২০২৬ সালের মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট এবং সমমানের পরীক্ষা আজ মঙ্গলবার সারা দেশে একযোগে শুরু হয়েছে। তবে এবারের পরীক্ষায় একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, গত বছরের তুলনায় পরীক্ষার্থীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।
গত বছর যেখানে মোট পরীক্ষার্থী ছিল ১৯ লাখ ২৮ হাজার ৯৭০ জন, সেখানে এবার পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে ১৮ লাখ ৫৭ হাজার ৩৪৪ জন। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে কমেছে ৭১ হাজার ৬২৬ জন শিক্ষার্থী। গত ছয় বছরের মধ্যে এটিই সর্বনিম্ন অংশগ্রহণ, যা শিক্ষাব্যবস্থার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করছে।
বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, দুই বছর আগে নিয়মিত শিক্ষার্থী হিসেবে নিবন্ধন করেছিল ১৮ লাখ ৯৫ হাজার ৩৯৯ জন। কিন্তু এবার নিয়মিত পরীক্ষার্থী হিসেবে অংশ নিচ্ছে মাত্র ১৪ লাখ ৪৮ হাজার ৫১১ জন। অর্থাৎ প্রায় সাড়ে চার লাখ শিক্ষার্থী পরীক্ষার বাইরে থেকে গেছে। এদের একটি বড় অংশ হয় পড়াশোনা থেকে ঝরে পড়েছে, নয়তো আগের শ্রেণিতে থেকে গেছে।
এবারের পরীক্ষাকে ঘিরে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে নকলমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করার ওপর। প্রতিটি পরীক্ষাকক্ষে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে এবং শৃঙ্খলা রক্ষায় নেওয়া হয়েছে কঠোর ব্যবস্থা। সম্ভাব্য ২০ ধরনের অনিয়ম চিহ্নিত করে তিন স্তরের শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে।
প্রথম স্তরে পরীক্ষার হলে কথা বলা, পোশাক বা ডেস্কে কিছু লেখা থাকা, ক্যালকুলেটরে তথ্য রাখা কিংবা মোবাইল ফোন বহন করলে ওই বছরের পরীক্ষা বাতিল করা হবে। দ্বিতীয় স্তরে প্রশ্নপত্র বা উত্তরপত্র বাইরে পাচার, কর্তব্যরত শিক্ষকদের হুমকি দেওয়া বা নিয়ম ভঙ্গ করে হল ত্যাগ করলে এক বছরের জন্য পরীক্ষায় অংশগ্রহণ নিষিদ্ধ করা হবে। আর তৃতীয় স্তরে প্রক্সি দেওয়া, পরিচয় জালিয়াতি, উত্তরপত্র বদল বা সহিংস আচরণের মতো গুরুতর অপরাধে সরাসরি দুই বছরের জন্য বহিষ্কার করা হবে এবং আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এই কঠোর ব্যবস্থা বাস্তবায়নে মাঠ পর্যায়ে বিশেষ ভিজিল্যান্স টিম কাজ করছে। পাশাপাশি নতুন নিয়ম অনুযায়ী, যেসব কেন্দ্রে নিজস্ব ল্যাবরেটরি সুবিধা নেই সেখানে ব্যবহারিক পরীক্ষা নেওয়া যাবে না।
এ বছর ১১টি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে মোট ১৮ লাখ ৫৭ হাজার ৩৪৪ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ছাত্র ৯ লাখ ৩০ হাজার ৩০৫ জন এবং ছাত্রী ৯ লাখ ২৭ হাজার ৩৯ জন। সারা দেশের ৩০ হাজার ৬৬৬টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা ৩ হাজার ৮৮৫টি কেন্দ্রে অংশ নিচ্ছে। আজ বাংলা প্রথম পত্র পরীক্ষার মাধ্যমে এই পরীক্ষা শুরু হয়েছে, যা সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হচ্ছে। তত্ত্বীয় পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর আগামী ৭ থেকে ১৪ জুন পর্যন্ত ব্যবহারিক পরীক্ষা নেওয়া হবে।
পরীক্ষার মান এবং মূল্যায়নের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতেও এবার বিশেষ নজর দেওয়া হয়েছে। শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন জানিয়েছেন, খাতা মূল্যায়ন ঠিকভাবে হচ্ছে কি না তা মনিটরিং করা হবে এবং এ জন্য আলাদা পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। তিনি স্পষ্ট করেন, অতিরিক্ত নম্বর দেওয়ার কোনো নির্দেশনা নেই এবং পুরো প্রক্রিয়াটি কঠোরভাবে তদারকি করা হবে।
এছাড়া সাইবার নজরদারির মাধ্যমে প্রশ্নফাঁস রোধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এবং পরীক্ষার সময় নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন জানিয়েছেন, সরকার শিক্ষার্থীদের মধ্যে পরীক্ষাভীতি কমাতে কাজ করছে। তিনি অভিভাবকদের উদ্দেশ্যে বলেন, অযথা আতঙ্কিত না হয়ে সন্তানদের মানসিকভাবে সহায়তা করতে।
সব মিলিয়ে এবারের এসএসসি পরীক্ষা শুধু একটি পাবলিক পরীক্ষা নয়, বরং এটি দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার বর্তমান বাস্তবতা ও চ্যালেঞ্জের একটি প্রতিফলন। পরীক্ষার্থীর সংখ্যা কমে যাওয়া যেমন চিন্তার বিষয়, তেমনি কঠোর নজরদারি ও স্বচ্ছতার উদ্যোগ ভবিষ্যতের জন্য ইতিবাচক দিক হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে।

