি, সঞ্চয়ী ও স্থায়ী আমানত এখন সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের আওতায়। নির্ধারিত সময় শেষ হওয়ার আগে স্থায়ী আমানতের অর্থ তোলা যাবে না। তবে বিদ্যমান আমানতের বিপরীতে সর্বোচ্চ ২০ শতাংশ পর্যন্ত ঋণ বা বিনিয়োগ সুবিধা মিলবে। নতুন করে জমা দেওয়া আমানতের ক্ষেত্রে এ সীমা সর্বোচ্চ ৮০ শতাংশ।
৬০ বছরের বেশি বয়সী গ্রাহক এবং ক্যানসার বা কিডনি ডায়ালাইসিসের মতো গুরুতর রোগে আক্রান্ত আমানতকারীদের জন্য মানবিক বিবেচনায় বিশেষ সুবিধা রাখা হয়েছে। চিকিৎসার প্রয়োজনে তারা নির্ধারিত সীমার ভেতরে বা বাইরে গিয়েও আমানতের অর্থ তুলতে পারবেন।
এর আগে একীভূতকরণ প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে পাঁচ ব্যাংকের সব চলতি, সঞ্চয়ী ও স্থায়ী আমানতসহ স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ, দায়-দেনা এবং পূর্বের সব চুক্তি সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের অনুমোদিত মূলধন ৪০ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে পরিশোধিত মূলধন ৩৫ হাজার কোটি টাকা। পরিশোধিত মূলধনের মধ্যে সরকার দিয়েছে ২০ হাজার কোটি টাকা।
নতুন ব্যাংক চালুর দুই সপ্তাহের মাথায় গত দুই বছরের মুনাফা না দেওয়ার সিদ্ধান্ত জানানো হলে আমানতকারীদের মধ্যে ক্ষোভ বাড়তে থাকে।
এক্সিম ব্যাংকের আমানতকারী খন্দকার হাফিজুর রহমান একটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলে কর্মরত। গত বছরের জানুয়ারিতে তিনি দুই দফায় ব্যাংকটিতে ১২ লাখ টাকা আমানত রাখেন। সম্প্রতি বিদেশে যাওয়ার প্রস্তুতির সময় তিনি টাকা তুলতে গেলে অনিশ্চয়তায় পড়েন।
তিনি বলেন, জমাকৃত আমানতের ওপর প্রায় দেড় লাখ টাকা মুনাফা পাওয়ার কথা ছিল। সেই মুনাফা তো পাচ্ছিই না, বরং মূল টাকা কবে ফেরত পাবো সেটাও নিশ্চিত নয়। এক বছরের বেশি সময় ধরে এই আমানত নিয়ে উদ্বেগে আছি। এখনো সেই উৎকণ্ঠা কাটেনি।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ‘ব্যাংকিং ইনফরমেশন’ নামের একটি পেজে এক ব্যবহারকারী বুধবার রাতে লেখেন, সবাই রাস্তায় নামেন। গত দুই বছরের সব মুনাফা কেটে রাখবে। আমরা ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। যা ইচ্ছা তাই করছে। কাল হয়তো বলবে ২০২৬ সালের আগের মূল টাকাও দেবে না।
এক সময়ের সাংবাদিক শরিফুল হাসান বর্তমানে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত। তিনি বলেন, ইসলামী ব্যাংকগুলোতে শরিয়াহ পরিপালনে বড় ধরনের ব্যত্যয় আমরা আগেও দেখেছি। শুরু থেকেই প্রশ্ন ছিল, এই ব্যাংকগুলো আদৌ পুরোপুরি শরিয়াহ নীতি মেনে চলছে কি না। বাস্তবে তারা প্রচলিত সুদি ব্যাংকের মতো নির্ধারিত হারে মুনাফা দিয়েছে, যা শরিয়াহসম্মত নয়। এসব ক্ষেত্রে ব্যত্যয় থাকলেও লোকসানের সময় এসে শরিয়াহর কথা বললে ক্ষোভ তৈরি হওয়াই স্বাভাবিক।
এক্সিম ব্যাংকের আরেক আমানতকারী মোহাম্মাদ জামাল উদ্দিন বলেন, দুই বছর পর এসে বলা হচ্ছে কোনো মুনাফা দেওয়া হবে না। অথচ গত বছর আমানত তুলতে চাইলেও ব্যাংক টাকা দেয়নি। এই অবস্থায় শরিয়াহর যুক্তি দেখিয়ে মুনাফা না দেওয়া এক ধরনের হঠকারিতা। কারণ, ব্যাংক নিয়ম অনুযায়ী আমানতের টাকা বিনিয়োগ করতেও পারেনি। সেখানেও শরিয়াহ পরিপালন হয়নি। এটি পুরোপুরি ব্যাংকের ব্যর্থতা। সেই ব্যর্থতার দায় গ্রাহকের ওপর চাপানো জুলুম ছাড়া কিছু নয়।

