দেশের উচ্চশিক্ষা খাতে বড় ধরনের প্রশাসনিক পরিবর্তন এনেছে সরকার। একযোগে ১১টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন উপাচার্য নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। বৃহস্পতিবার (১৪ মে) শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগ পৃথক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে এই নিয়োগের ঘোষণা দেয়।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রশাসনিক অস্থিরতা, দায়িত্বশূন্যতা এবং একাডেমিক কার্যক্রমে ধীরগতির যে অভিযোগ ছিল, এই নিয়োগ তার সমাধানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বিশেষ করে প্রযুক্তি ও সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে নতুন নেতৃত্ব আসায় শিক্ষা ও গবেষণায় নতুন গতি আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।
নতুন উপাচার্য পাওয়া বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়, নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, রাঙামাটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, জামালপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এবং মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।
প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন উপাচার্য হয়েছেন অধ্যাপক ড. একরামুল হক। ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্ব পেয়েছেন লোকপ্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক ড. এ কে এম মতিনুর রহমান।
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন ভিসি হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক ড. এম এম শরীফুল করিম। বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের নেতৃত্বে আসছেন ড. মো. মামুন অর রশিদ, যিনি পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ওশানোগ্রাফি অনুষদের ডিন হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন।
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন ড. মোহাম্মদ মোশারফ হোসেন। নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্ব পেয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. গোলাম রব্বানী।
এ ছাড়া ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হয়েছেন অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ইকবাল। রাঙামাটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে দায়িত্ব পেয়েছেন অধ্যাপক ড. জয়নুল আবেদীন সিদ্দিকী।
পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন ভিসি হয়েছেন অধ্যাপক ড. আবুল হাসনাত মোহা. শামীম। জামালপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের নেতৃত্বে আসছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আমির হোসেন ভূঁইয়া।
মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগের অধ্যাপক ড. এ বি এম শহীদুল ইসলাম।
দিনটির সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা ছিল বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য নিয়োগ ঘিরে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগের অধ্যাপক ড. আনিসুর রহমানকে বিশ্ববিদ্যালয়টির উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করা হলেও মাত্র এক ঘণ্টার মধ্যে সেটি বাতিল করা হয়।
হঠাৎ করে এই সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের কারণ আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়নি। তবে বিষয়টি নিয়ে শিক্ষা অঙ্গনে নানা আলোচনা শুরু হয়েছে। অনেকেই মনে করছেন, প্রশাসনিক সমন্বয় কিংবা অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্যের কারণেই এমন সিদ্ধান্ত আসতে পারে।
বাংলাদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো শুধু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়, বরং দেশের গবেষণা, নীতি নির্ধারণ এবং মানবসম্পদ উন্নয়নের বড় কেন্দ্র। তাই নেতৃত্বের প্রশ্নটি সবসময়ই গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে সেশনজট, শিক্ষক রাজনীতি, প্রশাসনিক দ্বন্দ্ব এবং শিক্ষার মান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ফলে নতুন উপাচার্যদের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে একাডেমিক পরিবেশ স্থিতিশীল করা এবং গবেষণাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা।
বিশেষ করে প্রযুক্তিনির্ভর বিশ্বে বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে আন্তর্জাতিক মানে নিয়ে যেতে হলে দক্ষ প্রশাসন এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা জরুরি বলে মনে করছেন শিক্ষাবিদরা।
প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, নবনিযুক্ত উপাচার্যরা যোগদানের তারিখ থেকে চার বছর মেয়াদে দায়িত্ব পালন করবেন। দায়িত্ব পালনের সময় তারা বর্তমান পদের সমপরিমাণ বেতন-ভাতা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা পাবেন।
একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে তাদের সার্বক্ষণিক ক্যাম্পাসে অবস্থান করতে হবে। তবে রাষ্ট্রপতি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য প্রয়োজনে যেকোনো সময় এই নিয়োগ বাতিল করতে পারবেন বলেও প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়েছে।
শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের প্রত্যাশা, নতুন প্রশাসন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে স্বচ্ছতা, নিয়মিত শিক্ষা কার্যক্রম এবং আধুনিক গবেষণার পরিবেশ নিশ্চিত করবে। একই সঙ্গে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মধ্যে দূরত্ব কমিয়ে ক্যাম্পাসে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনাও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে থাকবে।
উচ্চশিক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, শুধু প্রশাসনিক পরিবর্তন নয়, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে ভবিষ্যতের উপযোগী করে তুলতে নীতিগত সংস্কার, গবেষণায় বিনিয়োগ এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়ানোও জরুরি। নতুন উপাচার্যরা সেই পরিবর্তনের নেতৃত্ব কতটা সফলভাবে দিতে পারেন, এখন সেটিই দেখার বিষয়।

