ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে গত ২২ জানুয়ারি থেকে শুরু হয়েছে প্রার্থীদের আনুষ্ঠানিক নির্বাচনি প্রচার। এ নির্বাচনে ভোটের লড়াইয়ে নেমেছেন নির্বাচন কমিশনের নিবন্ধিত ৫১টি রাজনৈতিক দল ও স্বতন্ত্র প্রার্থীরা। তবে প্রচার শুরুর প্রথম দিন থেকেই সারা দেশে নির্বাচনি আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে ভোটের মাঠ।
অনুমতি ছাড়া মিছিল, পোস্টার ও ব্যানার টানানো, নির্ধারিত সময়ের আগে প্রচার, ভোটারদের ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ, প্রতিপক্ষের কর্মীদের ওপর হামলা ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগ আসছে প্রায় প্রতিদিনই। এসব অভিযোগে একে অপরের বিরুদ্ধে পাল্টাপাল্টি দোষারোপ করছে রাজনৈতিক দলগুলো।
এই পরিস্থিতিতে নির্বাচন কমিশন একদিকে শোকজ নোটিশ, জরিমানা ও সতর্কবার্তা দিচ্ছে। অন্যদিকে রাজনৈতিক দলগুলো প্রশ্ন তুলছে, এসব ব্যবস্থা আচরণবিধি লঙ্ঘন ঠেকাতে যথেষ্ট কি না। একই সঙ্গে প্রশাসনের নিরপেক্ষতা ও দায়িত্বশীলতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে কয়েকটি দল।
এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের সচিব আখতার আহমেদ জানান, আচরণবিধি লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে কমিশন ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অনুসরণ করছে। অভিযোগ পেলেই তদন্ত করে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি।
অঙ্গীকার দিয়েও মানছেন না আচরণবিধি
জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার ক্ষেত্রে এবারই প্রথম মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার সময় রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীরা আচরণবিধি মানার অঙ্গীকারনামা দেন। তবু বাস্তবে অনেক প্রার্থী সেই অঙ্গীকার মানছেন না।
বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ প্রায় সব দলের প্রার্থীদের বিরুদ্ধেই আচরণবিধি ভঙ্গের অভিযোগ উঠেছে। ভোটের দিন যত ঘনিয়ে আসছে, ততই বাড়ছে এসব ঘটনা। এখনই কার্যকর ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ না নিলে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হতে পারে বলে মনে করছেন নির্বাচন বিশ্লেষকেরা।
বিএনপি-জামায়াতের পাল্টাপাল্টি অভিযোগ
নির্বাচনি প্রতীক বরাদ্দের দিন থেকেই বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী একে অপরের বিরুদ্ধে আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ করছে।
ঢাকা-১৫ আসনে প্রতীক বরাদ্দ শেষে বিএনপির প্রার্থী শফিকুল ইসলাম খান মিল্টন অভিযোগ করেন, জামায়াত অতিরিক্ত লোকজন নিয়ে উপস্থিত হয়ে আচরণবিধি ভঙ্গ করেছে। নারী কর্মীদের দিয়ে ভোটারদের ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি। এ সময় বিএনপির কর্মীদের মারধরের ঘটনাও ঘটেছে বলে দাবি করেন।
জামায়াতে ইসলামী এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে। দলটির নেতারা বলেন, বরং তাদের নারী কর্মীদের ভয়ভীতি দেখানো হচ্ছে এবং বিভিন্ন এলাকায় প্রচারে বাধা দেওয়া হচ্ছে।
এনসিপি ও অন্যান্য দলের অভিযোগ
জাতীয় নাগরিক পার্টির আহ্বায়ক ও ঢাকা-১১ আসনের প্রার্থী নাহিদ ইসলাম অভিযোগ করেন, বিএনপির কর্মীরা তাদের ব্যানার ও পোস্টার ছিঁড়ে ফেলছে এবং সমর্থকদের হুমকি দিচ্ছে। বিদ্যুতের তারে পোস্টার ঝোলানোর মতো আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগও তোলেন তিনি।
এদিকে গতকাল রবিবার নির্বাচন কমিশনে গিয়ে আমার বাংলাদেশ পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু অভিযোগ করেন, বরিশাল ও ফেনীসহ বিভিন্ন এলাকায় তাদের নেতা-কর্মীদের প্রচারে বাধা দেওয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, এতে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। হামলার পর থানায় জিডি হলেও স্থানীয় প্রশাসন কার্যকর ব্যবস্থা নিচ্ছে না বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
শোকজ ও জরিমানার হিসাব
নির্বাচন কমিশন সূত্র জানায়, এ পর্যন্ত শতাধিক প্রার্থীকে আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগে শোকজ ও জরিমানা করা হয়েছে। এসব প্রার্থী বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, এনসিপি, ইসলামী আন্দোলন, জাতীয় পার্টি, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম, গণঅধিকার পরিষদ, খেলাফতে মজলিস, এবি পার্টি ও লেবার পার্টির।
কয়েকটি আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থীদেরও শোকজ ও জরিমানার আওতায় আনা হয়েছে। কিছু জেলায় ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে জরিমানার ঘটনাও ঘটেছে। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রে শোকজের পর সতর্ক করেই অভিযোগ নিষ্পত্তি করা হয়েছে। এতে প্রশ্ন উঠেছে, এসব শাস্তি ভবিষ্যতে আচরণবিধি লঙ্ঘন রোধে কতটা কার্যকর হবে।
প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে উদ্বেগ
ভোটের মাঠে আচরণবিধি বাস্তবায়নে স্থানীয় প্রশাসনের ভূমিকা নিয়েও গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। একাধিক দল বলছে, হামলা ও সহিংসতার ঘটনায় থানায় অভিযোগ দেওয়া হলেও দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না।
কোথাও কোথাও রিটার্নিং কর্মকর্তাদের ভূমিকা নিয়েও পক্ষপাতের অভিযোগ উঠেছে। নির্বাচন বিশেষজ্ঞ আব্দুল আলীম বলেন, মাঠপর্যায়ে প্রশাসন দৃঢ় না হলে নির্বাচন কমিশনের নির্দেশ কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থাকবে। দ্রুত ও কঠোর ব্যবস্থা না নিলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে বলেও সতর্ক করেন তিনি।
আচরণবিধি নিয়ে ইসির অবস্থান
নির্বাচন কমিশনের সচিব আখতার আহমেদ বলেন, আচরণবিধি লঙ্ঘনের প্রতিটি অভিযোগ গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে। সংবিধান ও আইন অনুযায়ী কমিশন নিরপেক্ষভাবে ব্যবস্থা নিচ্ছে।
তিনি জানান, কমিশনের হাতে শোকজ নোটিশ, জরিমানা, প্রার্থিতা বাতিলের সুপারিশ এবং প্রশাসনিক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতা রয়েছে। নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ করতে কমিশন জিরো টলারেন্স নীতিতে অটল থাকবে।
ইসি সূত্র জানায়, মাঠপর্যায়ে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও অনুসন্ধান কমিটির কার্যক্রম জোরদার করা হচ্ছে। প্রয়োজন হলে শোকজের বাইরে আরও কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
রাজনৈতিক দল ও পর্যবেক্ষকদের মতে, শেষ পর্যন্ত এই নির্বাচন কতটা গ্রহণযোগ্য হবে, তা নির্ভর করবে তিনটি বিষয়ের ওপর—নির্বাচন কমিশনের দৃঢ়তা, প্রশাসনের নিরপেক্ষতা এবং রাজনৈতিক দলগুলোর সদিচ্ছা।

