রান্নার লিকুইড পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) সংকট জানুয়ারিতেও কাটতে পারছে না। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, যদি বড় ধরনের উদ্যোগ নেওয়া না হয়, আগামী মাসের শুরুতেও সরকার এলপিজির চাপে পড়তে পারে।
বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ জানিয়েছেন, জানুয়ারিতে এলপিজির চাহিদা ১ লাখ ৫০ হাজার টনের বেশি। কিন্তু এখন পর্যন্ত আমদানি নিশ্চয়তা পাওয়া গেছে মাত্র ১ লাখ ২০ হাজার টন। তিনি বলেন, বাকি এলপিজি আনার জন্য ব্যবসায়ীরা সর্বাত্মক চেষ্টা চালাচ্ছেন। এজন্য সরকার তাদের সঙ্গে দফায় দফায় বৈঠক করছে।
এলপিজি অপারেটরস অব বাংলাদেশের (লোটাব) সভাপতি আমিরুল হক বলেন, সংকট কবে শেষ হবে তা বলা কঠিন। সবাই আন্তর্জাতিক স্পট মার্কেট থেকে আমদানির চেষ্টা করছে। কিন্তু জাহাজ ভাড়া এবং অন্যান্য লজিস্টিকাল সমস্যা আছে। সংকট কমাতে সরকার সৌদি আরব, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং ফিলিপাইনের সঙ্গে আলোচনার উদ্যোগ নিয়েছে। তবে সেখান থেকে এলপিজি আনা সময়সাপেক্ষ।
জ্বালানি সচিব সাইফুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেছেন, সরকারিভাবে ১ লাখ টন এলপিজি আনার চেষ্টা করা হবে। তবে সেই এলপিজি মার্চে আসতে পারে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সব কিছু মিলিয়ে এলপিজির সংকট থেকে বের হওয়া এখন কঠিন। বাজারে এলপিজি এখনও সহজে পাওয়া যাচ্ছে না। পাওয়া গেলেও ১৩০৫ টনের এলপিজি এখন ২৩০০ থেকে ২৬০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ফলে নিম্ন ও মধ্যবিত্তের খরচ বেড়েছে। অনেকেই বিকল্প হিসাবে ইলেকট্রিক চুলা বা মাটির চুলা ব্যবহার করছেন।
সংকট মূলত তথ্য-উপাত্তে উদাসীনতা এবং ইরানের অভ্যন্তরীণ বিক্ষোভের কারণে ঘনীভূত হয়েছে। ফলে কবে তা কাটবে তা কেউ নিশ্চিতভাবে বলতে পারছে না। বিইআরসি জানায়, ২০২৪ সালে এলপিজি আমদানি হয়েছে ১৬ লাখ ১০ হাজার টন। কিন্তু ২০২৫ সালে কমে হয়েছে ১৪ লাখ ৬৫ হাজার টন। একই সময়ে পাইপলাইনে গ্যাস সংকটের কারণে শিল্প খাতে এলপিজির ব্যবহার বেড়েছে।
লোটাব জানিয়েছে, শিল্প খাতে এলপিজির ব্যবহার মোট চাহিদার ৩০ শতাংশ। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পটপরিবর্তনের পর বেক্সিমকোসহ ৫ বড় কোম্পানি এলপিজি আমদানিতে ব্যর্থ হচ্ছে। কারণ বাংলাদেশ ব্যাংক তাদের এলসি করতে দিচ্ছে না। অন্য কোম্পানিও এ চাহিদা পূরণ করতে পারেনি। এছাড়া চীনসহ বিভিন্ন দেশ ইরান থেকে এলপিজি আমদানিতে ব্যর্থ হচ্ছে। ইরানে টানা এক মাস বিক্ষোভের কারণে চীনও স্পট মার্কেট থেকে এলপিজি কিনতে পারছে না।
সংশ্লিষ্টরা জানান, মূল সমস্যা হচ্ছে ছোট জাহাজে এলপিজি আনা। বিইআরসির চেয়ারম্যান বলেন, চীনসহ বিভিন্ন দেশ একসঙ্গে ১ লাখ টনের জাহাজে এলপিজি কিনছে। কিন্তু বাংলাদেশে ব্যবসায়ীরা ১০–২০ হাজার টনের এলপিজি চাইছে। ফলে বিক্রেতারা বড় ক্রেতাদের অগ্রাধিকার দিচ্ছে। গত এক সপ্তাহে সংশ্লিষ্ট সব অংশীর সঙ্গে বৈঠক হয়েছে। আজও অনেকের সঙ্গে বৈঠক আছে।
যমুনা এলপিজির পরিচালক ইয়াসির আরাফাত বলেন, সরকার এলপিজিকে গ্রিন এনার্জি ঘোষণা করেছে। তবে ব্যাংক থেকে প্রয়োজনীয় সহায়তা পাচ্ছেন না। বেঙ্গল এলপিজির পরিচালক ফিরোজ আলম জানান, সরবরাহকারীরা অর্ডার অনুযায়ী সরবরাহ করতে পারছে না। ফলে চলতি মাসে তারা কোনো এলপিজি বটলিং করতে পারেনি।
বিএম এনার্জির মহাব্যবস্থাপক অলক কুমার পন্ডিত বলেন, দুবাই থেকে এলপিজি কিনতে আগে এলসি করা হয়েছে। সরবরাহকারী কবে জাহাজে লোড করবে তা জানাচ্ছে না। তবে বিএম এনার্জি ইতিমধ্যে মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশ থেকে এলপিজি কিনে রেখেছে। এখন সেগুলো দিয়ে বটলিং করা হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, এখন মাসিক এলপিজি চাহিদা দেড় লাখ টন থেকে ১ লাখ ৬০ হাজার টন। তবে আমদানি নিশ্চয়তা আছে মাত্র ১ লাখ ২০ হাজার টনের। বাকি এলপিজি আনার জন্য টু-টু (জিটুজি) অর্থাৎ দ্বিপাক্ষিক চুক্তির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ফিলিপাইন সরকারের সঙ্গে আলোচনা করে ৮–১০ দিনে এলপিজি আনার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। ফিলিপাইন চেম্বার অব কমার্সের সভাপতি হুমায়ুন রশীদ বলেন, দ্রুত এলপিজি না আনলে সংকট কাটবে না।
এদিকে জাহাজ সংকটের কারণে পরিবহণ খরচ বেড়েছে। আগে প্রতি টন এলপিজি জাহাজ ভাড়া ১১০ ডলার ছিল, এখন ১৮০ ডলার। লোটাবের সভাপতি জানান, কোনো বটলিং কোম্পানি বিইআরসির নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে বিক্রি করছে না। তবে বাজারে ১৩০৫ টাকার এলপিজি ২০০০ টাকার বেশি বিক্রি হচ্ছে, যা দেখার দায়িত্ব সরকারের।

